গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করব: জামায়াত আমির 

মুষলধারে বৃষ্টিকেও উপেক্ষা করে শনিবার বিকেলে রংপুরে ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে নেতাকর্মীদের ঢল নামে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় কার্যকর করা, সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন বন্ধ এবং জনদুর্ভোগ নিরসনের চার দফা দাবিতে আয়োজিত এ সমাবেশে সকাল থেকেই রংপুর বিভাগের আট জেলার বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন থেকে মিছিল নিয়ে জিলা স্কুল মাঠে জড়ো হন হাজারো নেতাকর্মী ও সমর্থক।

আয়োজকদের দাবি, প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও লাখো মানুষের উপস্থিতি তাদের আন্দোলনের প্রতি জনসমর্থনের বহিঃপ্রকাশ। 

রংপুর নগরীর রংপুর জিলা স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। 
সমাবেশে বক্তব্য দেন এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম এবং ১১ দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয় ও রংপুর বিভাগের নেতারা।

দুপুর আড়াইটার পর আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামলেও সমাবেশস্থল ছাড়েননি নেতাকর্মীরা। ছাতা, পলিথিন কিংবা ভেজা কাপড়েই তারা মাঠে অবস্থান নিয়ে নেতাদের বক্তব্য শোনেন। বৃষ্টি উপেক্ষা করে স্লোগান, ব্যানার ও ফেস্টুনে মুখর হয়ে ওঠে পুরো জিলা স্কুল মাঠ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণভোট বাস্তবায়নের দাবি থেকে তাদের সরিয়ে নিতে নানা অপচেষ্টা চলছে। কিন্তু জনগণের সঙ্গে দেওয়া অঙ্গীকার থেকে তারা সরে আসবেন না।

শফিকুর রহমান বলেন, “আমাদেরকে বিভিন্নভাবে গণভোট বাস্তবায়নের দাবি থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু আমরা জাতির সঙ্গে বেইমানি করতে পারব না। জাতির কাছে আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, এই লড়াই অব্যাহত থাকবে। গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করবো, ইনশাআল্লাহ। এই দাবি থেকে আমরা একচুলও সরব না।”

রংপুরকে জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত ভূমি উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, “আবু সাঈদের রক্তে ভেজা এই রংপুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে আবারও অঙ্গীকার করছি-জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চলবে। বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্য যে আন্দোলন হয়েছিল, গণভোট ছিল সেই সংস্কার প্রক্রিয়ারই অংশ। জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়ন করতেই হবে।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একসময় বলেছিলেন, দুটি ভোট দেবেন-একটি নিজের দলের জন্য, অন্যটি গণভোটের পক্ষে। প্রথম প্রতিশ্রুতি তিনি রক্ষা করেছেন, কিন্তু দ্বিতীয়টি রক্ষা করেননি। জনগণের দেওয়া রায়ের প্রতি সম্মান দেখানো হয়নি।”

সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের কঠোর সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে গিয়েছিলেন। বিরোধী দল হিসেবে আমরা সংসদে তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেই সফরের অর্জন কোথায়? আমাদের মূল্যায়নে চীন সফরের অর্জন শূন্য। তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে কোনো স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়েও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।”

তিনি আরও বলেন, “দেশে জাতীয় ঐক্য না থাকলে পৃথিবীর কোনো দেশ বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে না। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা ছাড়া অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।”

নাহিদ ইসলাম দাবি করেন, “আইএমএফ ইতোমধ্যে সরকারকে নতুন ঋণ না দেওয়ার কথা জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলেও সরকারের প্রতি আস্থা কমছে। জাতীয় ঐক্য ছাড়া বিদেশি সহযোগিতা পাওয়া কঠিন হবে।”

সমাবেশে বক্তারা বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষ নদীভাঙন, বন্যা ও শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা, কথিত পুশ-ইন বন্ধ এবং জনদুর্ভোগ নিরসনে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তারা।

বক্তারা আরও বলেন, চার দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চলবে এবং প্রয়োজন হলে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

সমাবেশকে ঘিরে সকাল থেকেই রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলের বহরে নেতাকর্মীরা রংপুরে আসেন। বিকেলের প্রবল বর্ষণেও জিলা স্কুল মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। সমাবেশে উপস্থিত নেতারা দাবি করেন, উত্তরাঞ্চলের মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায় এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করতেই তাদের এ আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।