বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তারকা তিনি। জাতীয় দলের জার্সিতে বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি উইকেট, সর্বোচ্চ রানের তালিকাতেও তিনি ৩ নম্বরে। তাঁর নাম সাকিব আল হাসান। কিন্তু সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস সচিব শফিকুল আলম দাবি করেছেন, বিসিবির উচিত সাকিবের সব রেকর্ড, পরিসংখ্যান এবং অর্জন ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা।
কিন্তু ক্রিকেটের ইতিহাস কি এত সহজে বদলে দেওয়া যায়? কোনো দেশের ক্রিকেট বোর্ড কি চাইলেই একজন খেলোয়াড়ের শত শত ম্যাচের রেকর্ড মুছে ফেলতে পারে? আর যদি এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে এর প্রভাব পড়বে কোথায়?
যা নিয়ে বিতর্কের শুরু
সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাকিব জানিয়েছেন, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পেলে তিনি দেশে ফিরতে এবং আদালতে বিচারের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত। সাকিব বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন নিজে কোনো অন্যায় করেননি, আর দেশে ফিরে বিদায়ী সিরিজ খেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিতে চান।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র জনতার আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন সাকিব। আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ একাধিক অভিযোগ রয়েছে। রয়টার্সের সেই সাক্ষাৎকারে এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন সাকিব।
এই সাক্ষাৎকারেরই প্রতিক্রিয়ায় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস সচিব শফিকুল আলম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি বিসিবির কাছে দাবি জানান, সাকিবের সব রেকর্ড ও পরিসংখ্যান মুছে ফেলা হোক। তাঁর ভাষায়, যিনি প্রকাশ্যে একজন গণহত্যাকারীকে সমর্থন করেন, তাঁর ইতিহাসে থাকার অধিকার নেই।
সাকিব ইস্যুতে সরকারের অবস্থান কী?
সাকিবের এই সাক্ষাৎকার ও রাজনৈতিক অবস্থানের প্রেক্ষাপটে সরকারের সুরও স্পষ্ট। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক ক্রিকবাজকে জানিয়েছেন, সাকিবের দেশে ফেরা কিংবা জাতীয় দলে খেলার কোনো সুযোগ দেখছেন না তিনি। তাঁর ভাষায়, একজন খেলোয়াড় হিসেবে নিজের পরিচয় ছেড়ে যিনি রাজনৈতিক পরিচয়ে সরে গেছেন, তাঁর ফেরার পথ খোলা নেই বলেই মনে করেন তিনি।
বিসিবির বর্তমান বোর্ডের পরিচালক সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীরও একই সুরে বলেন, হাসিনার সঙ্গে ভার্চুয়াল প্রেস কনফারেন্সে অংশ নেওয়ার পর সাকিবের রাজনৈতিক পরিচয় এখন তাঁর ক্রিকেটার পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।
রেকর্ড কি আসলেই মোছা যায়?
এখন আসি মূল প্রশ্নে— একজন আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটারের রেকর্ড কি চাইলেই মুছে ফেলা সম্ভব? ক্রীড়া ইতিহাসে রেকর্ড কেড়ে নেওয়ার নজির অবশ্যই আছে। যেমন সাইক্লিস্ট ল্যান্স আর্মস্ট্রংয়ের কথাই ধরুন। ডোপিংয়ের প্রমাণ পাওয়ার পর ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক সাইক্লিং সংস্থা তাঁর সাতটি ট্যুর দ্য ফ্রান্স শিরোপাই রেকর্ড বই থেকে মুছে দেয়, আজীবন নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হয় তাঁকে।
কিন্তু উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো— এই ধরনের সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয় খেলাটির নিয়ম ভাঙার কারণে। যেমন ডোপিং বা ম্যাচ ফিক্সিং। অর্থাৎ খেলার মাঠের সততা বা প্রতিযোগিতার স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হলেই কেবল রেকর্ড কেড়ে নেওয়া বা মোছার নজির দেখা যায়।
ক্রিকেটেও এমন ঘটনা বিরল নয়— সাকিব নিজেও এর আগে দুবার নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছেন। ২০১৯ সালে বুকির সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য গোপন করার অভিযোগে আইসিসি তাঁকে নিষিদ্ধ করেছিল। তবে সেই নিষেধাজ্ঞাও তাঁর অতীত পারফরম্যান্স বা রেকর্ড মুছে ফেলেনি— শুধু নির্দিষ্ট সময়ের জন্য খেলা থেকে দূরে থাকতে হয়েছিল সাকিববে।
আইসিসি বা বিসিবির নিয়মেও রাজনৈতিক অবস্থান বা মতাদর্শের কারণে কোনো খেলোয়াড়ের মাঠের পরিসংখ্যান— রান, উইকেট, সেঞ্চুরি— মুছে ফেলার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া ক্রিকেটের রেকর্ড বা তথ্য শুধু বিসিবির কাছে নয়, আইসিসি, ক্রিকবাজ, ক্রিকইনফোর মতো স্বতন্ত্র ক্রিকেট পরিসংখ্যান সংস্থা, সংবাদমাধ্যম এবং ক্রিকেট ইতিহাসবিদদের কাছেও সংরক্ষিত থাকে।
কোনো খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ থাকলেও, আদালতে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত সাধারণত সেই ভিত্তিতে রেকর্ড পরিবর্তনের নজির বিশ্ব ক্রিকেটে নেই। তাই বিসিবি চাইলেও সাকিবের নামে থাকা টেস্ট-ওয়ানডে-টি-টোয়েন্টির রান বা উইকেটের সংখ্যা মুছে ফেলার প্রাতিষ্ঠানিক পথ তাদের হাতে নেই— এটা আইসিসির যৌথ ডেটাবেজ ও ইতিহাসের অংশ।
বিসিবি তাহলে কী করতে পারে?
কোনো বোর্ড চাইলে একজন খেলোয়াড়কে— জাতীয় দল থেকে বাদ দিতে পারে, ভবিষ্যৎ নির্বাচনের বাইরে রাখতে পারে, সম্মাননা বা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
কিন্তু মাঠের অর্জন মুছে ফেলা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এর আগে বিশ্ব ক্রিকেটে রাজনৈতিক কারণে অনেক খেলোয়াড় বিতর্কে পড়েছেন। সাউথ আফ্রিকার বর্ণবাদ যুগে অনেক ক্রিকেটার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন। সাবেক প্রেসসচিব শফিকুল আলমের পোস্টেও ব্যারি রিচার্ডস, গ্রায়েম পোলকসহ কয়েকজন সাউথ আফ্রিকান ক্রিকেটারের উদাহরণ টানা হয়েছে। তবে তাদের ক্রিকেটীয় রেকর্ড ইতিহাস থেকে মুছে যায়নি।
সাকিবের ভবিষ্যৎ কোন পথে?
সাকিবের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই অনিশ্চিত। বয়স ৩৯ ছুঁয়েছেন, ২০২৭ বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন দেখলেও দেশে ফেরা নিয়ে জটিলতা আরও বেড়েছে। এর আগে একবার দুবাই থেকে মাঝপথে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাঁকে, পরে হাসিনাকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক জন্মদিনের বার্তার জেরে আরেকবার তাঁর দেশে ফেরার পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
রয়টার্সের সাক্ষাৎকারে সাকিব দেশে ফেরার আগ্রহের কথা জানালেও যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী সাফ জানিয়েছেন, রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে সাকিবের জাতীয় দলে ফেরার আর কোনো পথ দেখছেন না তিনি। ফলে সাকিবের ঘরের মাঠে বিদায়ী সিরিজ খেলার স্বপ্ন আদৌ পূরণ হবে কিনা, তা এখন অনেকটাই রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে দাঁড়িয়েছে।