মারাকানায় আজ ইতিহাস গড়েছে আর্জেন্টিনা। ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়েছেন মেসিরা, বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে এত বছরের ইতিহাসে ঘরের মাঠে এই প্রথম কোনো ম্যাচে হারল ব্রাজিল! কী অবিশ্বাস্য রেকর্ড ছিল ব্রাজিলের, ভাবা যায়!
সে রেকর্ড ভেঙে দেওয়ার উদ্যাপন করার কথা আর্জেন্টিনার। ম্যাচের আগে ব্রাজিলের পুলিশের বেধড়ক পিটুনির শিকার হয়েছেন আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা, সেটির 'জবাব' দেওয়ার তৃপ্তিতেও ভেসে যাওয়ার কথা ছিল গোলদাতা নিকোলাস ওতামেন্দিসহ অন্যদের। কিন্তু ম্যাচের পর এক নতুন দুশ্চিন্তা ঘিরে ধরেছে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের, যে দুশ্চিন্তায় সহসাই পড়তে হবে বলে আর্জেন্টিনার কোনো সমর্থকই ভেবেছেন কি না সন্দেহ। ম্যাচপরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে চাকরি ছাড়ার ভাবনার কথা জানিয়েছেন আর্জেন্টিনাকে কাতার বিশ্বকাপ জেতানো কোচ লিওনেল স্কালোনি!
কিন্তু কেন হঠাৎ স্কালোনির এমন সিদ্ধান্ত, কী আছে এমন সিদ্ধান্তের পেছনে? সেটিই খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছে আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম।
'এই মুহূর্তে অনেক কিছু নিয়েই ভাবতে হচ্ছে আমাকে। এই খেলোয়াড়েরা আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে, শুধু আমাকে নয় পুরো কোচিং স্টাফকেই দিয়েছে। আমার এখন ভাবতে হবে এরপর আমি কী করব। এটা বিদায় বা এরকম কিছু নয়, তবে আমার কিছু ব্যাপার নিয়ে ভাবতে হবে। কারণ এখানে প্রত্যাশিত মানটা অনেক উঁচুতে বাঁধা হয়ে গেছে, এই মান ধরে রাখা সহজ কাজ নয়। সব সময় জিততে থাকা কঠিন, আবার এই খেলোয়াড়দের মান বিবেচনায় জয় ছাড়া অন্য কিছু ভাবাও যায় না। সে কারণে আমার অনেক কিছু ভাবতে হবে। আমি ফেডারেশন সভাপতির সঙ্গে বসব, খেলোয়াড়দেরও জানাব, কারণ এই দলের এখন এমন একজন কোচ দরকার যিনি কিনা প্রাণশক্তিতে ভরপুর হবেন' - আজ ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনের শেষদিকে এ-ই ছিল স্কালোনির বার্তা।
এই বার্তায়ই শেষ নয়, ম্যাচের পর মাঠে কোচিং স্টাফের সব সদস্যকে নিয়ে গ্রুপ ফটো তুলেছেন স্কালোনি। এটিই 'শেষ ছবি' কি না, সে আলোচনা উসকে দিয়েছে সংবাদ সম্মেলনে তাঁর ঘোষণা।
স্বাভাবিকভাবেই আর্জেন্টিনার ফুটবলে এখন সবচেয়ে বড় আলোচিত বিষয় এটিই। তবে আর্জেন্টিনার ফুটবল ও জাতীয় দলের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠা সংবাদমাধ্যম তে ই সে স্পোর্ত জানাচ্ছে, সংবাদ সম্মেলনে ওই ঘোষণার আগে খেলোয়াড়দের সঙ্গে এ নিয়ে আলাপ হয়নি স্কালোনির। সংবাদমাধ্যমেই প্রথম এ কথা জানতে পেরেছেন মেসিরা, স্টেডিয়াম ছাড়ার সময়ে এ নিয়ে প্রশ্নে খেলোয়াড়দের চোখেমুখে বিস্ময় ছিল স্পষ্ট।
তাহলে কি আর্জেন্টিনার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) সভাপতি ক্লদিও তাপিয়ার সঙ্গে কিছু নিয়ে বেধেছে স্কালোনির? এ গুঞ্জন চাউর হয়ে গেছে। আর্জেন্টাইন সাংবাদিক গিদো বেরকোভিচ জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থী সের্হিও মাসা এএফএ সভাপতি তাপিয়াকে অনুরোধ করেন, যাতে খেলোয়াড়দের সঙ্গে তাঁর ছবি তোলার ব্যবস্থা করে দেওয়া যায়। তাপিয়া হয়ে সে অনুরোধ শেষ পর্যন্ত যায় স্কালোনির ওপর। মধ্য বামপন্থী মাসাকে হারিয়ে শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন ডানপন্থী হাভিয়ের মিলেই। তবে এ নির্বাচনে প্রচারণায় খেলোয়াড়দের কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে তাঁর ওপর এ বিষম চাপ প্রয়োগ করায় বিরক্ত হয়েই নাকি স্কালোনির এমন চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত।
এর আগে স্কালোনির চুক্তি নবায়নে কালক্ষেপনের সময়ও কোচ ও বোর্ডপ্রধানের মধ্যে মতবিভেদের গুঞ্জন উঠেছিল। তবে তে ই সে আজ জানাচ্ছে, এএফএ-র শীর্ষ কর্তারা আত্মবিশ্বাসী, স্কালোনিকে চালিয়ে যেতে রাজি করাতে পারবেন তাঁরা। প্রসঙ্গত, গত ফেব্রুয়ারিতে স্কালোনির চুক্তিটা ২০২৬ বিশ্বকাপ পর্যন্ত নবায়ন করেছিল এএফএ।
তবে দূরত্ব বা মতবিভেদ যদি থেকে থাকে বোর্ড আর কোচের, সে ক্ষেত্রে ডিসেম্বরের মধ্যেই তা মিটিয়ে ফেলা উচিৎ এএফএ'র। কারণ, আগামী ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই ২০২৪ কোপা আমেরিকার ড্র হবে, সে সময়ে সব দলের কোচরা উপস্থিত থাকবেন।
স্কালোনি কেন এমন ঘোষণা দিয়েছেন, সেটির নেপথ্যের কারণ বহুর্মুখী বলে জানিয়েছে তে ই সে স্পোর্ত। তাঁর চুক্তি নবায়নের প্রক্রিয়া সহজ ছিল না, সেটা তো আগেই জানানো হয়েছে। এমনকি কাতার বিশ্বকাপের আগেও কোচ ও বোর্ডের মধ্যে কিছু বিষয়ে দূরত্ব ছিল, সে সময়ে বিশ্বকাপের পর স্কালোনি আর আর্জেন্টিনার দায়িত্বে থাকতে না-ও পারেন - এমন গুঞ্জন ছড়িয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেটা হয়নি।
একটা সম্ভাব্য কারণ হতে পারত আর্জেন্টিনার একটা প্রজন্মের বদল। আনহেল দি মারিয়া ২০২৪ কোপা আমেরিকার পর আর আকাশি-সাদা জার্সিতে খেলবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। লিওনেল মেসির বয়স আগামী জুনে কোপা আমেরিকার সময়ে হয়ে যাবে ৩৭। ব্রাজিলের বিপক্ষে আজ আর্জেন্টিনার জয়সূচক বনে যাওয়া গোলটি যিনি করেছেন, সেই নিকোলাস ওতামেন্দিও ক্যারিয়ারের অস্তাচলে। কিন্তু এ নিয়ে যদি স্কালোনি চিন্তা করেও থাকেন, এবং এই পালাবদলের দায়িত্বে থাকতে না-ও চান, সে ভাবনা তো আসবে কোপা আমেরিকার পর। এখনই সে ঘোষণা দেওয়াটা যুক্তিতে মেলে না।
আরেকটি বিষয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় উঠেছে, সেটি আজ ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ম্যাচের আগের অপ্রীতিকর ঘটনাকে জড়িয়ে। ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের ওপর লাঠিচার্জ করেন ব্রাজিলের পুলিশ। কারণ হিসেবে জানা যায়, আর্জেন্টিনার জাতীয় সঙ্গীতের সময়ে ব্রাজিলের সমর্থকেরা দুয়ো দিচ্ছিলেন, এ নিয়ে ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে যায় গ্যালারিতে। বিবাদ থামাতে সংঘাতের পথ বেছে নেয় ব্রাজিল পুলিশ! এর প্রতিবাদে মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা দল মাঠ ছেড়ে ড্রেসিংরুমে ঢুকে যায়। জানিয়ে দেয়, এ সংঘাত না থামলে তাঁরা খেলবেন না।
তে ই সে স্পোর্ত জানাচ্ছে, মেসিরা যে মাঠ ছেড়ে যাবেন, এ নিয়ে সে সময়ে কোচিং স্টাফের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি তাঁদের। খেলোয়াড়েরা নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়েই উঠে যান। যদিও এটির সঙ্গে স্কালোনির চাকরি ছাড়ার চিন্তার কোনো সংযোগ নেই বলে জানিয়েছে তে ই সে স্পোর্ত।
তাহলে কারণটা কী? স্কালোনি ক্লান্ত বোধ করছেন? নাকি বোর্ডের সঙ্গে দ্বন্দ্ব? গুঞ্জন সবকিছুকেই কারণ হিসেবে টেনে নিয়ে আসে। আপাতত আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা তো বটেই, খেলোয়াড়েরাও স্কালোনিকে থেকে যাওয়ার অনুরোধ করছেন। ডিফেন্ডার ক্রিস্তিয়ান রোমেরো ম্যাচ শেষে বলেছেন, 'আমরা নিশ্চিত, আমরা আশাবাদী যে স্কালোনি চালিয়ে যাবেন। এখন তিনি এ নিয়ে ভাবার সময় তো পাচ্ছেন, দেখা যাক কী সিদ্ধান্ত আসে। তিনি ড্রেসিংরুমে তো এ নিয়ে কিছু বলেননি। আমরা তাঁকে থেকে যেতে রাজি করানোর চেষ্টা করব।'