মাইক্রোচিপস নিয়ে আমেরিকা-চীনের দ্বন্দ্ব কেন?

মাইক্রোচিপস নিয়ে নতুন যুদ্ধ শুরু হয়েছে চীন ও আমেরিকার মধ্যে। জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে আমেরিকা সম্প্রতি সবচেয়ে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর পাওয়ার বিষয়টি চীনের জন্য কঠিন করে তুলছে। চীন বলছে, আমেরিকা এভাবে চালাচ্ছে ‘প্রযুক্তিগত সন্ত্রাস’। আর আমেরিকার দাবি, চীনকে এভাবে না ঠেকালে ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

এবার চলুন, জেনে নেওয়া যাক, মাইক্রোচিপস কি? এ নিয়ে আমেরিকা-চীন মারামারি করছে কেন?

আধুনিক বৈশ্বিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো মাইক্রোচিপস। সব ধরনের ইলেকট্রনিকস পণ্য তৈরিতেই কাজে লাগে সিলিকনের তৈরি ছোট্ট এই মাইক্রোচিপস। এলইডি লাইট থেকে শুরু করে ওয়াশিং মেশিন, গাড়ি বা স্মার্টফোন – সব কিছুতেই প্রয়োজন হয় এই চিপস।

মাইক্রোচিপ হলো সিলিকনের পাতের ওপর বসানো এক ঝাঁক ইন্টিগ্রেটেড সার্কিটের সেট। একে সেমিকন্ডাক্টর নামেও ডাকা হয়। গত বছর প্রকাশিত ম্যাককিনসে রিপোর্টের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এই সেমিকন্ডাক্টরের বৈশ্বিক বাজারের আকার হবে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের মতো।

এই সেমিকন্ডাক্টর আমদানি করতে হয় চীনকেও। ২০২১ সালে চীন প্রায় ৪৩০ বিলিয়ন ডলারের সেমিকন্ডাক্টর আমদানি করেছে। ওই বছর তেল আমদানিতেও এর চেয়ে কম ব্যয় করেছে চীন। এ থেকেও কিন্তু বোঝা যায় চীনের কাছে সেমিকন্ডাক্টর কতটা দামী!

এবার জানা যাক, কেন চীনের বাড়া ভাতে ছাই দিচ্ছে আমেরিকা?

আমেরিকা মূলত চীনের এই সেমিকন্ডাক্টর আমদানিতে বাধা দিতে চাইছে। কারণ বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস পণ্যের পাশাপাশি হাইপারসনিক মিসাইল, স্টিলথ ফাইটার জেট তৈরিতেও প্রয়োজন হয় সেমিকন্ডাক্টর বা মাইক্রোচিপস। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নেও প্রয়োজন হয় উন্নতমানের মাইক্রোচিপস। আর এসব খাতে চীনকে পিছিয়ে রাখতেই সেমিকন্ডাক্টর বাণিজ্যে রাশ টানছে আমেরিকা। গত বছরই এ ক্ষেত্রে রপ্তানির নীতিতে এক ঝাঁক নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ নেয় দেশটি। বলা হচ্ছে, চীন যাতে সামরিক খাতে উন্নত মানের সেমিকন্ডাক্টর ব্যবহার করতে না পারে, সেদিকে লক্ষ্য রেখেই এমন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।

আমেরিকা এমন নিয়ন্ত্রণ আরোপের পর একই পথে পা বাড়িয়েছে নেদারল্যান্ডস, জাপানসহ বিভিন্ন দেশ। এসব নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপে কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম সরাসরি উল্লেখ না করলেও, আসলে এতে মূলত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চীন।

সেমিকন্ডাক্টরের উৎপাদনের সামগ্রিক ব্যবস্থাটিতে অসংখ্য দেশ জড়িত। এতে পর্যায়ও আছে অনেক। তবে বেশির ভাগ পর্যায় সরাসরি আমেরিকার অবদানের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া মূল ভূমিকায় আছে জাপান ও নেদারল্যান্ডস। এই তিনটি দেশের প্রধান ভূমিকার অন্যতম কারণ হলো এদের হাতে আছে লিথোগ্রাফি মেশিনের চাবিকাঠি। এই মেশিন দিয়েই সিলিকন ওয়েফারের ওপর নির্দিষ্ট ইন্টিগ্রেটেড সার্কিটের প্যাটার্ন প্রিন্ট করা হয়। আর এটিই মাইক্রোচিপস তৈরির প্রধান ধাপের একটি।

এভাবে সেমিকন্ডাক্টর বা মাইক্রোচিপস তৈরির প্রধান প্রধান ধাপের নিয়ন্ত্রণ আমেরিকা, জাপান ও নেদারল্যান্ডসের হাতে থাকার কারণে পুরো সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রিতে এই তিন দেশের অসীম প্রভাব আছে। আর এই তিন দেশই রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় চীনের বারোটা প্রায় বাজার পথে।

চীন অবশ্য সেমিকন্ডাক্টর কিনে মজুত করা শুরু করে দিয়েছে। তবে তাতেও শেষ রক্ষা হবে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ এক না এক সময় চীনের মজুতে টান পড়বেই। আর তখনই একের পর এক কাজ হারাতে শুরু করবে চীনা কোম্পানিগুলো। এরই মধ্যে এর লক্ষণও দেখা দিয়েছে।

চীন তাই আমেরিকার এসব কাজের সমালোচনার পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠার চেষ্টা চালাচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সেস এ সংক্রান্ত একটি ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করে। তাতে সেমিকন্ডাক্টর সংশ্লিষ্ট গবেষণা ও ট্যালেন্ট হান্টে বিনিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এভাবে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠার চেষ্টা চালাচ্ছে চীন।

বার্তা সংস্থা এএফপি বলছে, এই চেষ্টায় সুফল পেতে লম্বা সময় লাগবে চীনের। পুরো প্রক্রিয়াটিতে সফল হওয়াটা এত সহজ নয়। তার পরও বিনিয়োগ বাড়িয়ে আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে মাইক্রোচিপসে ৭০ শতাংশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে চীন। যদিও বিভিন্ন চিন্তক প্রতিষ্ঠানের শঙ্কা, ওই সময়ে মধ্যে ২০ শতাংশের বেশি অর্জিত হবে না। অর্থাৎ, আজ হোক, কাল হোক বা পরশু, সংকটে পড়তেই যাচ্ছে চীন।

কিন্তু যেহেতু সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের রাস্তায় একবার হাঁটতে শুরু করে দিয়েছে চীন, সেহেতু সময় বেশি লাগলেও এক না এক সময় চীন কিছুটা এগিয়ে যাবেই। আর তখনই শুরু হবে আসল খেলা। কারণ তখন আর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে ঠেকানো যাবে না চীনকে। সেই সময়টায় চীনকে মোকাবিলার উপায় কি জানা আছে আমেরিকার? সময়ই দেবে এর উত্তর।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স ও এএফপি