ফ্যাসিবাদ তখন চরমে; রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গুম, খুনসহ নানা দমন-পীড়নে গোটা দেশে এক ভয়ের সংস্কৃতি। তেমনই এক ক্রান্তিলগ্নে ‘বৈষম্যহীন বাংলাদেশ’ গড়ার ডাক দেয় ছাত্র-জনতার ‘শ্রাবণ বিদ্রোহ’ বা জুলাই গণঅভ্যুত্থান। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হামলা এবং তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সরাসরি গুলি চালানো শুরু করলে তা এক রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনে দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের এক স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা।
তবে চব্বিশের জুলাই-আগস্টের এই ঐতিহাসিক পটভূমি এক দিনে তৈরি হয়নি। ২০১১ সালে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা’ বাতিল হওয়ার পর থেকেই নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদে সাধারণ মানুষকে রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানিয়ে আসছে বিএনপি। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধরপাকড় ও বন্দুকের গুলির মুখে সেই আন্দোলন অতটা বেগবান হয়নি। তবে জুলাইয়ে বন্দুকের গুলির সামনে বুক পেতে দেওয়া আবু সাঈদদের আত্মত্যাগ ছাত্র-জনতার মৃত্যুভয়কে হাওয়ায় মিলিয়ে দিয়েছিল। উত্তাল সেই দিনগুলোতে সুদূর লন্ডনে নির্বাসিত থেকেও প্রতিনিয়ত দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়েও বাংলাদেশের রাজনীতিতে নানা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ শুরু হয়। আন্দোলনের অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়। তবে ইতিহাস বলে, একটি গণ-আন্দোলন কখনো একক কোনো রাজনৈতিক দলের দ্বারা সংঘটিত হয় না। রাজনৈতিক দলগুলো সেখানে সক্রিয় থাকে বা তাদের আহ্বানে তা ঘটতে পারে, তবে মূল কৃতিত্ব আপামর জনগণের। কারণ তাঁরা রাজপথে না নেমে এলে সেই অর্জন কখনোই সম্ভব হতো না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও ছিল নানা শ্রেণি-পেশা ও মতাদর্শের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী’ কিংবা ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার’ আন্দোলনে থাকা বিএনপি ও তার জোটসঙ্গীরাও রাজপথে সক্রিয় ছিল।
অনেকে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে বিএনপির সর্বোচ্চ নেতা তারেক রহমানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কেউ কেউ বিএনপির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তবে দীর্ঘ এক দশক আগে থেকেই শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে সক্রিয় ছিল দলটি। জুলাইয়ে ছাত্র আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে নিজের ইউটিউব চ্যানেলে চলমান পরিস্থিতি তুলে ধরে জনগণ ও নেতাকর্মীদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন তারেক রহমান। যেহেতু সে সময়ে মূলধারার গণমাধ্যমে তাঁর বক্তব্য প্রচারে আইনি নিষেধাজ্ঞা ছিল, তাই সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই তিনি দিকনির্দেশনা পৌঁছে দিতেন।
১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদ, চট্টগ্রামে ওয়াসিম আকরামসহ দেশজুড়ে অন্তত ছয়জন নিহত হওয়ার পর বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন এবং তাৎক্ষণিক একটি মিছিল বের করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি একাত্মতা জানায় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। তৎকালীন সরকার যেকোনো আন্দোলনকে ‘বিএনপি-ছাত্রদল’ কিংবা ‘জামায়াত-শিবির’ ট্যাগ দিয়ে দমনের চেষ্টা করত। ফলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য বিএনপি ও ছাত্রদলের বড় অংশই কৌশলগতভাবে ছাত্র-জনতার সঙ্গে মিশে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। রক্তঝরা এই আন্দোলনে ছাত্রদলের ১৪২ জন নেতাকর্মী প্রাণ দেন। এ ছাড়া ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ আন্দোলন পর্বে ছাত্রদলের অসংখ্য নেতাকর্মী গুম ও নিগ্রহের শিকার হন।
১৬ জুলাই মধ্যরাতে নয়াপল্টনে বিএনপির কার্যালয়ে ডিবি পুলিশ অভিযান পরিচালনা করার পরদিনই ‘শিক্ষার্থী হত্যাযজ্ঞকে রাজনৈতিক রূপ দিতে বিএনপি কার্যালয়ে পুলিশি রেইড’ শিরোনামে ভিডিও বার্তা দেন তারেক রহমান। সেখানে তিনি বলেন, ‘প্রিয় দেশবাসী, গত ১৬-১৭ বছরে বারবার প্রমাণিত হয়েছে শেখ হাসিনার হাতে কেউ নিরাপদ নয়, এমনকি আমাদের মাতৃভূমির স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বও নিরাপদ নয়।’ সবশেষে তিনি ‘দফা এক, দাবি এক, শেখ হাসিনার পদত্যাগ’ স্লোগানের আহ্বান জানান।
১৯ জুলাই দেশজুড়ে শিক্ষার্থী হত্যার প্রতিবাদে রাজপথে নামেন ছাত্র-জনতা। চারদিকে কারফিউ ও ইন্টারনেট বন্ধের অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের প্রতি তারেক রহমানের আহ্বান ছিল, বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার। ২১ জুলাই এবং ১ আগস্টও পৃথক ভিডিও বার্তায় তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং সারা দেশে দমন-পীড়নের চিত্র তুলে ধরেন।
মুক্তিকামী ছাত্র-জনতার চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের আগপর্যন্ত জুলাই আন্দোলনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে বিএনপির নীতি ও অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন তারেক রহমান। অন্যদিকে, সেই উত্তাল দিনগুলোতে বিএনপির চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। দীর্ঘ গৃহবন্দিত্ব ও শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও দেশের এই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী হন তিনি।
লেখক: সংবাদকর্মী
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]