চাইলে এমন দিনে তাঁদের কক্সবাজার সফর নিয়েই প্রশ্ন তোলা যায় অনেক।
গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে পরিচিত মুখগুলোর কয়েকটি তাঁরা। পরে একটা রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন, নানা বিতর্কেও জড়িয়েছেন। কিন্তু তাতে গণঅভ্যুত্থানে তাঁদের ভূমিকা তো ম্লান হয়ে যায়নি। সেই গণঅভ্যুত্থানে বিজয়ের বর্ষপূর্তিতে বিজয়ের মিছিলে সবার সামনেই তাঁদের উপস্থিতি ছিল অনুমিত।
কিন্তু গত পরশু সংসদ ভবন এলাকায় হাজারো মানুষ যখন বিজয়ের আনন্দে মত্ত, অপেক্ষায় জুলাই ঘোষণাপত্রের...হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম, নাসিরউদ্দিন পাটওয়ারীর মতো এনসিপি নেতাদের খোঁজ মিলল কক্সবাজারে! সঙ্গে এনসিপির আরও দুই নেতৃস্থানীয়–তাসনিম জারা ও খালেদ সাইফুল্লাহও ছিলেন, গণঅভ্যুত্থানের সময়ে রাজপথে না থাকলেও বিদেশ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাঁরা সমর্থন জুগিয়ে গেছেন অবিরত।
এমন দিনে তাঁরা কক্সবাজার কেন, সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সঙ্গেই আলাপ, না অন্য কিছু–সে নিয়ে বিতর্ক আছে অনেক। বিতর্কটা সহজে শেষ হবে না। ওই পাঁচ নেতার পক্ষ থেকে যদিও ‘জাস্ট এমনে একটু সাগরপারে ঘুরতে’ যাওয়ার দাবি এসেছে, তবে গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তির দিনে তাঁরা এমনিই ঘুরতে গেছেন–এ দাবি সম্ভবত শিশুমনেও প্রশ্ন তৈরি করবে। এনসিপি এরই মধ্যে তাঁদের শো-কজ করেছে।
তবে এর সবই রাজনৈতিক বিতর্ক। সেটা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়।
এসবের মধ্যে কূৎসিত একটা চেষ্টা গত পরশু হাসনাত-সারজিস-জারাদের কক্সবাজার যাওয়ার গুঞ্জন চাউর হওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখে পড়েছে, যা দল-মতের ভেদাভেদেও সুস্থ মস্তিষ্কের কারও পক্ষে কোনোভাবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। চেষ্টাটা এনসিপি নেত্রী তাসনিম জারাকে ঘিরে। কক্সবাজারে তাঁর সফরসঙ্গীদের পাশে জারার নাম জুড়ে দিয়ে কুরূচিকর সব পোস্ট ভেসেছে ফেসবুকে।
জারাকে ঘিরে এমন চেষ্টা এবারই প্রথম নয়, এর আগের স্মৃতি বেশি দিন পুরোনোও নয়। এআইয়ের ব্যবহারে জারার ছবি বিকৃত করে, সে ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে জারাকে হেনস্থা করার নোংরা চেষ্টার ঘটনার তো এখনো এক মাসও হয়নি!
প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক তিনি। চাইলেই বিদেশে দারুণ ক্যারিয়ার গড়তে পারতেন। করোনার সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলে তাঁর পরামর্শ মানুষের কাজে আসেনি–এমনটা তাঁর ঘোর বিরোধীও হয়তো দাবি করবেন না। তিনি কোন ঘরানার, সে নিয়ে অনেক বিতর্ক-অনুমান থাকতে পারে; তাঁর দল অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতির প্রত্যাশার বিপরীত দিকেই হাঁটছে কি না–সে প্রশ্ন উঠতে পারে; কিন্তু এটাও তো সত্যি যে, গণঅভ্যুত্থানের সময়ে ওঠা ‘রিভার্স ব্রেইন ড্রেইন’ আওয়াজে সাড়া দিয়ে শেষ পর্যন্ত যে হাতে গোনা কয়েকজন দেশে ফিরে এসেছেন, তাঁদের একজন জারা। তাঁর প্রতি এমন বিদ্বেষের কারণ কী?
শুধু এনসিপিতে যোগ দেওয়ার কারণেই কি এমনটা হচ্ছে? এসবকে ‘এনসিপি-বিরোধিতা’ বলার কোনো উপায় অন্তত গত পরশুর ঘটনার পর তো আর থাকছে না। ৫ আগস্টের বর্ষপূর্তিতে কক্সবাজার ‘ঘুরতে’ তো এনসিপির আরও চার নেতাও গেছেন! তাঁদের ক্ষেত্রে যত প্রশ্ন শুধু শেষ পর্যন্ত গোপন রাখতে না পারা এই হঠাৎ সফরের উদ্দেশ্যতেই থেমে গেছে। তাহলে জারার ক্ষেত্রে এই সমালোচনার সঙ্গে কুৎসিত পোস্টগুলোও তৈরি হলো কেন?
উত্তর একটাই হতে পারে–জারা একজন নারী, এবং নারী হয়েও তিনি রাজনীতিতে এসেছেন!
এক বছর আগে গণঅভ্যুত্থানে উৎখাত হওয়া সরকারের নেপথ্যের দল আর এই মুহূর্তে রাজপথে থাকা সবচেয়ে বড় দল–দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুটি দলে তিন-চার দশক ধরে নারী নেতৃত্ব দেখা, গত তিন দশকে নারী প্রধানমন্ত্রীই পাওয়া যদি বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘প্রদীপ’ হয়ে থাকে, তবে তার নিচের ঘুটঘুটে অন্ধকার এটাই বলে যে, দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া বাংলাদেশের রাজনীতি নারীর অংশগ্রহণকে কখনোই স্বাগত জানায়নি।
জারাকে ঘিরে দুটি ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন কিছু, কিংবা এনসিপির সঙ্গে জড়িত বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বিএনপি নেত্রী রুমিন ফারহানাকে এর আগে নোংরামির শিকার হতে হয়েছে। ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সৃষ্ট গণজাগরণ মঞ্চের নেত্রী লাকি আক্তারকেও একই ধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তাঁদের পরিচয় ভিন্ন, কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতিতে আক্রমণের শিকার হওয়ার ধরনে তাঁদের অভিজ্ঞতা অভিন্ন।
অত দূরই-বা যেতে হবে কেন, জারার দল এনসিপির ভেতরেই তো এই বিতর্ক মাত্র মাস দুয়েকের পুরোনো। এনসিপি নেতা সারোয়ার তুষার ‘কুপ্রস্তাব’ দিয়েছেন বলে অভিযোগ তুললেন এনসিপিরই নেত্রী নীলা ইসরাফিল। এ সম্পর্কিত একটি ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার পর যেখানে নীলার বিচার পাওয়ার কথা, সেখানে চলল নীলারই চরিত্রহনন। বাদীই সোশ্যাল মিডিয়া ট্রায়ালের কাঠগড়ায়! শেষ পর্যন্ত যে নীলা ইসরাফিল এনসিপি থেকে পদত্যাগ করলেন–বা করতে বাধ্য হলেন, আর সারোয়ার তুষার এখনো ‘সসম্মানে’ অধিষ্ঠিত… এনসিপির রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ এতটুকুতেই অনেক।
প্রশ্নগুলো এনসিপিতে নারী নেতৃত্বের সুযোগ নিয়ে, ম্যানিফেস্টোতে গৎবাঁধা কথার বিপরীতে নারী অধিকারের প্রশ্নে এনসিপির মনোভাব নিয়ে। প্রশ্নগুলো নতুনও তো নয়! নারী অধিকার সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব বাতিল চেয়ে যুক্তি দিয়ে যুক্তি খণ্ডনের বদলে যা-তা গালাগাল করে সমালোচিত ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের সমাবেশে এনসিপির নেতার উপস্থিতির পরও প্রশ্নগুলো উঠেছিল! উত্তর তখনো পাওয়া যায়নি, এখনো না।
বারবার এনসিপির কথাই আসছে বলে অবশ্য পাল্টা প্রশ্ন জাগতে পারে, নারী অধিকার প্রশ্নে তাহলে ‘নন্দ ঘোষ’টা এনসিপিই? তাদের নিয়েই শুধু প্রশ্নগুলো ওঠে?
মোটেও না!
এনসিপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমূল বদল দেখার আশায় পরিণত গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত রাজনৈতিক দল বলে, তাদের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থানের সামনের সারির সব তরুণ মুখ বলে, তাদের কাছে সাধারণ মানুষের নতুন কিছুর প্রত্যাশার সবটুকু সঁপে দেওয়া ছিল বলেই প্রশ্নগুলো বড় হয়ে ওঠে। প্রত্যাশা আর প্রাপ্তি এখানে সমান্তরালে হাঁটার বদলে দৌড়াচ্ছে বিপ্রতীপে। এ বেলায় এনসিপির রাজনীতি আর পুরোনো দলগুলোর রাজনীতিতে তফাৎ তেমন নেই, অন্তত এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
অথচ বাংলাদেশের ইতিহাস বলছে, নারীদের ছাড়া এ দেশে কোনো আন্দোলন হয়নি। বারেবারে আন্দোলনে নারীরাই ‘বর্ম’ হিসেবে সামনে হাজির হয়ে গেছেন। স্মৃতি হাতড়াতে খুব বেশি পেছাতেও হবে না। চব্বিশের গণআন্দোলনের স্মৃতি তো এখনো একেবারে টাটকা। আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধদের হত্যাকাণ্ড আন্দোলনে গতি এনেছে–এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আওয়ামী লীগের ওপর, ছাত্রলীগের ওপর মানুষের ক্ষোভ পুঞ্জিভূত হওয়ার শুরু তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরপরাধ-নিরস্ত্র নারী শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের কর্মীদের নির্মম মারধরের ছবিগুলো ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে!
অথচ নারীদের সগর্ব উপস্থিতির সুযোগে দাঁড়ানো আন্দোলনগুলোর পর রাজনীতিতে নারীদের অধিকার খর্ব করতেই সবার যেন তর সয় না! চব্বিশের আন্দোলনের ‘স্টেইক’-এ কে কত বড় ‘হোল্ডার’, সে নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কাড়াকাড়ি সাধারণের চোখে পীড়া দেওয়ার পর্যায়েই চলে গেছে। অথচ আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ভাগীদার নারীদের অবদান প্রশ্নে আওয়াজ যা শুধু নারী অধিকারবিষয়ক সংগঠন আর প্রগতিশীল কিছু দলের দিক থেকেই আসে।
বাকিরা? সেটা পুরোনো দলই হোক আর নতুন, রাজনীতিতে নারীদের আরও বেশি করে দেখতে চাওয়ার প্রশ্নের সামনে তাদের মুখে কুলুপ, কানে তালা। সংসদে নারীদের আসন বাড়ানো ও সেসব আসনে সরাসরি নির্বাচনের প্রশ্ন যখন এল, রাজনৈতিক দলগুলোর ওজর-আপত্তির তালিকা শুধু লম্বাই হলো। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোর ‘সদয় সম্মতিক্রমে’ যে সিদ্ধান্ত এসেছে, তা হলো–সংসদে এতদিন যেমন ৫০টি সংরক্ষিত আসন ছিল নারীদের জন্য, সংস্কারের ডাক দেওয়া গণঅভ্যুত্থানের পরও সেই ৫০টি সংরক্ষিত আসনই থাকছে, এবং ২০৪৩ সাল পর্যন্ত এখানে কোনো নড়চড় হবে না!
সংরক্ষিত মানে কী? তাঁরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন না, সংসদ সদস্য হবেন দলের থিংক ট্যাংকের দয়ার দানে! এই ‘কোটা’ বেঁধে দেওয়া প্রক্রিয়ায় কে কার মা, কে কার স্ত্রী, বোন কিংবা নিকটাত্মীয়া–সে বিবেচনাই যে মুখ্য হয়ে ওঠে, সে তো ওপেন সিক্রেট। তেমন কোনো সম্পর্ক না থাকলে? বড় অঙ্কের ‘অনুদানে’র রাস্তা খোলা তো থাকেই!
হ্যাঁ, সংরক্ষিত আসনের বাইরেও নারীদের প্রার্থী হওয়ার রাস্তা অবারিত, অন্তত কাগজে-কলমে তা-ই। কিন্তু এ ব্যাপারে দলগুলোর সদিচ্ছা বুঝতে সংস্কার কমিশনের সঙ্গে তাদের বৈঠকের সারসংক্ষেপে চোখ রাখলেই হবে।
জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের সভাপতি আলী রিয়াজ যা বলেছেন, তার সারসংক্ষেপ দাঁড়ায়–নারীদের জন্য ১০০টি বাড়তি আসন রেখে মোট ৪০০ আসনে নির্বাচনের প্রস্তাব কিছু দলের পছন্দ হয়নি, বিশেষত যারা পারলে আজই নির্বাচন হতে দেখতে চায়। সেটা না হওয়ার পর? আলী রিয়াজ বলেছেন, ‘আমরা এমনও বলেছি, সংরক্ষিত আসন বাতিল করে দেন। দল থেকে ৩৩ শতাংশ নারীকে নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়ন দেন। তাতেও দলগুলো রাজি হয়নি।’
হওয়ার প্রত্যাশাও কি ছিল? রাজনীতিতে নারীর উপস্থিতির প্রশ্নেই যেখানে বিব্রত হয় কিছু দল, বিশেষ করে ধর্মভিত্তিক দলগুলো, সেখানে সংসদে আইনপ্রণেতার ভূমিকায় তিন ভাগের এক ভাগ আসনে নারীকে দেখার প্রশ্নে তাদের রাজি হওয়ার সম্ভাবনা তো প্রায় শূন্য, এবং তা শুধু সম্ভাবনার অংক নেতিবাচক হতে পারে না বলেই!
এটা ঠিক, নারী প্রার্থীর প্রশ্নে যে রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তি নেই, তারাও বাস্তবতার পাঠ সামনে তুলে ধরতে পারে–৩৩ শতাংশ প্রার্থী দেওয়ার মতো নারী নেত্রী কোথায়? প্রশ্নটা অযৌক্তিক হবে না। সঙ্গে যদি ভোটে জেতার মতো নারী প্রার্থী খোঁজা হয়, তাহলে তো খড়ের গাদায় সুঁই খোঁজার মতো অবস্থা তৈরি হবে। কিন্তু এমন পরিস্থিতি কেন হলো?
উত্তর খুঁজতে একটু পিছিয়ে যেতে হয়। বড় দুই দলে দুই বড় নেত্রী–যাঁরা তিন দশক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন দেশের। এর বাইরে জাতীয় পার্টিতে রওশন এরশাদকে হিসেবে ধরলে বাংলাদেশে বড় তিন দলেই নারী নেতৃত্বই দেখা গেছে। কিন্তু তিনজনের মধ্যেই একটা বড় মিল, তিনজনই দলের নেতৃত্বে আসার শুরুর সময়টাতে রাজনীতিতে তাঁদের অর্জনের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল তাঁদের পারিবারিক পরিচয়। এর বাইরে নারী নেতৃত্ব খুঁজতে যান, পদ বা মন্ত্রিত্বের হিসাব বাদ দিলেও যাঁদের নাম মাথায় আসবে, প্রায় সবাই ষাটের কিংবা সত্তরের দশকে রাজনীতিতে এসেছেন। নব্বইয়ে গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে শুরু করার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলে প্রভাবশালী কজন নারী নেত্রী পাওয়া গেছে? সম্ভবত কর গুণতে হবে না, আঙুলেই গুনে শেষ করা যাবে।
কেন পাওয়া যায়নি? এ সময়ে নারী অধিকার নিয়ে কথা বলার মতো প্রজ্ঞাবান নারী তো কম পায়নি বাংলাদেশ। কিন্তু সুলতানা কামাল, মালেকা বেগম, ফরিদা আখতার, বর্তমানে উপদেষ্টা পরিষদে থাকা রিজওয়ানা হাসানদের মতো ব্যক্তিত্বের কেউ রাজনীতিতে যোগ দেননি। তাঁরা নারীদের জন্য কাজ করে গেছেন এনজিওভিত্তিক পরিবেশে থেকে। তাঁদের কাজের মাহাত্ম্য তাতে কমে না মোটেও। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, রাজনীতিতে এমন কোনো ব্যক্তিত্ব কেন আসেনি গত তিন-চার দশকে?
উত্তরের খোঁজ ফিরিয়ে নিয়ে আসে গত পরশু জারাকে জড়িয়ে চলতে থাকা কুৎসিত ট্রলে। কিংবা এর আগে রুমিন ফারহানা, লাকি আক্তার, নীলা ইসরাফিলদের অভিজ্ঞতায়।
কোনো পুরুষ রাজনীতিতে নামলে তাঁকে জবাব দিতে পাল্টা রাজনীতি আছে–সেটা বুদ্ধিবৃত্তিক হোক বা গায়ের জোরের। যেমনটা কক্সবাজার যাওয়া এনসিপির বাকি চার পুরুষ নেতার ক্ষেত্রে হচ্ছে। কিন্তু নারী রাজনীতিতে এলে? তাঁকে প্রতিহত করার জন্য পুরুষতান্ত্রিক বিকৃত মানসিকতার অস্ত্র তৈরি হয়ে যায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে। কুৎসিত ট্রল, এআই জেনারেটেড ছবি, চরিত্রহননের মতো বাণ তৈরিই থাকে, সঙ্গে ‘জনসম্মতি উৎপাদনমূলক’ ইস্যু হিসেবে পোশাক নিয়ে প্রশ্ন ‘ফ্রি!’
যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকে অফিশিয়াল ড্রেস কোডের বর্ণনায় পুরুষের পোশাকের ক্ষেত্রে কাপড়ের ধরন আর নারীর পোশাকের ক্ষেত্রে পরিমাপ ঠিক করে দেওয়া হয়, যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকেই ওড়না নিয়ে কটু কথা বলার ইস্যুতে জেলে যাওয়া নিপীড়ককে ফুলের মালা দিয়ে জেল থেকে বের করে আনে মব… জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি (সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ৫০.৮৪%) হওয়া সত্ত্বেও সে দেশে সাধারণ নারীর পথ চলতেই তো শত বাধা। সেখানে রাজনীতি? সে বেলায় যা-ইচ্ছা তা-ই বলে দিতে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতায় বাধে না।
এনসিপির সফরের ফাঁস হওয়া ছবিতে কিন্তু আরেকজন নারীকেও দেখা গেছে, যিনি নোংরামির শিকার হতে না হওয়ার জন্মগত অধিকার ‘ভাগ্যগুণে’ অর্জন করেছেন। কারণ, তিনি এনসিপির নেতৃস্থানীয় কেউ নন। জারাকে নোংরামির শিকার হতে হলো কারণ, জারা একজন নারী এবং নারী হয়ে তিনি রাজনীতিতে নেমেছেন।
সংসদ নির্বাচনে ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থী নিয়ে আলোচনার ইস্যুতে গত মার্চে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম মুখপাত্র উমামা ফাতেমা বিবিসি বাংলায় বলেছিলেন, ‘যোগ্যতার ভিত্তিতে না এনে শুধু নারী বলেই রাজনীতিতে আনতে হবে আমরা এটার বিরোধী। এর ফলে আরও বেশি বৈষম্যের সুযোগ তৈরি হয়।’
আবারও মনে করিয়ে দিই–৩৩ শতাংশ তো থাকেইনি, শেষ পর্যন্ত সংরক্ষিত আসনের দয়া বরাদ্দ করা হলো তাঁদের জন্য।
অথচ গত বছরের জুলাইয়ে চাকরিতে নিজেদের জন্য কোটা প্রত্যাখ্যান করে কোটাবিরোধী আন্দোলনে নামা নারীরা রাজনীতিতেও এমন ‘ভিক্ষা’ তো চাননি! শুধু বিকৃতমস্তিষ্ক একটি বিশেষ শ্রেণিকে সামলালেই নারীদের রাজনীতিতে চলার পথটা অনেক মসৃণ হয়। সে পথে নামতে সাধারণ পরিবারের একজন নারীকে তখন নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তি চিন্তা করতে হবে না। যে চিন্তা একজন পুরুষকে করতে হয় না।
এই সমতা নিশ্চিত করা গেলে সংসদে আর নারী কোটারই দরকার সম্ভবত পড়বে না।
লেখক: সাংবাদিক
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]