আর পাঁচদিন পর ভিয়েতনামে শুরু হতে যাচ্ছে এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপ। অনূর্ধ্ব-২০ সাফের পাশাপাশি এই টুর্নামেন্টের জন্যও অনূর্ধ্ব-২০ বাংলাদেশ ফুটবল দলের দায়িত্ব পেয়েছিলেন বাংলাদেশের বিখ্যাত কোচ মারুফুল হক। সাফে বাংলাদেশ শিরোপা জিতেছে, তবে অনূর্ধ্ব-২০ এএফসি চ্যাম্পিয়নশিপের আগে দলকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
টুর্নামেন্টের প্রস্তুতি নিতে থাকা বাংলাদেশ দলের ক্যাম্পে বসুন্ধরা কিংসের ছয় খেলোয়াড়কে ডাকা হলেও বসুন্ধরা খেলোয়াড় পাঠিয়েছে দুজন। কিন্তু বাকি চারজনকে না পাঠানোয় ক্যাম্পে পাঠানো দুজনকেও কোচ মারুফুল হক দলে রাখেননি জানিয়ে বাফুফের কাছে অভিযোগ জানিয়েছে বসুন্ধরা। পাশাপাশি মারুফুলের পেশাদারত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে এ-ও জানিয়েছে, মারুফুল হক বাংলাদেশের ছেলেদের বা মেয়েদের কোনো বয়সভিত্তিক বা সিনিয়র দলের কোচ থাকলে সে দলের জন্য তারা আর কখনো খেলোয়াড় পাঠাবে না।
এর বিপরীতে আজ সংবাদমাধ্যমে পাঠানো প্রতিবাদলিপিতে মারুফুল হক বসুন্ধরার এমন কান্ডের কড়া সমালোচনা করে বারেবারে বাফুফের অনুরোধ সত্ত্বেও বসুন্ধরা তাদের খেলোয়াড় পাঠাতে কীভাবে আপত্তি জানিয়েছে, সেটির পুরো বর্ণনা দিয়েছেন। বয়সভিত্তিক জাতীয় দলের আচরণবিধি নিয়ে একটা ক্লাব এভাবে প্রশ্ন তুলতে পারে কি না, সে প্রশ্ন রেখেছেন। বসুন্ধরা বক্তব্য প্রত্যাহার না করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন। এমনকি এ-ও জানিয়েছেন, তিনি সরে গেলে যদি বসুন্ধরা তাদের খেলোয়াড় পাঠাতে রাজি থাকে, সে ক্ষেত্রে তিনি পদত্যাগ করতেও রাজি।
টুর্নামেন্টকে সামনে রেখে এই মুহূর্তে বুয়েট মাঠে অনুশীলন করছে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দল। কিন্তু দলকে ঘিরে বিতর্ক সামনে আসে আজ বাফুফেতে পাঠানো বসুন্ধরার চিঠির সূত্র ধরে। চিঠিতে বসুন্ধরা লিখেছে, ‘বসুন্ধরা কিংস (বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দলের) অনুশীলনের জন্য কয়েকজন খেলোয়াড়কে ছেড়েছে, চোটজনিত সতর্কতা ও ক্লাবের নতুন কোচের সঙ্গে অনুশীলনের কথা ভেবে বাকিদের ছাড়েনি।’ বাফুফে বসুন্ধরার যে খেলোয়াড়দের চেয়েছে, তাদের সবাইকে আগামী দিনে জাতীয় দলে যোগ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে বলে বাফুফের মহাসচিবকে জানানো হয়েছে বলেও চিঠিতে দাবি করেছে বসুন্ধরা।
কিন্তু এরপর মারুফুলের সমালোচনা করে চিঠিতে তারা লিখেছে, ‘আজ (গতকাল) ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে অনুশীলনের সময় আমাদের জানানো হয়েছে যে অনূর্ধ্ব-২০ দলের মূল কোচ (বসুন্ধরার) বাকি খেলোয়াড়েরা অনুশীলনে যোগ না দেওয়ায় অনুশীলনে যোগ দেওয়া দুই খেলোয়াড়কেও অনুমতি দেননি। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের একজন স্বনামধন্য কোচের এমন আচরণ চরম অপেশাদারি।’
মারুফুলের এমন আচরণ ‘শৃঙ্খলাজনিত আচরণবিধির চরম লঙ্ঘন’ জানিয়ে বসুন্ধরা এরপর লিখেছে, তারা এমন আচরণ মেনে নেবে না। ‘নির্দিষ্ট এই কোচ বাংলাদেশের ছেলেদের বা মেয়েদের কোনো বয়সভিত্তিক বা সিনিয়র দলের কোচ থাকলে সে দলের জন্য বসুন্ধরা আর কোনো খেলোয়াড়কে পাঠাবে না’ – এটাও জানিয়ে বসুন্ধরা লিখেছে, তারা নিশ্চিত করছে যে অনূর্ধ্ব-২০ দলের অনুশীলনে যোগ দেওয়া দুই খেলোয়াড় তাদের ক্লাবে ফিরে গেছেন।
জুলাই-আগস্টে দেশজুড়ে আন্দোলনের সময়ে সাফের প্রস্তুতি নিতে থাকা বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দল বসুন্ধরার মাঠে অনুশীলন করেছে – সেটা মনে করিয়ে দিয়ে বাফুফেকে এ ব্যাপারে শক্ত ব্যবস্থা নিতেও বলেছে বসুন্ধরা কিংস।
এর জবাবে আজ সংবাদমাধ্যমে লিখিত প্রতিবাদ পাঠিয়েছেন কোচ মারুফুল হক। চিঠিতে অনূর্ধ্ব-২০ সাফের দলে ডাকা বসুন্ধরার দুই খেলোয়াড় জনি ও রিমন চোটের কথা বলে ক্যাম্পে যোগ না দিলেও পরে বাংলাদেশ সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে রিমনকে অনুশীলনে এবং জনিকে ম্যাচ খেলতে দেখা গেছে বলে মনে করিয়ে দেন মারুফুল। যদিও কোচ হিসেবে সেটা তিনি সহজভাবেই নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
এরপর দিয়েছেন এবার এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের দলের জন্য বসুন্ধরার সঙ্গে খেলোয়াড় নিয়ে এই টানাটানির ব্যাপারে তাঁর ব্যাখ্যা। বসুন্ধরার মাঠেই গত ৫ সেপ্টেম্বর ম্যাচের সময় নিয়ে ঝামেলা বেঁধেছিল বলে জানিয়েছেন মারুফুল। জাতীয় দল পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী বিকাল ৩টা ৩০ মিনিটে ম্যাচ হবে ধরে ওয়ার্মআম করে, কিন্তু এরপর কিংসের কোচেরা ম্যাচ এক ঘণ্টা পরে হওয়ার কথা জানিয়েছেন বলে চিঠিতে লিখেছেন মারুফুল। ফলে এসব ক্ষেত্রে খেলোয়াড়দের ফিটনেস ধরে রাখতে যা করেন কোচরা, সেভাবেই ম্যাচের ৩০ মিনিট আগে আবার খেলোয়াড়দের ওয়ার্মআপ করাতে বাধ্য হন বলে জানান মারুফুল। কিন্তু দুবার ওয়ার্মআপের ধকলে স্কোয়াডের একজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় চোটে পড়েন, তাঁর এসিএল ও মিনিসকাস ছিড়ে যায় বলে চিঠিতে লিখেছেন মারুফুল।
এরপর একদিকে টুর্নামেন্টের জন্য ২৩ জনের দল চূড়ান্ত করতে বাফুফের দিক থেকে চাপ, অন্যদিকে বারেবারে বাফুফের মাধ্যমে বসুন্ধরাকে অনুরোধ করেও বসুন্ধরার ছয় খেলোয়াড়ের মধ্যে বাকি চারজনকে না পাওয়ার কথা সবিস্তার লিখেছেন মারুফুল। গত ১৪ সেপ্টেম্বর দলের টিম ম্যানেজার তাঁকে বসুন্ধরার ওই চার খেলোয়াড় ছাড়াই দল চূড়ান্ত করার অনুরোধ করেন বলে চিঠিতে জানান কোচ।
এরপর ক্যাম্পে যোফ দেওয়া বসুন্ধরার দুই খেলোয়াড়ের বাদ পড়ার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। ব্যাখ্যাটা এই - মাঝে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৭ খেলোয়াড় এবং আগেই রেজিস্টার্ড আরও দুজন খেলোয়াড় দলে ফেরায় দলে মোট খেলোয়াড়ের সংখ্যা হয়ে যায় ২৫ জন, সেখান থেকে ম্যাচ ফিটনেসে পিছিয়ে থাকায় ওই দুজনকে বাদ দিয়েছেন বলে দাবি মারুফুলের।
বসুন্ধরার এমন অভিযোগ জানানোকে নজিরবিহীন জানিয়ে চিঠিতে এরপর মারুফুল লিখেছেন, 'একটি জাতীয় দলে কারা খেলবে, কারা অন্তর্ভুক্ত হবে, সেটি নির্ধারণ করবেন হেড কোচ। মূল স্কোয়াড থেকে কোনো খেলোয়াড়কে বাদ দিলে সেটা অসৌজন্যমূলক আচরণ হয়, এমন নজির আমার কর্মজীবনে কোথাও দেখি নাই।'
অন্য ক্লাবের উদাহরণ টেনে বসুন্ধরার খেলোয়াড় পাঠাতে আপত্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি, ‘একটি বয়সভিত্তিক জাতীয় দল সাফ অঞ্চলে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের পর যেখানে মোহামেডান, আবাহনী, বাংলাদেশ পুলিশ নিজেদের খেলোয়াড়দের বিষয়ে কোনো আপত্তি না জানিয়ে তাদের খেলোয়াড়দের দেশের পক্ষে জান উজাড় করে খেলার জন্য উদ্বুদ্ধ করে যাচ্ছে, সেখানে বসুন্ধরা কিংস কীভাবে নিজেদের খেলোয়াড়দের জাতীয় দলে খেলার বিষয়ে মিথ্যা অজুহাত দিয়ে দূরে রাখে?’
বসুন্ধরা তাদের বক্তব্য প্রত্যাহার না করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলেছেন মারুফুল, ‘একজন বয়সভিত্তিক জাতীয় দলের কোচের আচরণবিধি কেমন হবে, তিনি সেটি লঙ্ঘন বা অমান্য করেছেন কি না, সেটি কি কোনো ক্লাব বলার এখতিয়ার রাখে? বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে আমাকে সবার সামনে হেয় করার যে প্রয়াস, আমি তার তীব্র নিন্দা জানাই। এ ধরনের বক্তব্য যদি বসুন্ধরা কিংস কর্তৃপক্ষ প্রত্যাহার না করে, তাহলে আমি তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হব।’
তবে শেষে লিখেছেন, ‘আমি কখনো কোনো ক্লাব বা জাতীয় দলের কোচের পদের জন্য লালায়িত নই। আমি অনূর্ধ্ব-২০ দলের কোচের পদ থেকে সরে গেলে, বসুন্ধরা কিংস যদি তাদের খেলোয়াড়দের ছাড় দেয়, তবে আমার দেশের ফুটবলের স্বার্থে এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে কোয়ালিফাই করার স্বার্থে, আমি অনূর্ধ্ব-২০ দলের কোচের পদ ছেড়ে দিতে প্রস্তুত।’