জ্যোতি বসুর প্রধানমন্ত্রিত্ব ঘিরে তাঁর দলের যে অবস্থান সেদিন ছিল, তা নিয়ে কিছু বলবার যোগ্যতা বা অধিকার আমার নেই। কিন্তু যদি তিনি প্রধানমন্ত্রী হতেন–সমাজবিজ্ঞানের একজন অতি সাধারণ ছাত্র হিসেবে এখানে সেই ভাবনা রাখি। প্রথম ভাবনা, জ্যোতিবাবু প্রধানমন্ত্রী হলে শরিক দলগুলো তাঁকে নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত টিকে থাকতে দিত। সেই সময়কালের মধ্যেই তিনি ভারতীয় অর্থনীতির প্রায় ধসে পড়া বনিয়াদকে কিছু প্রচেষ্টার ভিতর দিয়ে সঞ্জীবিত হওয়ার প্রয়াস করে নিতেন। যার জেরে পরবর্তীকালে দেশের অর্থনীতির এ হেন দুরবস্থা হতো না, যাতে মনমোহন সিংয়ের বাজার অর্থনীতি ভারতের অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলকে আমেরিকার অগাধ মৃগয়া ভূমিতে পরিণত করত।
জ্যোতিবাবুর প্রশাসনিক পদক্ষেপে অর্থনৈতিক চিন্তাধারার পরিচালনায় জওহরলাল নেহরু মডেলের অর্থনীতির সঙ্গে খুব একটা ফারাক ছিল না। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যে অর্থনীতির ধারা ভারতে চালু করেছিলেন পণ্ডিত নেহরু, যার রূপরেখা সৃষ্টিতে রবীন্দ্র স্নেহধন্য প্রশান্তচন্দ্র মহালনবীশের বিশেষ ভূমিকা–বিশেষ করে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ঘিরে ছিল, তার সঙ্গে কমিউনিষ্টদের তেমন সংঘাত ছিল না। ১৯৬৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টি ভাগ হয়ে যাওয়ার পরও দুটি অংশের কমিউনিস্টদের মধ্যে নেহরু ঘরানার অর্থনীতি নিয়ে বিশেষ মতপার্থক্য ছিল না। ছয়ের দশকে পশ্চিমবঙ্গে অজয় মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারের (১৯৬৭) উপমুখ্যমন্ত্রী ছিলেন জ্যোতি বসু। সেই সময়ে তিনি অর্থ দপ্তরের দায়িত্বে ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের বুকে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রয়োগের সেটাই ছিল সূচনাপর্ব।
পরবর্তী সময়ে ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পর জনসাধারণকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার লক্ষ্যে যে অর্থনৈতিক ভাবনা ড. অশোক মিত্রের মাধ্যমে জ্যোতিবাবু পশ্চিমবঙ্গে চালু করতে পেরেছিলেন, তা দীর্ঘকাল বামফ্রন্ট সরকার বজায় রাখতে পেরেছিল। জ্যোতিবাবু ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলে সেই সমাজতান্ত্রিক মডেলের মাধ্যমে নেহরু ঘরানার অর্থনীতিকে ভারতের তৃণমূল স্তরে পৌঁছে দিতে পারতেন। ফলে ভারতের বিভিন্ন অংশে যে আধা সামন্ততান্ত্রিক অবকাঠামো সেই সময়ে শক্তিশালী ছিল, তা কোনো অবস্থাতেই আজও শক্তি বজায় রাখতে পারত না। অর্থনীতির এই বিকল্পধারাই একদিকে এই দেশের প্রতি মার্কিন সামাজ্যবাদের লোলুপ দৃষ্টিকে প্রশমিত করতে একটা বড় ভূমিকা পালন করত।
অপরদিকে প্রবল বেকারত্ব, অর্থনৈতিক সংকট, সরকার কর্তৃক প্রথাগত শিক্ষায় ব্যয় সঙ্কোচন, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আগুন দাম, চিকিৎসা কেবল ধনীদের জন্যে–এসবের জেরে হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শিবির যেভাবে সাধারণ হিন্দুকে, ধর্মপ্রাণ হিন্দুকে ধর্মের রাজনৈতিক বটিকা সেবন করিয়ে, হিন্দু-মুসলমানের বিভাজন তৈরি করে ক্ষমতার মৌতাত উপভোগের সুযোগ করে নিয়েছে, সেটা কোনো অবস্থাতেই সম্ভবপর হতো না। এটা নিশ্চিত করে বলা যায়, পি ভি নরসিংহ রাওয়ের আমলে তাঁর অর্থমন্ত্রী হিসেবে ড. মনমোহন সিং যেভাবে নেহরুবাদী অর্থনীতিকে কবর দিয়েছিলেন, যার জেরে গোটা ভারতে আজ আমেরিকার সৌজন্যে আরএসএস-বিজেপিসহ গোটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক, দক্ষিণপন্থী শক্তি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আধুনিক ভারতকে ধ্বংস করেছেন আমেরিকার ধ্বজাধারী মনমোহন সিংয়ের অর্থনীতি।
আর এই অর্থনীতি গ্রহণের সুযোগ নরসিমা রাও-মনমোহন সিং যুগলবন্দির কাছে করে দিয়েছিল এইচ ডি দেবগৌড়া ও ইন্দর কুমার গুজরালের দিশাহীন সরকার। এই দিশাহীন সরকারের আত্মঘাতী অর্থনৈতিক প্রবণতার কঠোর সমালোচক ছিলেন জ্যোতি বসু। যদি তিনি দেবগৌড়ার পরিবর্তে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতেন, তবে এই পরিস্থিতির মধ্যে ভারতকে কখনো পড়তে হতো না।
দ্বিতীয় ভাবনা: সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে স্বাধীন ভারতে পণ্ডিত নেহরুর পর একমাত্র সঠিক পদক্ষেপ নিতেন জ্যোতিবাবু, যার জেরে সর্বস্তরের সংখ্যালঘু, দলিত, তফসিলি জাতি-উপজাতির মানুষেরা আত্মবোধে উন্মীলিত হতেন। ভারতে শ্রেণি চিন্তার প্রয়োগে ধর্ম ও জাতপাত যে প্রক্রিয়া চলে ইএমএস হরকিষাণ সিং সুরজিৎ ও জ্যোতি বসুর মতো নেতারা গোটা জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে সেটা জানতেন। তাই শ্রেণি সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জ্যোতিবাবু কেবলমাত্র পুস্তকনির্ভর বামপন্থী চিন্তাতে আবদ্ধ থাকতেন না। মার্কসীয় বিক্ষণকে জর্জি দিমিত্রভের যুক্তফ্রন্টের তত্ত্বের নিরিখে ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার পরিকাঠামো অনুযায়ী প্রয়োগ করতেন। ফলে আজ বিজেপির বাড়বাড়ন্ত যেভাবে প্রথম ইউপিএ সরকারের ওপর বামপন্থীদের সমর্থন প্রত্যাহারের পর একটা ভিন্ন প্রেক্ষিতে শুরু হয়, সেই প্রেক্ষিত সৃষ্টির পরিবেশই হয়তো হতো না।
মমতা ব্যানার্জি গোটা প্রতিক্রিয়াশীলদের একত্রিত করবার সুযোগটাই পেতেন না। ১৯৪৬-এর দাঙ্গার কালে হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তির নখদন্ত বিষয়ে জ্যোতিবাবুর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছিল। তিনি পণ্ডিত নেহরুর ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তাই বলে গত শতকের চারের দশকের মধ্যভাগে ক্যবিনেট মিশন ঘিরে নেহরুর অবস্থানের আদৌ সমর্থক ছিলেন না। ১৯৪৬-এর ১০ জুলাই ক্যাবিনেট মিশনকে প্রত্যাখ্যান করে নেহরুর যে বিবৃতি, তার সঙ্গে জ্যোতিবাবু কখনো সহমত পোষণ করতেন না।
আসলে ক্ষমতার অলিন্দের প্রতি এতটুকু আকর্ষণ তো দূরের কথা, ক্ষণিকের মোহ জ্যোতিবাবুর ছিল না। সে কারণেই ১৯৪৬-এর ১০ জুলাই কিছুটা ক্ষমতার আকর্ষণে যে ভূমিকা পণ্ডিত নেহরু নিয়েছিলেন, সেই ভূমিকার ধারপাশ দিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলে জ্যোতিবাবু এক মুহূর্তের জন্যে হাঁটতেন না। জ্যোতিবাবু ভারতের প্রধানমন্ত্রীর তখতে যদি একটা দিনের জন্যেও অধিষ্ঠিত হতেন, তাহলে হিন্দু- মুসলমানের সম্প্রীতির প্রশ্নে একটা নতুন দিগন্ত এ দেশের ক্ষেত্রে উন্মোচিত হতো।
দেশভাগ হয়ে দুটি ভিন্ন দেশ হয়ে গেলেও দুই বাংলার মতো অবিচার সহ্য আর কাউকে করতে হয়নি। দেশভাগের যে প্রত্যক্ষ প্রভাব পাঞ্জাবের দুটি অংশে পড়েছিল, তার মোকাবিলায় ভারত ও পাকিস্থান সরকার যথেষ্ট যত্নশীল ছিল। পশ্চিমবঙ্গের তদানীন্তন সরকারের কাছ থেকে তেমন যত্নশীল ও দায়িত্ববান ভূমিকার পরিচয় পাওয়া যায়নি। তাই সাম্প্রদায়িকতা, বিভাজনের এই হাতে-কলমে শিক্ষার থেকে জ্যোতিবাবুর যে আত্মপোলব্ধি, তার নিরিখে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলে, সম্প্রীতি ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে তিনি যে ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হতেন–তাঁর সমকালে তেমনটা আর কেউই হতে পারতেন না। বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং প্রধানমন্ত্রী হয়ে সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলে মণ্ডল কমিশন ঘিরে যে অবস্থান নিয়েছিলেন, সেটা ছিল তাঁর সরকার টিকিয়ে রাখবার অন্যতম অবলম্বন। বিজেপির রামমন্দিরের রাজনীতি, আদভানির রথযাত্রার রাজনীতি মোকাবিলার করবার একটা রাজনৈতিক অস্ত্র।
তৃতীয়ত: হিন্দি বলয়ের আধা সামন্ততান্ত্রিক সমাজ কাঠামো কখনোই জ্যোতি বসুর সরকারকে ভূমি সংস্কারে জাতীয় স্তরে উদ্যোগী হতে দিত না। কিন্তু জ্যোতি বসু সরকারের ভূমি সংস্কারের উদ্যোগ হিন্দি বলয়ে আধা সামন্ততান্ত্রিক পরিকাঠামোর বুকে কাঁপন জাগাত। ফলে লালু-মূলায়মের মতো রাজনীতিকেরাও জ্যোতিবাবুর সর্বহারার জন্যে এই প্রচেষ্টা ঘিরে কিছুটা হলেও নমনীয় হতে বাধ্য হতেন। ফলে এঁদের জ্যোতি বসুর সরকারকে ব্ল্যাকমেইল করবার সুযোগ অনেক কম হতো। মানুষের মধ্যে অধিকার সচেতনতা তৈরিতে জ্যোতি বসু সরকার একটা মাইলফলক হতো। নেহরু প্রজন্মের পরে নিজেকে আর কোনো ভারতীয় রাজনীতিক জ্যোতিবাবুর মতো মানুষের অধিকার সচেতনতা তৈরির একটা স্তম্ভ হিসেবে তুলে ধরতে পারেননি।
পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু মুসলমানদের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক, এমনকি ধর্মীয় বৈচিত্র্য সুরক্ষার প্রশ্নে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার পরিচালনার যে কম-বেশি ২৪ বছর, তা কেবল এপার বাংলা বা ভারতের নিরিখেই নয়,গোটা বিশ্বের কাছেই একটা রোল মডেল। ১৯৭৭ সালের পর যে ভূমি সংস্কারের কর্মসূচি, তা সফল করতে ঘরে-বাইরে জ্যোতিবাবুকে কি লড়াই করতে হয়নি? ফরোয়ার্ড ব্লক, মার্ক্সবাদী ফরোয়ার্ড ব্লক, আরএসপি–ভূমি সংস্কারের বিষয়ে এসব রাজনৈতিক দল আন্তরিকভাবে উদ্যোগী হয়েছিল? সাতের দশকে সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী সামন্তপ্রভুরা, এইসব দলে নাম লেখায়নি?
এই অবস্থা জ্যোতিবাবু প্রধানমন্ত্রী হলে জাতীয় স্তরে আরও প্রবলভাবে হতো। কিন্তু ১৯৪৬ এর দাঙ্গার নায়ক রাম চট্টোপাধ্যায়কে ১৯৭৭-এ যেভাবে সামলেছিলেন জ্যোতিবাবু, জাতীয় স্তরেও তার পুনরাবৃত্তিই তিনি করতেন। এখানে একটা কথা মনে রাখা দরকার, মোরারজি দেশাই তাঁর সরকার টিকিয়ে রাখতে একটা রাজনৈতিক সমাধান সূত্রে পৌঁছবার তাগিদে সেই ১৯৭৯ সালের জুলাই মাসে, বিশেষভাবে জ্যোতিবাবুর পরামর্শের মুখাপেক্ষী ছিলেন। জ্যোতিবাবু কিন্তু তখন সবেমাত্র পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের দায়িত্ব নিয়েছেন। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে লড়ে জেতা পোড়খাওয়া নেতা মোরারজি দেশাইয়ের মতো মানুষ আরএসএস আর জনতা পার্টি–এই দুইয়ের দ্বৈত সদস্যপদ ঘিরে উদ্ভূত সংকট, যার জেরে তাঁর মন্ত্রিসভার অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে উঠেছিল, সেই পর্যায়ে সমাধান সূত্রের তাগিদে দৌত্যের জন্যে নির্ভরশীল হয়েছিলেন জ্যোতিবাবুর প্রতি।
জ্যোতিবাবু ১৯৭৯-এর জুলাই সংকটের সময় লন্ডনে ছিলেন। তখনকার দিনে যোগাযোগ ব্যবস্থাও আজকের মতো উন্নত ছিল না। ফলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই চেষ্টা করেও পারেননি জ্যোতিবাবুর সঙ্গে কোনোরকম যোগাযোগ করতে। এই ঘটনা থেকেই বুঝতে পারা যায়, জাতীয় রাজনীতিতে সাতের দশকের শেষের দিকে জ্যোতিবাবুর গুরুত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা কোন স্তরে এসে পৌঁছেছিল। বস্তুত পণ্ডিত নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধীর পরে জ্যোতি বসু ছিলেন একমাত্র ভারতীয় রাজনীতিক, নিজের দলের গণ্ডির বাইরে ও জাতীয় স্তরের রাজনীতিতে যাঁর অসম্ভব গ্রহণযোগ্যতা ছিল। জ্যোতিবাবু যদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতেন, তবে এই গ্রহণযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে ভারতীয় রাজনীতির মোড়টাকেই অনেকটা ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হতেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে একমাত্র পণ্ডিত নেহরু আরএসএসকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে মোকাবিলার পক্ষপাতী ছিলেন। যদিও তাঁর নিজের দলের দক্ষিণপন্থীদের চাপে, তিনি বিশেষ সফল হতে পারেননি। জ্যোতিবাবু প্রধানমন্ত্রী হলে আরএসএসকে মোকাবিলায় প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতেন।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]