শব্দের স্থাপত্যকে অস্বীকার: শিল্পকলা একাডেমির আত্মঘাতী পদক্ষেপ ও বাচনিক শিল্পের ভবিষ্যৎ

বাঙালি জাতিসত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ তার ভাষা; আর সেই ভাষার শৈল্পিক ও মননশীল অভিক্ষেপ ঘটে আবৃত্তির মাধ্যমে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমোঘ বাণী, ‘বলা সহজ, কিন্তু বলা শিখতে হয়’—এই চিরন্তন সত্যটিই বাচনিক শিল্পের সারকথা।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বাচনিক শুদ্ধাচার ও নান্দনিক উৎকর্ষ চর্চার প্রধান জাতীয় কেন্দ্রবিন্দু ‘বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি’ তার নব-অনুমোদিত জনবল কাঠামো (অর্গানোগ্রাম) থেকে আবৃত্তি বিভাগকে সুকৌশলে বিচ্ছিন্ন করেছে। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক রদবদল নয়, বরং বাঙালির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী এক মৌলিক শিল্প মাধ্যমকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা থেকে নির্বাসিত করার এক সুদূরপ্রসারী ও আত্মঘাতী পদক্ষেপ।

যখন একটি জাতির প্রমিত উচ্চারণ ও বাচনিক সংস্কৃতির উৎস ধারাকে প্রশাসনিক আদেশে রুদ্ধ করা হয়, তখন বুঝতে হবে আমাদের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক বুনিয়াদ আজ এক গভীর প্রজ্ঞা ও রুচির সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। আবৃত্তি কেবল শব্দ প্রক্ষেপণ নয়, বরং এটি একটি জাতির স্বরযন্ত্রের স্বাধীনতা এবং মেধার নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ।

​শিল্পকলা একাডেমির এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে যে দালিলিক প্রেক্ষাপট রয়েছে, তা বিশ্লেষণ করলে নীতিনির্ধারকদের একপাক্ষিক ও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ফুটে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে সারা দেশের আবৃত্তি শিল্পী ও সংগঠকদের পক্ষ থেকে একটি স্বতন্ত্র বিভাগ গঠনের যৌক্তিক দাবি থাকা সত্ত্বেও, জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদিত চূড়ান্ত জনবল কাঠামোতে আবৃত্তিকে কোনো স্বাধীন অস্তিত্ব দেওয়া হয়নি। যেখানে সংগীত, চারুকলা, নাট্যকলা কিংবা নৃত্যকলার জন্য স্বতন্ত্র পরিচালক ও বিভাগীয় কাঠামো সংরক্ষিত রাখা হয়েছে, সেখানে আবৃত্তিকে ‘নাট্যকলা’র একটি অংশ হিসেবে গণ্য করে কার্যত একে প্রান্তিকীকরণ করা হয়েছে।

এই আমলাতান্ত্রিক ধারণাটি কেবল ভ্রান্তই নয়, বরং আবৃত্তি শিল্পের কয়েক দশকের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও এর স্বতন্ত্র শৈল্পিক ব্যাকরণকে অস্বীকার করার নামান্তর।

মনে রাখা প্রয়োজন, সংগীতের যেমন নিজস্ব সুর ও তালের স্থাপত্য আছে, আবৃত্তিরও তেমনি শব্দ ও নৈশব্দের নিজস্ব পরিমিতি ও কণ্ঠশৈলীর কারুকাজ আছে, যা একে অন্য যেকোনো পারফর্মিং আর্ট থেকে এক অনন্য উচ্চতা ও স্বকীয় মর্যাদা প্রদান করে। আবৃত্তিকে নাটকের সংলাপে সীমাবদ্ধ করা মানে হলো চিত্রকর্মকে কেবল স্থাপত্যের অবয়ব হিসেবে দেখার মতো এক ঐতিহাসিক ভ্রান্তি; যা শিল্পের একক সৌন্দর্য ও স্বাধীন সত্তাকেই অস্বীকার করে।

দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আবৃত্তি হলো ‘সাংস্কৃতিক মেরুদণ্ডের স্বরযন্ত্র’। মানুষের অস্তিত্বের প্রথম প্রকাশ ঘটে শব্দের মাধ্যমে। ফরাসি দার্শনিক মরিস মেরলো-পন্টি যেমনটি বলেছিলেন, ভাষা কেবল চিন্তার পোশাক নয়, ভাষা নিজেই চিন্তা। আবৃত্তি সেই চিন্তাকে এক সুনির্দিষ্ট গাণিতিক ও শৈল্পিক রূপ দান করে। একটি স্বাধীন জাতি যখন তার রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে আবৃত্তিকে অবজ্ঞা করে, তখন তারা আসলে তাদের বৌদ্ধিক সক্ষমতা এবং বাচনিক সত্যকে অস্বীকার করে। এই সিদ্ধান্তটি আমাদের জাতীয় মনস্তাত্ত্বিক দেউলিয়াত্বকেই স্পষ্ট করে তোলে।

শিল্পকলা একাডেমি আইন ১৯৮৯-এর মূল চেতনা ছিল শিল্পের সকল শাখার সমান বিকাশ নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান অর্গানোগ্রামে আবৃত্তিকে অভিভাবকহীন করে তোলা সেই আইনি চেতনার পরিপন্থি এবং একটি শিল্প-বিমুখ আমলাতান্ত্রিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।

​ঐতিহাসিকভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৫২-এর মহান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি জাতীয় লড়াই ও অস্তিত্বের সংগ্রামে আবৃত্তি ছিল বাঙালির প্রধান সাংস্কৃতিক হাতিয়ার। মিছিলে মিছিলে যে কবিতার পঙক্তিগুলো গণমানুষের রক্তে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছিল, তা ছিল আবৃত্তি শিল্পীদেরই কণ্ঠের কারিশমা। যখন আবৃত্তিকারের উদাত্ত কণ্ঠে জীবন্ত হয়ে ওঠে শামসুর রাহমানের ‘আসাদের শার্ট’ কিংবা ‘ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯’, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’, কিংবা নির্মলেন্দু গুণের ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’— তখন তা কেবল মুদ্রণযন্ত্রের সাহিত্য থাকে না, তা হয়ে ওঠে একটি জাতির সংগ্রামের রণধ্বনি।

একইভাবে যখন ধ্বনিত হয় সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘আঠারো বছর বয়স’, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’, হেলাল হাফিজের ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কিংবা আল মাহমুদের শেকড় সন্ধানী কবিতা ‘নোলক’, তখন প্রতিটি শব্দ যেন একেকটি বারুদে রূপান্তরিত হয়। অ্যালেন গিন্সবার্গের ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কিংবা সৈয়দ শামসুল হকের ‘আমার পরিচয়’ যখন বাচনিক শিল্পে প্রাণ পায়, তখন তা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে এক অবিনাশী প্রতিবাদ ও শাশ্বত ঐতিহ্যে রূপ নেয়। আজ সেই স্বাধীন বাংলাদেশে, যেখানে ভাষার মর্যাদা রক্ষায় অকাতরে রক্ত দিতে হয়েছে, সেখানে রাষ্ট্রীয় একটি প্রতিষ্ঠানের কাঠামো থেকে আবৃত্তিকে ছেঁটে ফেলা বড়ই নিষ্ঠুর পরিহাস।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তাকালে দেখা যায়, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের রবীন্দ্রভারতী বা বিশ্বভারতীর মতো বিশ্বখ্যাত বিদ্যাপিঠগুলোতে আবৃত্তিকে স্বতন্ত্র গুরুত্ব দিয়ে উচ্চতর পাঠদান ও গবেষণা করা হয়। ইউনেস্কো ঘোষিত ‘বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ (Intangible Cultural Heritage) রক্ষার বিশ্বজনীন এই যুগে যখন বাচনিক শিল্প নতুন আঙ্গিকে আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, তখন আমাদের দেশে একে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন করা আমাদের জাতীয় সাংস্কৃতিক পশ্চাৎপদতারই করুণ বহিঃপ্রকাশ।

সমাজতাত্ত্বিকভাবে বিচার করলে দেখা যায়, আবৃত্তি বিভাগ বাতিলের এই সিদ্ধান্তের নেতিবাচক প্রভাব কেবল মঞ্চের পরিবেশনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এর সুদূরপ্রসারী ক্ষতি হবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনন গঠনে। বর্তমান আকাশ সংস্কৃতি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবে প্রমিত বাংলা উচ্চারণের যে চরম বিপর্যয় ও বিকৃতি ঘটছে, তা রোধে আবৃত্তি চর্চা ছিল একটি শক্তিশালী সুরক্ষা দেয়াল। শিল্পকলা একাডেমি থেকে এই বিভাগটি বাদ দেওয়া মানে হলো নতুন প্রজন্মের জন্য শুদ্ধ বাংলা শিখনের একটি প্রধান ‘ইনকিউবেটর’ চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া। দেশের ৬৪টি জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে আবৃত্তি কোর্সে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অন্য অনেক বিভাগের তুলনায় বেশি হওয়া সত্ত্বেও কেন্দ্রীয়ভাবে একে অভিভাবকহীন রাখা হয়েছে। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক পদ বিলোপ নয়, বরং হাজার হাজার তরুণ প্রাণের আত্মপ্রকাশের ব্যাকরণকে মুছে ফেলা। যখন বাচনিক শুদ্ধাচার মুখ থুবড়ে পড়ে, তখন জাতীয় রুচিবোধের পতনও অনিবার্য হয়ে ওঠে।

​শিল্পকলা একাডেমি কোনো জড় আমলাতান্ত্রিক দপ্তর নয় যে কেবল গাণিতিক ছকে বা জনবলের হিসেবে শিল্পকে বিচার করবে; এটি একটি সংবেদনশীল ও জাতীয় আবেগবাহী প্রতিষ্ঠান। শিল্পের একেকটি শাখা একেকটি প্রাণকোষের মতো। কোনো একটি কোষকে নিষ্ক্রিয় করা মানে সামগ্রিক সাংস্কৃতিক দেহের পঙ্গুত্ব ডেকে আনা। আবৃত্তিকে নাট্যকলার অংশ বলে চালিয়ে দেওয়ার যুক্তিটি অনেকটা সমুদ্রকে পুকুরের অংশ বলার মতো হাস্যকর।

আবৃত্তি তার নিভৃত সাধনা, কবিতার অন্তর্নিহিত দর্শন এবং কণ্ঠের কারুকাজ দিয়ে যে মোহজাল তৈরি করে, তার জন্য প্রয়োজন আলাদা চর্চা ও গবেষণার পরিবেশ। বিভাগীয় প্রধান বা পরিচালক পদ না থাকায় আবৃত্তি বিষয়ক গবেষণালব্ধ জ্ঞান এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উৎসব আয়োজনের পথ স্থায়ীভাবে রুদ্ধ হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এটি মূলত একটি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন, যা আবৃত্তিশিল্পীদের শ্রম ও দীর্ঘদিনের সাধনাকে চরমভাবে অসম্মান করে।

​এ অবস্থায়, জাতীয় সাংস্কৃতিক মানদণ্ড বজায় রাখার স্বার্থে এই বৈষম্যমূলক ও ত্রুটিপূর্ণ অর্গানোগ্রাম সংশোধন করা এখন সময়ের ঐকান্তিক দাবি। ‘আবৃত্তি বিভাগ’ নামে একটি স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ বিভাগ সৃজন করে সেখানে একজন স্বতন্ত্র পরিচালক ও পর্যাপ্ত দক্ষ প্রশিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমেই কেবল এই শিল্পকে তার যোগ্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব। এটি কেবল একটি বিভাগের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই নয়, বরং বাঙালি সংস্কৃতির শৈল্পিক কণ্ঠস্বরকে প্রশাসনিক শৃঙ্খল থেকে মুক্ত রাখার প্রশ্ন।

একটি জাতির ভাষার মান ও রুচি রক্ষা পায় তার বাচনিক উৎকর্ষের মাধ্যমে; আর সেই কণ্ঠকে প্রশাসনিক আদেশে রোধ করা মানে জাতির আত্মাকেই অবরুদ্ধ করা। রাষ্ট্র ও একাডেমি কর্তৃপক্ষ অতিদ্রুত এই হঠকারী সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে আবৃত্তিকে তার যথাযোগ্য সম্মান ও স্থান ফিরিয়ে দেবে— এটাই জাতীয় সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধ সকল মানুষের প্রত্যাশা। আমাদের মনে রাখতে হবে, কবিতার মৃত্যু নেই, কিন্তু কবিতার কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হলে জাতির বিবেকই ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে।

লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল: b_golap@yahoo.com, 01712070133

(এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।)