বিদেশি মদে সর্বনাশ, বাংলাদেশের ফুটবলে ‘নতুন বোতলে পুরোনো মদ’

কী প্রতিশ্রুতি জাগিয়েছিলেন তাঁরা! শেখ মোরসালিন (১৭) তো বাংলাদেশ জাতীয় দলে ৭ ম্যাচেই ভবিষ্যতের তারকা হওয়ার আশা দেখিয়েছেন, গোলকিপার আনিসুর রহমান জিকোর (২৬) পারফরম্যান্স দক্ষিণ এশিয়াতেই আলাদা খ্যাতি এনে দিয়েছে তাঁকে। ডিফেন্ডার তপু বর্মন (২৮) অনেকদিন ধরেই হয়ে ছিলেন জাতীয় দলের রক্ষণে বড় ভরসা।

ডিফেন্ডার রিমন হোসেন (১৮) ও ফরোয়ার্ড তৌহিদুল আলম সবুজ (৩৩) সে অর্থে এখনো প্রতিষ্ঠিত হতে পারেননি, তবে দুজনেরই জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপানো হয়ে গেছে।

সবার নামের পাশে ব্র্যাকেটে লেখা সংখ্যাগুলো খেয়াল করুন, তাঁদের বয়স সেগুলো। সবুজ ছাড়া বাকি সবারই আরও কত বছর সামনে পড়ে আছে! মোরসালিন, রিমনের তো পথচলাই মাত্র শুরু হলো, তপু-জিকোও ক্যারিয়ারের মধ্যগগণে।

এত কিছু এতক্ষণ কেন বলা হলো, খবর না জানা পাঠকের হয়তো তা ধরতে একটু কষ্ট হতে পারে। সেটি জানানো যাক, বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য তা ভীষণ হতাশার এক খবর। এই পাঁচ ফুটবলারই বসুন্ধরা কিংসে খেলেন, পাঁচজনই ক্লাব থেকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ হয়েছেন। কারণ? বিদেশ থেকে অবৈধভাবে মদ আনতে গিয়েছিলেন তাঁরা, বিমানবন্দরে তা ধরা পড়ে যায়।

শেখ মোরসালিনের মধ্যে ভবিষ্যতের তারকার খোঁজ পেয়েছিলেন অনেকেই। ছবি: বাফুফে

বসুন্ধরা কিংসকে কৃতিত্ব দিতে হয়, তারা উদাহরণ তৈরি করে এই পাঁচ খেলোয়াড়কেই সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করেছে। খেলোয়াড়েরা যদিও ক্লাবের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন বলে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু ক্ষমাতেই তো সব সমাধান হয় না! এই পাঁচ খেলোয়াড়ের শাস্তি কী হতে পারে, ক্লাব সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে শিগগিরই।

জাতীয় দলেও আপাতত জায়গা হারাচ্ছেন এই পাঁচজন। আজ বিকেলেই সংবাদমাধ্যমকে বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন জানিয়েছেন, জাতীয় দলেও এই পাঁচজনকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হতে পারে। সংবাদমাধ্যমকে আজ বাফুফে সভাপতি জানিয়েছেন, ‘মূলত এটা কোচের সিদ্ধান্ত। তবে আমার মনে হয় না তাদের দলে নেওয়া হবে। একটা ক্লাব যখন শৃঙ্খলাজনিত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, চিঠি দিয়ে ফেলেছে তখন কোচের জন্যও সেই খেলোয়াড়দের দলে রাখা কঠিন।’

এরপর রাতেই বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের প্রিলিমিনারি রাউন্ডের জন্য দল ঘোষণা করেছেন বাংলাদেশ কোচ হাভিয়ের কাবরেরা। ১২ ও ১৭ অক্টোবর মালদ্বীপের বিপক্ষে হোম-অ্যাওয়ে সে দুই ম্যাচের দলে নেই এই পাঁচ খেলোয়াড়।

এই ঘটনাই আরেকবার সামনে নিয়ে এল বাংলাদেশের ফুটবলের, ফুটবলারদের অন্ধকার একটা দিক।

বাংলাদেশের জাতীয় দলের ফুটবলারদের মদ-প্রীতি নতুন নয়। আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে না এলেও গত কয়েক প্রজন্মের ফুটবলারদের অনেকেই মদের বোতল নিয়ে মেতে ওঠার অভিযোগ ফুটবলপাড়ায় শোনা যায়। এমনকি জাতীয় দলের ম্যাচের আগের রাতেও হোটেলে মদের বোতল খোলার অভিযোগ আছে।

জিকোকে দক্ষিণ এশিয়ার সেরা গোলকিপারদের একজন মানেন সবাই। ছবি: বাফুফে

সে কারণেই হয়তো, সর্বশেষ সাফে বাংলাদেশ সেমিফাইনালে খেলে দেশে ফেরার পর ফুটবলারদের অভিবাদন জানানো অনুষ্ঠানে বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন পইপই করে খেলোয়াড়দের বলে রেখেছিলেন, খেলোয়াড়ি জীবনে আপাতত ‘নো অ্যালকোহল, নো লেইট নাইট স্লিপ!’ কিন্তু জুলাইয়ে সালাউদ্দিনের কথাটা তিন মাসও মেনে চলতে পারলেন না ফুটবলাররা! হতাশার ব্যাপার, এঁদের বেশিরভাগই তরুণ নয়তো প্রতিষ্ঠিত!

এবং ঘটনাটা এতটুকুতেই শেষ নয়। গত মাসে এএফসি কাপে মালদ্বীপের মাজিয়া এফসির বিপক্ষে খেলে দেশে ফেরার সময়ে বসুন্ধরার আরও কয়েকজন খেলোয়াড়ও বোতলে মদ নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন বলে শোনা যায়। কিন্তু ধরা পড়েন এই পাঁচজন। পরে ক্লাবের পক্ষ থেকে জরিমানা দিয়ে তাঁদের ছাড়িয়ে আনা হয়!

ক্লাব এরপর পেশাদারত্ব দেখিয়ে শো-কজ করেছে তাদের, নিষিদ্ধও করেছে। বাফুফেও আপাতত জাতীয় দলে নেয়নি তাদের। কিন্তু এই ঘটনা আরেকবার প্রশ্নটা তুলে দিয়েছে, বাংলাদেশের ফুটবলে এই মদ-সংস্কৃতির শেষ কবে? কবে সত্যিকারের পেশাদার হবেন ফুটবলাররা?

ফুটবলের মান সেভাবে না বাড়লেও ফুটবলারদের বেতন এখন বাংলাদেশের মান বিচারে বেশ ভালো। ফুটবলারদের ফিটনেসও বাড়ছে বলেই মনে হচ্ছে। এই তরুণদের ফুটবলে আশা দেখতে শুরু করেছিল বাংলাদেশ। মদের নেশা আবার সব শেষ করে দিল আর কী!