সংলাপ নিয়ে কী ভাবছে আওয়ামী লীগ

সদ্য বাংলাদেশ সফর শেষ করে যাওয়া মার্কিন প্রাক–নির্বাচনী পর্যবেক্ষক দল জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সরকারকে যে ৫টি পরামর্শ দিয়েছে তার প্রথমটিই হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই প্রস্তাবে তাদের আপত্তি নেই। তবে সংলাপ হতে হবে যে কোনো শর্তমুক্ত।

বর্তমান একাদশ সংসদের মেয়াদ প্রায় শেষ। এখন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। সাংবিধানিক বাধ্যবাধ্যকতা থাকায় নির্বাচন হতে হবে এ বছরের নভেম্বর থেকে আগামী বছরের জানুয়ারির মধ্যে। এখনো নির্বাচনের দিনক্ষণ ঠিক না হলেও কমিশন বলছে, আগামী নভেম্বরে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে। আর ভোট হতে পারে জানুয়ারির শুরুতে।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল বিশেষ করে বিএনপি ও তাদের জোট সঙ্গীদের আনতে আওয়ামী লীগের ওপর চাপ আছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমঝোতায় সংলাপ বা আলোচনার বিকল্প কোন পথ দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু নির্বাচন এগিয়ে এলেও এখনো নিজেদের অবস্থানে অনড় বড় দুই রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি ও আওয়ামী লীগ।

বিএনপি বলে আসছে, এই সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে তারা অংশ নেবে না। এর অংশ হিসেবে গত কয়েক বছরে সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় যে নির্বাচনগুলো হয়েছে, সেগুলোতে কোনো প্রার্থী দেয়নি বিএনপি ও তাদের জোট সঙ্গীরা। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে যারা প্রার্থী হয়েছিলেন তাদের অনেককেই আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। এখন সরকারের পদত্যাগ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে রাজপথে নানা কর্মসুচি পালন করছেন দলটির নেতা–কর্মীরা।

আওয়ামী লীগও বলে আসছে, উচ্চ আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত হওয়ায় এটি আর ফিরিয়ে আনার সুযোগ নেই। আগামী নির্বাচন হবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পদে রেখে, নির্বাচন কমিশনের অধীনে।

মার্কিন প্রতিনিধিদের দেওয়া প্রস্তাব নিয়ে রোববার গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন সরকারের দুই প্রভাবশালী মন্ত্রী। এর মধ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাফ জানিয়েছেন, সংবিধান অনুযায়ী সময়মতো নির্বাচন হবে। বিএনপির দাবি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ বা সংসদ বিলুপ্তির শর্তযুক্ত কোনো সংলাপ করবে না আওয়ামী লীগ।

সচিবালয়ে সাংবাদিকদের দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় কাদের আরও বলেন, ‘তারা (বিএনপি) পার্লামেন্টে রেজ্যুলুসন চায়, তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায়, এই শর্তযুক্ত সংলাপে আমরা রাজি হব কি না..। সংলাপের চিন্তা আমরা করব তখন, এই চারটা শর্ত যদি তারা প্রত্যাহার করে নেয়।’

অন্যদিকে, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলছেন, রাজনৈতিক সংলাপ নিয়ে কোনো আইনি প্রতিবন্ধকতা নেই। তবে সংবিধান ও আইন মেনে নির্বাচনে আসলে আলোচনার প্রয়োজন নেই।

আনিসুল হক বলেন, ‘সংবিধান ও আইন মেনে নির্বাচন হবে। সংবিধানের বাইরে বা প্রচলিত আইনের বাইরে যা আছে, তার বাইরে কোনো সংলাপ হতে পারে না।’

এর আগেও জাতীয় নির্বাচনের আগে সংলাপে বসেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। দুই দলের নেতাদের মধ্যে সবশেষ সংলাপটি হয় ২০১৮ সালের একাদশ নির্বাচনের আগে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান দুটি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ায় সে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। সেবার বিএনপি নির্বাচনে আসে জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট নামের একটি জোটের মাধ্যমে। সেই জোটের নেতৃত্বে ছিলেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন।

সংলাপের পর আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচনে আসতে সম্মত হয় বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট। তবে নির্বাচনে সুবিধা করতে পারেনি জোট। বিএনপি সেই নির্বাচনে পেয়েছিল মাত্র ৭টি আসন।

তাদের আগের জাতীয় নির্বাচন অর্থাৎ ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সংলাপের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। সেই নির্বাচনে বিএনপি ও তাদের জোট শরীকরা অংশ নেয়নি। নির্বাচনে যাতে বিএনপি অংশ নেয় তা নিশ্চিত করতে বিদেশিদের মধ্যস্থতায়ও একাধিক মীমাংসার চেষ্টা হয়েছে। তবে এই প্রচেষ্টাগুলোও ব্যর্থ হয়।