বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি দীর্ঘদিন ধরেই একটি মৌলিক নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আর তা হলো ‘সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।‘ কিন্তু বৈশ্বিক ভূরাজনীতির পরিবর্তন, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির প্রতিযোগিতা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের ঘোষিত "পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতি" বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে সরকারের এই কৌশল ইতিমধ্যেই নীতিনির্ধারণী মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে এই নীতির সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের সক্ষমতা, কূটনৈতিক ভারসাম্য এবং অর্থনৈতিক ফলাফলের ওপর।
কেন পূর্বমুখী নীতি?
বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র ধীরে ধীরে আটলান্টিক অঞ্চল থেকে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে সরে এসেছে। বৈশ্বিক জিডিপির বড় অংশ, উৎপাদন, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের অন্যতম কেন্দ্র এখন পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। অথচ বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার এখনও ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা নির্ভর। কিন্তু আমদানি, শিল্পের কাঁচামাল, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর গুরুত্ব ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে এই অঞ্চলকে কৌশলগত অগ্রাধিকার দেওয়ার যৌক্তিকতা রয়েছে।
পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতিতে যে সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু বিষয় হলো:
১. বাণিজ্য ও বিনিয়োগ: জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া বিশ্বের বড় বিনিয়োগকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশ যদি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে উৎপাদন খাত, তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অবকাঠামোতে উল্লেখযোগ্য বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ সম্ভব।
২. শ্রমবাজার সম্প্রসারণ: বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস প্রবাসী আয়। মালয়েশিয়া, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পারলে এই বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।
৩. প্রযুক্তি ও শিল্পায়ন: জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া প্রযুক্তি স্থানান্তরের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে। সেমিকন্ডাক্টর, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিকস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিল্পে যৌথ উদ্যোগ বাংলাদেশের শিল্পায়নকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।
৪. আঞ্চলিক সংযোগ: বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত। সমুদ্রবন্দর, রেল, সড়ক ও অর্থনৈতিক করিডোর উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি আঞ্চলিক ট্রানজিট ও লজিস্টিক হাবে পরিণত হতে পারে।
পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ:
১. চীন-ভারত ভারসাম্য: বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হবে চীন ও ভারতের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন সহযোগী এবং অবকাঠামো বিনিয়োগকারী। অন্যদিকে ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী এবং নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রধান অংশীদার। পূর্বমুখী নীতি যেন কোনোভাবেই এক পক্ষের প্রতি অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ার বার্তা না দেয়, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
২. যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান: ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রও একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। বাংলাদেশ যদি পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে, তবে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কও শক্তিশালী রাখতে হবে।
৩. কূটনৈতিক সক্ষমতা: শুধু সফর বা সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর করলেই পররাষ্ট্রনীতি সফল হয় না। প্রয়োজন দক্ষ কূটনীতিক, কার্যকর ফলোআপ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক কূটনীতির সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে।
৪. অভ্যন্তরীণ সংস্কার: বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, দ্রুত সেবা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও উন্নত অবকাঠামো নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি না হলে পূর্বমুখী নীতির প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
তারেক রহমানের পূর্বমুখী নীতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে আরও বহুমাত্রিক করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। অর্থাৎ, কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে একাধিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণের কৌশল।
তবে বিরোধী রাজনৈতিক মহলের প্রশ্ন হলো, এই নীতি কতটা নতুন? কারণ অতীতের সরকারগুলোও জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করেছে। ফলে নতুন সরকারের সবচেয়ে বড়挑戰 হবে নীতির ঘোষণার চেয়ে বাস্তব ফলাফল দেখানো।
পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতিকে সফল করতে যেসকল বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন:
১. আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা যাচাই।
২. দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি।
৩. অর্থনৈতিক কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
৪. বন্দর ও লজিস্টিক অবকাঠামো আধুনিকীকরণ।
৫. আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্পে সক্রিয় অংশগ্রহণ।
৬. চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা।
বাংলাদেশের জন্য পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতি একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ হতে পারে। কারণ আগামী কয়েক দশকে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির বড় অংশই এশিয়া অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত থাকবে। কিন্তু এই নীতির সফলতা নির্ভর করবে ঘোষণার ওপর নয়, বাস্তব প্রয়োগের ওপর। যদি সরকার অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, তবে এই নীতি বাংলাদেশকে নতুন বিনিয়োগ, উন্নত প্রযুক্তি, বৃহত্তর শ্রমবাজার এবং আঞ্চলিক সংযোগের সুযোগ এনে দিতে পারে। অন্যদিকে কূটনৈতিক ভারসাম্য হারালে বা অভ্যন্তরীণ সংস্কার পিছিয়ে থাকলে এই উদ্যোগ প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারবে না।
সবশেষে বলা যায়, পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। এখন দেখার বিষয়, এই সম্ভাবনাকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দিতে সরকার কতটা দক্ষতার পরিচয় দিতে পারে।
লেখক: ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]