গুন্ডা তত্ত্ব ও বাংলাদেশের রাজনীতি

নিউটনের তত্ত্ব, আর্কিমিডিসের তত্ত্ব, এমনকি রাজনীতিতে গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র আব্রাহাম লিংকনের ‘অব দি পিপল, বাই দি পিপল অ্যান্ড ফর দি পিপল’ তত্ত্ব–এর সবটাই আমরা জানি। কিন্তু এই গুন্ডা তত্ত্ব এটা আবার কি কোথা থেকে এটা এল, আর এটার উদ্ভবকই বা কে। না, এটার উদ্ভাবক আমি না। যত দূর শুনেছি, এটার উদ্ভাবক নাকি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, যিনি এখন ভারতে অবস্থান করছেন। এখন এটা তিনি স্বয়ং উদ্ভাবন করেছেন, নাকি তাঁর লোক‑লস্কর‑বুদ্ধিজীবীরা করেছেন, তা কিন্তু আমি জানি না। এটা আবিষ্কারের চেয়ে আমি বরং এটার প্রয়োগ আর রাজনীতিতে এর কার্যকারিতা নিয়ে কথা বলি। তার আগে হোন্ডা তত্ত্বটা (হোন্ডা এখানে কোনো ব্র্যান্ড নয়, সাধারণ্যে মোটরসাইকেলমাত্রই হোন্ডা) একটু বলে নিই। সেটা হলো–যদি কোনো বিরোধী রাজনৈতিক কর্মসূচি মোকাবিলা করতে হয়, তবে তার জন্য দশটা হোন্ডা, আর বিশটা গুন্ডাই যথেষ্ট। পদাতিক গুন্ডার চেয়ে হোন্ডারোহী গুন্ডার দল অনেক বেশি কার্যকরী ভূমিকা পালন করে থাকে। বিগত দিনগুলোতে আমরা এর সার্থক প্রয়োগ দেখেছি।

বিগত পনেরো বছরে বিরোধী দল বলতে মাঠে ছিল বিএনপি; অন্যান্য দলগুলো তাদের ছাতার নিচেই রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করত। কারণ, এককভাবে অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে কোনো সফল আন্দোলনের জন্ম দেওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। আবার বিএনপির যেকোনো আন্দোলন নস্যাৎ করার জন্য এই গুন্ডা তত্ত্বই ছিল মোক্ষম অস্ত্র। বিগত সরকারের আমলের শেষদিকে বিএনপি এক বিশাল জনসমাবেশের আয়োজন করে নেতা‑কর্মী উপস্থিতিতে সরগরম হয়ে ওঠে। সবাই ভাবল এবার বুঝি একটা কিছু হবে। কিন্তু জনসভা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ আগেই আবার সেই কাণ্ড। একদল গুন্ডার আবির্ভাব হলো। সামান্য কিছু ভাঙচুর অগ্নিসংযোগ। সব মিলিয়ে মনে হয় এক ঘণ্টাও হবে না। এত বড় একটা গণজমায়েত মুহূর্তেই ছত্রভঙ্গ। বিশিষ্ট সংগ্রামী নেতৃবৃন্দ প্রাণভয়ে বিনা বাক্যব্যয়ে সভাস্থল ত্যাগ করেন। ফাঁকা হয়ে গেল মতিঝিল এলাকা। তাহলে বুঝুন এই গুন্ডা তত্ত্বের প্রয়োগিক যথার্থতা কতখানি। এ তো একটা মাত্র উদাহরণ। এ রকম ভূরি ভূরি উদাহরণ আছে। 

তবে এই তত্ত্ব শেষমেশ আর সফলতার মুখ দেখতে পায়নি। জুলাই বিপ্লব এই গুন্ডা তত্ত্বকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। যেখানে বিপ্লবীরা বন্দুকের নলের সামনে বুক পেতে দেয় আর দেশের আপামর মানুষ যখন তাদের পেছনে দাঁড়ায়, সেখানে বিশটা গুন্ডা কেন ২০ হাজার গুন্ডাও কিছু করতে পারে না। বিগত সময়ে এক গুন্ডাতন্ত্রের রাজত্ব শেষ হলে আর এক গুন্ডাতন্ত্রের আবির্ভাব হয়েছে। অসহায় জনগণ চেয়ে  চেয়ে দেখেছে। গুন্ডার স্বপক্ষ শক্তি আর বিপক্ষ শক্তি টক শো তারকারা উদয় হয়েছেন বিভিন্ন টক শোতে। ঝড় তুলেছেন পক্ষে‑বিপক্ষে। এই গুন্ডাতন্ত্রের সূচনা স্বাধীনতার আগে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। এনএসএফ নামের সংগঠনে পাঁচজন গুন্ডার মধ্য দিয়ে এর সূচনা। স্বাধীনতার পরে এটা নিয়ন্ত্রিত হওয়া তো দূরের কথা, বিকশিত হয়, ডাল‑পালা বিস্তার করে দেশের আনাচে‑কানাচে এখন তা মহীরুহে পরিণত হয়েছে।

১৯৭৪ সালের ৪ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলে সংঘটিত সাত খুনের খবর ৬ এপ্রিল তারিখে দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় সবিস্তারে প্রকাশিত হয়েছিল। উক্ত রাতে ২৫-৩০ জন সশস্ত্র ছাত্রলীগ কর্মী হলের ছয়তলায় প্রবেশ করে। সেখানের ৬৩৫ নং কক্ষ থেকে ৪ জন এবং ৬৪৮ নং কক্ষ থেকে ৪ জনকে অস্ত্রের মুখে ঘুম থেকে ডেকে তোলে। তারপর তাদের হত্যা করা হয়। শিক্ষাঙ্গনে এই নির্মম হত্যাকাণ্ড জাতিকে হতবাক করে দেয়। এর পর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড হয়েছে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই না, অন্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। সব শেষে বুয়েটের আবরার ফাহাদ নামের সেই ছাত্রের পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড সমগ্র জাতিকে নাড়া দেয়। প্রতিবাদে উত্তাল হয় দেশ। কিন্তু এই কালক্রমে গুন্ডাতন্ত্র অনেকটা গা‑সওয়া হয়ে যায় আমাদের দেশের মানুষের। তারা মনে করে নিতে থাকে এটা তাদের নিয়তি। এর থেকে তাদের পরিত্রাণ নেই। এদের মধ্য চাঁদাবাজ, ভূমি দস্যু, জলদস্যু, ব্যাংক দস্যু, ইত্যাদি নামে তারা তাদের কীর্তিকলাপের সাথে সঙ্গতি রেখে সঙ্গায়িত হয়েছে। এমনকি এটা শিশু শ্রেণি পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে। আবির্ভাব হয়েছে কিশোর গ্যাং নামের একদল সংঘবদ্ধ গুন্ডা চক্রের। বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজ এমনকি খুন‑জখমের মতো ফৌজদারি অপরাধের সাথে জড়িত হয়ে পড়েছে তারা। এই গুন্ডাতন্ত্রের হাত থেকে কেউ আর আজ নিরাপদ নয়। সবারই প্রশ্ন এর কি কোনো প্রতিকার আছে?

কিন্তু এই হতাশার অন্ধকারের মাঝে হঠাৎ একটা আলোর রেখা দেখা দিয়েছে। সেটা হলো ডাকসু নির্বাচন। ২০১৯‑এর পর আর কোনো ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। সবাই জানে কী হয়েছিল কীভাবে হয়েছিল। তবে এবারের ডাকসু নির্বাচন একটা বড় মাপের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সেটা হলো–অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে কোনো প্রকার গুন্ডামির চিহ্ন নেই। নেই নিরাপত্তাহীনতা। আগে ডাকসু নির্বাচন হলে মানুষ ক্যাম্পাস এলাকা এড়িয়ে চলত। কখন কোন দলীয় গুন্ডা কার ওপর চড়াও হয়! তার ফলে কে কখন জান্নাতবাসী হয়ে যায়, তার কোনো ঠিক ছিল না। কিন্তু এবার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা নিজেদের মধ্যে কুশল বিনিময় করেছে। একে অপরের সাথে কথা বলেছে। ক্যাম্পাসে কেউ তাদের অনিরাপদ ভাবেনি। একটা উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করেছে সর্বত্র। 

গুন্ডাদের কোনো উপস্থিতি ছিল না। নির্বাচন শেষ হয়েছে। নির্বাচন হয়েছে সুষ্ঠু‑অবাধ‑নিরপেক্ষ, আর উৎসবমুখর পরিবেশে। ছাত্রশিবির বিপুল বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে। কোন দল জিতেছে, তা মুখ্য বিষয় নয়। মুখ্য বিষয় হলো গুন্ডাতন্ত্র পরাজিত হয়েছে। জয়লাভ করেছে সততা, নিষ্ঠা, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ তরুণ প্রজন্ম, যারা নেতৃত্ব দেবে আগামীর বাংলাদেশকে। এই নির্বাচনের প্রভাব পড়বে জাতীয় নির্বাচনে। জাতীয় নির্বাচনে এখন আর গুন্ডা দিয়ে ভয়‑ভীতি দেখিয়ে বিজয়ী হওয়া যাবে না। আরেকটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো–প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতি। তার মানে ভোটের বাইরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি সবার আস্থা ফিরে আসছে।  শুধু একটা বিষয় এত কিছুর মধ্যেও বেমানান হয়ে গেল। আর তা হলো পরাজিত প্রার্থীদের আচরণ, আর কথা‑বার্তা।

কিছু ভুল‑ভ্রান্তি হতে পারে, তা অনস্বীকার্য। তবে নির্বাচন প্রত্যাখান করার মতো কিছু নিশ্চয়ই হয়নি। এটা না করে তারা যদি এটাকে মেনে নিত এবং বিজয়ী প্রার্থীদের অভিনন্দন জানাত, তবে তাদের ভাবমূর্তি সাধারণ ছাত্র‑ছাত্রীদের কাছে অনেক বেশি উন্নত হতো। পরবর্তীতে নির্বাচনে হয়তো তা কাজে লাগান যেত। আরেকটা বিষয় খুব খারাপ লেগেছে। ভিসি মহোদয়ের সামনে টেবিল চাপড়িয়ে প্রতিবাদ করার দৃশ্য দেখে। প্রতিবাদ, অভিযোগ, নালিশ থাকবেই। কিন্তু তার ভাষা আর আচরণ গুন্ডাতন্ত্রের মতো হবে না কোনোভাবেই।

আমাদের একজন সম্মানিত শিক্ষক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি কথায় কথায় আমাদের বলতেন নিজের ভালো পাগলেও বোঝে। কিন্তু যে বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের থেকে নিয়ে চব্বিশের গণ-আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে, তারাই যদি না বোঝে, তবে তার চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে! যাই হোক আমরা এখন তাকিয়ে আছি জাতীয় নির্বাচনের দিকে। সবার আশা জনগণের ইচ্ছা আর শক্তির কাছে গুন্ডাতত্ত্ব, আর গুন্ডাতন্ত্র–দুটিরই কবর রচিত হবে। আমরা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাব একটা দুর্নীতিমুক্ত গুন্ডামুক্ত সুন্দর আর শান্তির দেশে প্রতিষ্ঠায়। দেশবাসীর আকাঙ্ক্ষা এখন এটাই এবং একটাই।

লেখক: বিভাগীয় প্রধান (ব্যবসায় শিক্ষা), বাংলাদেশ স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাস্কাট ওমান

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]