নেইমার তো নেই, তবু ভিনিসিয়ুসের ব্রাজিল দেখা দেবে ‘ব্রাজিল’ হয়ে?

ব্রাজিলের দলটা কেমন হলো? ব্রাজিল কি কোপা আমেরিকায় জেতার মতো দল গড়েছে, নাকি ২০২৬ বিশ্বকাপে চোখ রেখে এই কোপা আমেরিকা ব্রাজিলের প্রস্তুতির মঞ্চ, নিজেদের পরখ করে দেখার মঞ্চ?

কোপা আমেরিকার ব্রাজিল দল ঘোষণার পর থেকেই প্রশ্নগুলো ঘুরছে বাতাসে। নেইমার তো চোটের কারণে নেই, তবে ব্রাজিলের নতুন কোচ দরিফাউ জুনিয়রের অধীনে ভিনিসিয়ুস, রদ্রিগো, ব্রুনো গিমারায়েসদের প্রতিভারও অভাব নেই।

তবু ব্রাজিলের দল ঘোষণার পর চমকে যাওয়া ব্রাজিল সমর্থকের কমতি ছিল না। দলে যে জেসুস-হিশার্লিসনের মতো কোনো স্ট্রাইকারই নেই, বরং তরুণ এনদ্রিকের পাশে এভানিলসনকে রেখেছেন দরিফাউ। তার চেয়েও বড় কথা, ব্রাজিল কোচ দলটার এতদিনের মাঝমাঠের 'যোদ্ধা' কাসেমিরোকেই রাখেননি!

নামগুলোর ভারই এমন, অবাক হওয়ারই কথা ব্রাজিল সমর্থকদের। তবে দরিফাউয়ের ঘোষিত স্কোয়াড বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, নাম নয়, ফর্মকেই প্রাধান্য দিয়েছেন ব্রাজিল কোচ। ম্যান ইউনাইটেডে ধুঁকতে থাকা কাসেমিরোর বাদ পড়া তাই আর চমক মনে হয় না।

আরও বোধগম্য হবে দরিফাউয়ের দল নির্বাচন, যখন জানবেন, এবারের কোপার ব্রাজিল দলে ৩০-এর বেশি বয়সী খেলোয়াড়ই আছেন দুজন। চোখ যখন ২০২৬ বিশ্বকাপে, বয়সের এমন ভারসাম্যই তো খোঁজার কথা ব্রাজিল কোচের।

তবে নামটা যখন ব্রাজিল, শুধু তো আগামীতে চোখ রেখে বর্তমানকে একেবারে বিসর্জন দেওয়া যায় না। কোপা আমেরিকায় তাই শিরোপা থেকে চোখ সরবে না ভিনি-রদ্রিগোদের। তবে ব্রাজিল সমর্থকদের শুধু শিরোপায়ও মন ভরবে বলে মনে হয় না। কখনো ভরেছে নাকি! ব্রাজিলকে যে 'ব্রাজিল' হয়ে, মন ভরিয়েই জিততে হয়!

এমনই যে, এবার যদি শিরোপা না জিতলেও ব্রাজিলিয়ান সৌরভ ছড়াতে পারে দলটা, প্রতিশ্রুতি দেখাতে পারে, তাতেও মনে হয় না খুব বেশি আপত্তি থাকবে ব্রাজিল সমর্থকদের।

তা কোপা কেমন কাটতে পারে ব্রাজিলের? আগামীকাল সকাল ৭টায় কোস্টারিকার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে কোপা অভিযান শুরুর আগে ব্রাজিলের শক্তি-দুর্বলতা-কৌশলের বিশ্লেষণ দেখে নেওয়া যাক।

গ্রুপে সঙ্গী

আর্জেন্টিনার পথচলার তুলনায় কোপা আমেরিকায় ব্রাজিলের পথচলা ভীষণ কঠিন। গ্রুপেই তারা সঙ্গী হিসেবে পেয়েছে এই মুহূর্তে দক্ষিণ আমেরিকায় দারুণ উড়তে থাকা কলম্বিয়াকে – যারা বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে হারিয়েছে ব্রাজিলকে। গ্রুপে আছে প্রতিভায় ঠাসা প্যারাগুয়েও। আগামীকাল প্রথম ম্যাচের প্রতিপক্ষ কোস্টারিকাই যা ‘সহজ’ প্রতিপক্ষ, তাদের অতি-রক্ষণাত্মক কৌশল গত দশকে ধারে-ভারে এগিয়ে থাকা দলকে ভোগালেও গত কয়েক বছরে অনেক পিছিয়ে পড়েছে কোস্টারিকা।

 

সামনের পথ

গ্রুপ সেরা হয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠাই ব্রাজিলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, তবে ধারে-ভারে এগিয়ে থাকা ব্রাজিল তা করতে পারবে বলেই প্রত্যাশা সমর্থকদের। সেটা করতে পারলেও সামনের পথটা ব্রাজিলের জন্য মোটেও সহজ হচ্ছে না। কোয়ার্টার ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ হয়ে আসবে উরুগুয়ের গ্রুপে দ্বিতীয় হওয়া দল – সেটা যুক্তরাষ্ট্র হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সে বাধা সহজে পেরোলেও সেমিফাইনালেই ব্রাজিলকে কঠিনতম চ্যালেঞ্জের সামনে পড়তে হতে পারে – প্রতিপক্ষ হয়ে আসতে পারে মার্সেলো বিয়েলসার অধীনে কদিন আগেই বাছাইপর্বে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে হারানো উরুগুয়ে কিংবা সেই কলম্বিয়া।

 

কেন জিততে পারে

দলটার নাম ব্রাজিল – এতটুকুই তাদের শিরোপাপ্রত্যাশী দলের তালিকায় রাখতে বাধ্য করে। নেইমার না থাকলেও প্রতিভার তো অভাব নেই – ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগো, রাফিনিয়ার আক্রমণভাগের পেছনে ব্রুনো গিমারায়েস, লুকাস পাকেতার মিডফিল্ড। রক্ষণে মিলিতাওয়ের আগ্রাসনের পাশে মারকিনিওসের অভিজ্ঞতা আছে। আর গোলপোস্টে তো এই সময়ের তর্কসাপেক্ষে সেরা গোলকিপার আলিসন আছেনই।

দরিফাউয়ের অধীনে ব্রাজিল দলটা বেশ কার্যকরী ফুটবলও খেলছে। নেইমার না থাকায় কোনো একজনের ওপর অতি-নির্ভর হওয়ার ঝুঁকি কমছে। নেইমারকে ছাড়াই ২০১৯ কোপা আমেরিকা জেতা ব্রাজিল নেইমারকে আরেকবার দর্শক রেখে তাই কোপার শিরোপা নিয়ে উল্লাস করতেই পারে।

কেন জিতবে না

একটা বাক্যেই ব্রাজিলকে সম্ভাবনার দৌড়ে পিছিয়ে রাখার কারণ ব্যাখ্যা করা যায় – নেইমার নেই! ভিনিসিয়ুস যতই সময়ের সেরা হোন, তিনি একটা প্রান্ত ধরে ত্রাস ছড়ান, নেইমারের মতো ‘প্লেমেকার’ হয়ে পুরো দলের খেলা গড়ে দেওয়ার দক্ষতা তাঁর নেই।

ব্রাজিলের ডাগআউটের ‘মিউজিক্যাল চেয়ার’ অবশেষে দরিফাউকে দিয়ে আপাতত সমাপ্ত হয়েছে বটে, তবে গত বছর দেড়েকে একের পর এক কোচের বদল ব্রাজিলকে কোনো একটা কৌশলে, একটা ছন্দে থিতু হতে দেয়নি। যার প্রভাব বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে দেখা গেছে। আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, কলম্বিয়া – লাতিন অঞ্চলে ব্রাজিলের সঙ্গে টেক্কা দেওয়ার মতো বড় তিন দলের প্রতিটির কাছেই হেরেছে ব্রাজিল।

দরিফাউ জুনিয়র কোচ হয়ে আসার পর এ পর্যন্ত যে চারটি ম্যাচ খেলেছে ব্রাজিল, এর মধ্যে শুধু ইংল্যান্ড ছাড়া আর বাকি সব দলের কাছেই গোল খেয়েছে ব্রাজিল। রক্ষণে মারকিনিওসের হঠাৎ ভুল করে বসার বাতিক, দুই উইংব্যাকের ৯০ মিনিটজুড়ে আক্রমণ বা রক্ষণে ব্রাজিলকে ভরসা জোগাতে না পারা ব্রাজিলকে ভোগাবে।

এক সময়ে কিংবদন্তি সব উইংব্যাক উপহার দেওয়া ব্রাজিল এখন উইংব্যাকের অভাবে যেমনি ভুগছে, তেমনি রোনালদো-রিভালদো-রোমারিওদের ব্রাজিলের যোগ্য ‘নাম্বার নাইন’ও এখন আর নেই। সেই ২০১০ বিশ্বকাপ থেকেই যা ব্রাজিলের বড় সমস্যা। মাঝে গাব্রিয়েল জেসুস কিছুদিন ভরসা জোগালেও তিনি ছন্দহীন অনেকদিন ধরেই। জেসুস-হিশার্লিসনদের যে দরিফাউ কোপার দলে নেননি, তা নিয়ে সম্ভবত ব্রাজিলের কোনো সমর্থকই আপত্তি করেননি।