ব্রাজিলের নতুন কোচের সঙ্গে নেইমারের পুরোনো ঝামেলা আলোচনায়

ফের্নান্দো জিনিসকে বিদায় দিয়ে নতুন কোচ নিয়োগ দিচ্ছে ব্রাজিল। এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি ব্রাজিলের ফুটবল ফেডারেশনের পক্ষ থেকে, তবে ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যমগুলো নিশ্চিত করে জানাচ্ছে, ৬১ বছর বয়সী দরিভাল জুনিয়রই হচ্ছেন ব্রাজিলের পরবর্তী কোচ। এরই মধ্যে তাঁর আগের চাকরি, অর্থাৎ সাও পাওলোর কোচের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন দরিভাল।

দরিভাল কেমন কোচ, তাঁকে নিয়ে ব্রাজিলের জাতীয় দলকে ঘিরে চলমান সংকট কাটবে কি না, ব্রাজিলের ফুটবল কেমন হবে - সেসব নিয়ে অনেক আলোচনাই আছে। তবে এর মধ্যে একটা আলোচনা ব্রাজিলভক্তদের একটু অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। ব্রাজিলের ফুটবলের ‘পোস্টারবয়’ নেইমারের সঙ্গে যে দরিভাল জুনিয়রের পুরোনো ঝামেলা আছে, যা দরিভালের নিয়োগের খবরের পর থেকে আবার আলোচনায় আসছে।

ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে খেলোয়াড়ি জীবনে আশি-নব্বইয়ের দশকে ব্রাজিলের এ ক্লাব-সে ক্লাবে খেললেও সেভাবে নাম কামাতে পারেননি দরিভাল জুনিয়র, তবে কোচ হিসেবে ব্রাজিলের ফুটবলে তাঁর সুনাম আছে। ২০১৯ সালে প্রোস্টেট ক্যানসারকে হার মানানোর আগে-পরে কোচিংয়ে বেশ নাম কুড়িয়েছেন – ট্রফি জেতার পাশাপাশি তাঁকে সুনাম এনে দিয়েছে তাঁর খেলানোর ধরন এবং তার চেয়েও বেশি করে সংকটে থাকা দলগুলোকে উদ্ধার করার ক্ষমতা। ব্রাজিলও তো এখন সংকটেই আছে!

সে যা-ই হোক, ব্রাজিলের ডাগআউটে দরিভালের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে নেইমারের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক করা, নেইমারকে ছন্দে ফেরানো। এরই মধ্যে অবশ্য ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম গ্লোবোএস্পোর্তে জানিয়েছে, দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই প্রথম কাজগুলোর একটি হিসেবে ‘নেইমারের সঙ্গে আলাপ’কে চিহ্নিত করেছেন দরিভাল।

তা নেইমারের সঙ্গে তাঁর ঝামেলাটা কীসের? এক কথায় বললে, ২০১০ সালে নেইমারের কারণেই সান্তোসে কোচের চাকরিটা হারিয়েছিলেন দরিভাল।

নেইমার, গানসোর মতো খেলোয়াড়দের নিয়ে সে সময়ে সান্তোসে দারুণ সুন্দর ফুটবল খেলাচ্ছিলেন দরিভাল। সাফল্যও আসছিল। কোপা দো ব্রাজিল জিতিয়েছেন সান্তোসকে, তাঁর অধীনে সব মিলিয়ে ৬১ ম্যাচে ৩৭টি জিতেছিল সান্তোস, ড্র করেছিল ৮টি। এমন সাফল্যের পরও তাঁকে ছাটাই হতে হলো অল্প কয়েক দিনের ঝামেলায়। অথচ একভাবে দেখলে দরিভাল ঠিক কাজটিই করেছিলেন।

কী করেছিলেন? সান্তোসের তখন পেনাল্টি নেওয়ার দায়িত্ব ছিল মার্সেলের। কিন্তু আতলেতিকো গোইয়ানেন্সের বিপক্ষে লিগের ম্যাচে পেনাল্টি পাওয়ার পর নেইমার জোরাজুরি করেন – তিনি পেনাল্টি নেবেন। অথচ এর আগে মৌসুমে তিনবার পেনাল্টিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন নেইমার। বেঞ্চ থেকে তাই দরিভালের নির্দেশ আসে, দলের শৃঙ্খলা আগে, মার্সেলই পেনাল্টি নেবেন।

মার্সেলই পেনাল্টি নিয়েছেন। গোলও করেছেন। কিন্তু সে সময়ে তরুণ নেইমারের রাগ তাতে কমেনি। মাঠেই শরীরী ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করলেন, দরিভালের দিকে তাকিয়ে কিছু ‘মধুবর্ষণ’ও করেন। ম্যাচে এরপর নেইমার আর সেভাবে গা লাগিয়েও খেলেননি বলে অভিযোগ আছে। এমনকি প্রতিপক্ষ আতলেতিকো গোইয়ানেন্সের কোচ, সে সময়ে ব্রাজিলের ফুটবলে সম্মানিত কোচ রেনে সিমোয়েস সেদিন ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘আমি অনেক তরুণ খেলোয়াড় সামলেছি, কিন্তু এই ছেলেটা যা করল, এমন কিছু আমি আগে দেখিনি। এই ছেলেকে কারও একটু শিক্ষা দেওয়া উচিৎ, না হলে আমরা একটা দানব তৈরি হতে দেখব!’

শিক্ষাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন দরিভাল। ম্যাচের পর দরিভাল নেইমারকে জানিয়ে দেন, তিনি তাঁকে শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শাস্তিটা হলো, দুই ম্যাচ নিষিদ্ধ থাকবেন নেইমার, নিষেধাজ্ঞার সময়টাতে অনুশীলন করবেন একা, আর সে মাসের বেতনের এক-তৃতীয়াংশ কাটা হবে তাঁর। নেইমার অবশ্য শাস্তি মেনে নিয়েছেন। দরিভাল ২০২০ সালে ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম ইউওএল এস্পোর্তেতে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, নেইমার নিজের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চেয়েছিলেন। নেইমারকে তিনি তখন বলেছিলেন, ‘তবু তোমাকে আমি শাস্তিটা দেব। শাস্তিটা আমি মজা পাচ্ছি বলে দিচ্ছি না, শাস্তিটা দিচ্ছি কারণ শাস্তিটা পাওয়া তোমার প্রয়োজন।’

কিন্তু বাধ সাধে সান্তোসের বোর্ড। নেইমারের নিষেধাজ্ঞার দুই ম্যাচের একটি ছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী করিন্থিয়ানসের বিপক্ষে। সে ম্যাচে নেইমারকে খেলাতে দরিভালের ওপর জোরাজুরি করেছিল সান্তোস বোর্ড। সেই বোর্ডের চোখে, নেইমারকে একটু জরিমানা-টরিমানা করলে সেটাই যথেষ্ট হতো। কিন্তু দরিভাল মানেননি। তাঁর চোখে, দলের শৃঙ্খলা ঠিক রাখতে এবং নেইমারের ভবিষ্যতের জন্যই নেইমারকে শাস্তিটা বোঝানো প্রয়োজন ছিল। দরিভালের এই মনোভাবে বিরক্ত বোর্ড শেষ পর্যন্ত দরিভালকে বরখাস্তই করে দেয়, করিন্থিয়ানসের বিপক্ষে ম্যাচে খেলেন নেইমার।