তাসকিনদের বলে আর কতটা, বাউন্স বেশি তো রাজশাহীর মালিকের চেকে

বিপিএল। দুর্বার রাজশাহী। এবারের বিপিএলে যত নাটক হয়েছে, তাতে এই দুটি নাম একসঙ্গে শুনলেই পাঠকমনে হয়তো প্রশ্ন জেগে যাবে – বেতন নিয়ে নতুন কোনো ঝামেলা পাকিয়েছে রাজশাহীর ফ্র্যাঞ্চাইজিটি?

এবং যথারীতি উত্তর – হ্যাঁ। আজ দুপুর পর্যন্তও আরেক দফা রাজশাহীর পক্ষ থেকে খেলোয়াড়দের দেওয়া চেক প্রত্যাখ্যাত হয়েছে বলে জানা গেছে। গত রোববার ম্যাচের আগে চেকগুলো দেওয়া হয়েছিল।

মজার ব্যাপার, সেদিন ম্যাচের পর টুর্নামেন্টের মাঝপথে রাজশাহীর অধিনায়কত্ব পাওয়া তাসকিন আহমেদ সংবাদ সম্মেলনে হেসে বলেছিলেন, তিনি আশা করেন, চেকটা মিরপুরের উইকেটের মতো বাউন্স করবে না। কিন্তু আজ দুপুর পর্যন্ত পরিস্থিতি দেখে মনে হতে পারে, মিরপুরের উইকেটের চেয়েও রাজশাহীর দেওয়া চেকের ‘বাউন্স’ করার হার বেশি!   

বেতন দিতে গড়িমসি, চট্টগ্রাম পর্বে হোটেলের বিল বকেয়া থাকা নিয়ে ঝামেলা, এরপর ঢাকায় ম্যাচের দিন সকালে হঠাৎ হোটেল বদল, এসবের সঙ্গে আজ যোগ হলো খেলোয়াড়দের ১৮ দিনের টিএ/ডিএ-ও দেওয়া হয়নি… বিপিএলে এবার এক রাজশাহীকে ঘিরেই এত নাটক যে, অন্য দলগুলোর বেতন বকেয়া থাকলেও সেটি আর খবরে আসছে না।

চট্টগ্রাম পর্বে গত ১৫ জানুয়ারি রাজশাহীর দেশি খেলোয়াড়েরা তখন পর্যন্ত কোনো টাকাই না পাওয়ায় অনুশীলন বয়কট করেন। সে সময়ে ১৭ জানুয়ারি তাদের পরের ম্যাচে মাঠে না নামার হুমকিও দিয়েছিলেন ক্রিকেটাররা। তড়িঘড়ি ঘরে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে উড়ে যাওয়া বিসিবি সভাপতি ফারুক আহমেদ, রাজশাহীর মালিকপক্ষ তখন ২৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধ ও আরও ২৫ শতাংশের চেক দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে তাঁদের মাঠে ফেরায়।  

কিন্তু চট্টগ্রাম পর্বেই একবার চেক প্রত্যাখ্যাত হয় রাজশাহীর। তখন শোনা যায়, রাজশাহীর অনুশীলনের সময়ে মালিকের স্ত্রীর হাতে বল লাগায় তাঁকে ব্যাংকক নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, রাজশাহীর মালিকও সেখানে ছিলেন। সে কারণে তাঁর সঙ্গে ব্যাংক থেকে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে চেক প্রত্যাখ্যাত হয়েছে!

সেই অজুহাতের পর রাজশাহীর দেশি খেলোয়াড়েরা গত পরশু ম্যাচের আগে আবার হাতে চেক পান। বিপিএলের শুরুর দিকে রাজশাহীর অধিনায়ক এনামুল হক বিজয় ফেসবুকে চেক হাতে ক্রিকেটারদের ছবি পোস্ট করে লেখেন, ‘অল ইজ ওয়েল।’ কিন্তু ‘অল’ আর ‘ওয়েল’ হলো কোথায়!

সেদিনই রাজশাহীর বিদেশি ক্রিকেটাররা বেতন না পাওয়ায় ম্যাচে খেলেননি। বিপিএলে ম্যাচে অন্তত দুজন বিদেশিকে একাদশে রাখার নিয়ম থাকলেও সেদিন বিসিবির বিশেষ অনুমতিতে ম্যাচটা খেলতে নামে রাজশাহী। দেশি বোলারদের দারুণ বোলিংয়ে ১২০ রান করা রাজশাহী ম্যাচটা জিতেও যায়! এরপর গতকাল অবশ্য বিদেশিরা মাঠে গেছেন, দুজন একাদশে ছিলেন, রাজশাহী ম্যাচটা জিতে প্লে-অফের সম্ভাবনাও উজ্জ্বল করেছে, তবে মোহাম্মদ হারিস খেলেননি।

এর মধ্যে আজ জানা গেল, দুদিন আগে দেশি ক্রিকেটারদের যে চেক দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর বেশ কয়েকটি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। আগেই গুঞ্জন ছিল, চেক দিলেও রাজশাহীর মালিকপক্ষ খেলোয়াড়দের বলে রেখেছিল, যাতে মঙ্গলবারের আগে চেক ব্যাংকে জমা না দেন ক্রিকেটাররা। গতকাল দু-তিনজন ক্রিকেটার চেক জমা দিয়েছেন বলে শোনা যায়। সেগুলো প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এরপর আজ যে ক্রিকেটাররা চেক জমা দিয়েছেন ব্যাংকে, তাঁদেরও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে চেকের বিপরীতে এত টাকা রাজশাহীর ব্যাংক হিসেবে নেই।

ক্রিকেটাররা আজ বিকেল ৪টায় ব্যাংকে লেনদেনের সময় শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন বলে জানিয়েছেন। এরপর সন্ধ্যায় ক্রিকেটারদের মিটিং হতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে। গ্রুপ পর্বে রাজশাহীর আর ম্যাচ নেই, প্লে-অফে তাদের ওঠা-না ওঠা নির্ভর করছে চিটাগং কিংস ও খুলনা টাইগার্সের ওপর। এই মুহূর্তে রাজশাহী ১২ ম্যাচে ১২ পয়েন্ট নিয়ে তালিকার তিন নম্বরে, চারে থাকা চিটাগংয়ের পয়েন্ট ৯ ম্যাচে ১০, আর খুলনা ১০ ম্যাচে ৮ পয়েন্ট নিয়ে পাঁচ নম্বরে। অর্থাৎ, প্লে-অফে গেলে অন্তত একটা ম্যাচ পাবে রাজশাহী, না গেলে তো তাদের টুর্নামেন্টই শেষ। এই পরিস্থিতিতে ক্রিকেটাররা দুশ্চিন্তায়। তা-ই হওয়ার কথা, টুর্নামেন্ট চলার পথেই বেতন নিয়ে এমন ঝক্কিতে ফেলা মালিকপক্ষ টুর্নামেন্ট শেষে কত টালবাহানা করবে এ দুশ্চিন্তা তো না চাইতেও চলে আসে।

এখানেই শেষ নয়! রাজশাহীর চেক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার এই ইস্যু নিয়ে আজ বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম কথা বলেছে রাজশাহীর ম্যানেজার ও জাতীয় দলের সাবেক ওপেনার মেহেরাব হোসেন অপির সঙ্গে। তিনি স্বাভাবিকভাবেই দ্রুতই সব সমাধান হওয়ার আশা দেখিয়েছেন, খেলোয়াড়েরা তাঁর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অভিযোগ করেননি বলেও পাশ কাটিয়ে গেলেন। তবে এর মধ্যেই অপির কাছ থেকে জানা গেল, ক্রিকেটাররা তা-ও কিছু অর্থ পেয়েছেন, তিনি নিজে এখনো কোনো টাকাই পাননি!

‘আমি নিজেও এখনও পাইনি টাকা। মালিকপক্ষ আমাকে একটা তারিখ দিয়েছে। সেই দিনের অপেক্ষায় আছি। তবে অন্যান্য ক্রিকেটার বা বাকিদের ২৫ শতাংশ দেওয়া হয়েছে। গত পরশু আরও ২৫ শতাংশ অর্থের চেক দেওয়া হয়েছে’ – এতটুকুই জানিয়েছেন অপি।

এর মধ্যে খেলার কারণে না হলেও রাজশাহী ও অন্যান্য ফ্র্যাঞ্চাইজিদের ক্রিকেটারদের বেতনের ইস্যু নিয়ে এই টালবাহানার কারণে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে বিপিএল। গতকাল ক্রিকেটারদের বৈশ্বিক সংগঠনের (ডাব্লিউসিএ) প্রধান নির্বাহী টম মোফাত এ নিয়ে ধুয়ে দিয়েছেন বিপিএলকে।

অনেক বছর ধরেই তো বিপিএলে বেতন সময়মতো না দেওয়ার ইস্যুটা আলোচনায়, এবার ঝামেলাগুলো আরও প্রকট হয়ে দেখা দিচ্ছে। মোফাত এ কারণে ক্রিকইনফোতে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে টাকা-পয়সা না দেওয়ার ব্যাপারটা শুনতে খুবই বাজে লাগছে। এটা তো বছরের পর বছর ধরেই (বিপিএলে) হয়ে আসছে।’