বিএনপির সঙ্গে সংলাপ: আওয়ামী লীগ নেতারা যা বলছেন

জাতীয় নির্বাচনের সময় যতো এগিয়ে আসছে ততই দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সংলাপের জল্পনা শাখা প্রশাখা মেলছে।

সংলাপের এই আলোচনা আরও উস্কে দিয়েছে ক্ষমতাশীন দলের নেতাদের পরস্পর বিরোধী মন্তব্য। একদিকে, আওয়ামী লীগের প্রবীন নেতা ও দলটির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু বলছেন, জাতিসংঘের মধ্যস্ততায় সংলাপের কথা। অন্যদিকে, দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলছেন, বিএনপির সাথে সংলাপের কোনো সিদ্ধান্তই হয়নি।

একাদশ সংসদের মেয়াদ শেষের দিকে। এ বছরের শেষে বা আগামী বছরের শুরুতে অনুষ্ঠিত হতে পারে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন। বর্তমান একাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো ২০১৯ সালের ৩০ জানুয়ারি। সে হিসেবে চলতি বছরের নভেম্বর থেকে আগামী বছরের ২৯ জানুয়ারির মধ্যে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল বিশেষ করে বিএনপি ও তাদের জোট সঙ্গীদের আনতে আওয়ামী লীগের উপর চাপও রয়েছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমঝোতায় সংলাপ বা আলোচনার বিকল্প কোন পথ দেখা যাচ্ছে না।

নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে এখনও নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে দুই দল। বিএনপির দাবি আগামী নির্বাচন হতে হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। আর আওয়ামী লীগ বলছে, এই পদ্ধতি ফিরিয়ে আনার আর সুযোগ নেই।

এরই মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে হওয়া সব নির্বাচন বর্জন করেছে বিএনপি। সম্প্রতিক ৫ সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও নিজেদের কোনো প্রার্থী দেয়নি দলটি। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে যারা প্রার্থী হয়েছিলেন তাদের অনেককেই দল থেকে আজীবনের জন্য বহিস্কার করা হয়েছে।

গত মঙ্গলবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে কেন্দ্রীয় ১৪ দলের এক সভায় জোটটির সমন্বয়ক ও আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমুর একটি বক্তব্য সংলাপ নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সেই জনসভায় আমু বলেন, ‘জাতিসংঘের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি আসুক। আমরা বিএনপির সাথে মুখোমুখি বসে আলোচনা করে দেখতে চাই।’

এর একদিন পরই সংলাপের এ সম্ভাবনা নাকচ করে দেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলছেন, সংলাপে বসার কোনো সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। আর জাতিসংঘের মধ্যস্ততা করার মতো কোনো অবস্থাও দেশে নেই।

ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘জাতিসংঘ কেন মধ্যস্থতা করবে? আমাদের দেশে এমন কোনো রাজনৈতিক সংকট হয়নি যে জাতিসংঘের এখানে ইন্টারফেয়ারেন্সের প্রয়োজন আছে। সময় বলে দেবে কখন কী হবে। আপাতত আলাপ আলোচনার সিদ্ধান্ত হয়নি।’

একই সাথে বিএনপির সাথে কেন সংলাপ হবে তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক। তার মতে, যারা আওয়ামী লীগ সভাপতিকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে, বিদেশিদের কাছে মিথ্যা নালিশ করেছে তাদের সাথে আলোচনা কিসের?

ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘তারা আমাদের নেত্রীকে হত্যার হুমকি দিয়েছে তাদের সাথে আমরা কি আলোচনা করবো? তারা আজ নালিশের রাজনীতি করছে। যারা আমেরিকার কাছে নালিশ করেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে নালিশ করে কি পেয়েছে? পেয়েছে ঘোড়ার ডিম।’

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদও বলছেন, সংলাপ নিয়ে আওয়ামী লীগ ও কেন্দ্রীয় ১৪ দলে কোনো আলোচনা হয়নি।

সচিবালয়ে বুধবার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর বক্তব্যকে ব্যক্তিগত বলে মত দেন। তিনি বলেন, ‘আমির হোসেন আমু আমাদের ১৪ দলের অন্যতম জ্যেষ্ঠ নেতা। তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটি তার ব্যক্তিগত বক্তব্য। তাঁর এ বক্তব্য নিয়ে আমাদের দলের মধ্যে, সরকারের মধ্যে কোনো আলোচনা হয় নাই। এমনকি ১৪ দলের মধ্যেও কোনো আলোচনা হয় নাই।’

তথ্যমন্ত্রী জানান, নির্বাচন নিয়ে বিএনপির কিছু বলার থাকলে তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সাথেই আলোচনায় বসতে হবে। নির্বাচন কমিশন ডাকলে আওয়ামী লীগও আলোচনায় যেতে পারে বলেও জানান তিনি

হাছান মাহমুদ বলেন, ‘আমরা চাই সে নির্বাচনে বিএনপিসহ সমস্ত রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করুক এবং সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি অত্যন্ত চমৎকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক, বিশ্বের কাছে উদাহরণ হিসেবে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক, সেটিই আমরা চাই। নির্বাচন নিয়ে যদি কোনো প্রসঙ্গ থাকে বিএনপিকে সেটি নির্বাচন কমিশনের সাথে আলোচনা করতে হবে কারণ নির্বাচন আয়োজন অনুষ্ঠান করছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশন যদি আমাদের ডাকে আমরাও যাবো।’

এদিকে সংলাপ নিয়ে যে আলোচনা তা জিইয়ে রাখছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের আরেকটি বক্তব্য। বুধবার এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের এক নেতা বলেছেন সংলাপ অব্যাহত থাকবে। অবশ্যই সংলাপের বিকল্প নেই। আমরা মনে করি সব কিছুই সংলাপের মাধ্যমে আলোচনার মাধ্যমেই শেষ করতে হবে। এবং আমরা সেটাই বিশ্বাস করি।’

এর আগেও জাতীয় নির্বাচনের আগে সংলাপে বসেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। দুই দলের নেতাদের মধ্যে সবশেষ সংলাপটি হয় ২০১৮ সালের একাদশ নির্বাচনের আগে। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ও ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান দুটি মামলায় দন্ডপ্রাপ্ত হওয়ায় সে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন নি। সেবার বিএনপি নির্বাচনে আসে জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট নামের একটি জোটের মাধ্যমে। সেই জোটের নেতৃত্বে ছিলেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন।

সংলাপের পর আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচনে আসতে সম্মত হয় বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট। তবে নির্বাচনে সুবিধা করতে পারেনি জোট। বিএনপি সেই নির্বাচনে পেয়েছিলো মাত্র ৭টি আসন।

তাদের আগের জাতীয় নির্বাচন অর্থাৎ ২০১৪ সালের ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সংলাপের উদ্যোগ নেয়া হলেও তা শেষ পর্যন্ত ব্যার্থ হয়। সেই নির্বাচনে বিএনপি ও তাদের জোট শরীকরা অংশ নেয়নি। নির্বাচনে যাতে বিএনপি অংশ নেয় তা নিশ্চিত করতে বিদেশীদের মধ্যস্থতায়ও একাধিক মীমাংসার চেষ্টা হয়েছে। তবে এই প্রচেষ্টাগুলোও ব্যার্থ হয়।