বালন দ’র

কেন রদ্রির পাওয়া উচিত? রেয়াল মাদ্রিদের ভিনি মলিন হচ্ছেন ব্রাজিলে অচেনা থাকার কারণে?  

এতদিন ধরে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের নামই শোনা গিয়েছিল। আজ সকাল পর্যন্তও বালন দ’রের ‘ফাঁস’ হওয়া সব তালিকায় রেয়াল মাদ্রিদের ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডেরই নাম ছিল সবার ওপরে। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মার্কার প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, রেয়াল মাদ্রিদও ভিনিসিয়ুসই বালন দ’র জিতবেন জেনে সেভাবে উদ্‌যাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। শুধু রেয়াল মাদ্রিদই নয়, ভিনিসিয়ুসের স্পনসর নাইকিও প্রস্তুতির কমতি রাখেনি।

কিন্তু সর্বশেষ ঘণ্টা দুয়েকের আপডেট – ভিনিসিয়ুস নন, ম্যানচেস্টার সিটির স্প্যানিশ মিডফিল্ডার রদ্রিই জিততে যাচ্ছেন এ বছরের বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরস্কার। আর সেটা বুঝতে পারার পর রেয়াল মাদ্রিদের কেউই বালন দ’রের অনুষ্ঠানে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এবারের পুরস্কারে আয়োজক ফ্রান্স ফুটবল ম্যাগাজিনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উয়েফাও। বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১টায় প্যারিসের তিয়েখঁ দু শাতেলে-তে শুরু হতে যাওয়া অনুষ্ঠানে শেষ পর্যন্ত রদ্রির ইউরো জেতাই কি তাঁকে এগিয়ে রাখছে?

সবই তো এখনো গুঞ্জন আর ‘ফাঁস’ হওয়া তালিকার খবর। শেষ পর্যন্ত হয়তো রদ্রির হাতেই উঠবে পুরস্কার। তবে তার আগে বালন দ’রের বিবেচনায় যে সময়কালকে ধর্তব্যে নেওয়া হয়েছে, সে সময়ে ভিনিসিয়ুস আর রদ্রির পারফরম্যান্সের বিশ্লেষণ তো চলতেই পারে। কে এগিয়ে ছিলেন? ভিনিসিয়ুসেরই কি জেতা উচিত, নাকি শেষ পর্যন্ত রদ্রির জেতাই যুক্তিযুক্তি – সে তর্কও হতে পারে।

আগে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সটা দেখে নেওয়া যাক। ২০২৩/২৪ মৌসুমের পারফরম্যান্সই তো বিবেচনায় আসছে, সেখানে শুধু গোল-অ্যাসিস্টের হিসাব করাটা অবশ্য রদ্রির ওপর অবিচার হয়ে যায়। ফরোয়ার্ড হিসেবে ভিনিসিয়ুস তো সেখানে এগিয়ে থাকারই কথা। তবে পরিসংখ্যান বলছে, মিডফিল্ডার – তাও ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার – হয়েও রদ্রি একেবারে বেশি পিছিয়ে নেই।

গত মৌসুমে ৬৩ ম্যাচে রদ্রি গোল করেছেন ১২টি, করিয়েছেন ১৪টি। অন্যদিকে ভিনি ৪৯ ম্যাচে গোল করেছেন ২৬টি, তাঁর অ্যাসিস্ট ১১টি।

এর বাইরে খেলা গড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে যে পরিসংখ্যানগুলোকে হিসেবে নেওয়া হয়, সেখানে দুজনের কী অবস্থা? যেসব পাস থেকে সতীর্থ খেলোয়াড়ের শট নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়, সেই ‘কী পাসে’ এগিয়ে আছেন রদ্রি – তাঁর কী পাস ১০০টি, ভিনির ৭০টি।

অবশ্য প্রতিটি পরিসংখ্যানেই তো ব্যাখ্যা থাকে, এখানে ব্যাখ্যাটা বলে যে, মেসি বা নেইমার – কিংবা এ সময়ে কোল পালমারদের মতো খেলোয়াড় যাঁরা মিডফিল্ড আর আক্রমণ দুই জায়গাতেই ভূমিকা রাখার পাশাপাশি মাঝমাঠ-আক্রমণে সমন্বয়ও গড়ে দেন, এমন খেলোয়াড়দের কী পাস বেশি থাকে। তবে রদ্রির মতো ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের কী পাস এত বেশি থাকা বোঝায়, পেপ গার্দিওলার ম্যান সিটি কিংবা নতুন ঢংয়ের গতিময় ফুটবল খেলা স্পেন দলে তাঁর ভূমিকা শুধু প্রথাগত ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের মতো নয়। অন্যদিকে ভিনিসিয়ুসের মতো ফরোয়ার্ড যাঁর মূল শক্তি তাঁর গতি আর ড্রিবলিং, তাঁর কী পাস কম হওয়ারই কথা।

আবার উল্টো দিকে যেমন গোল করার সম্ভাবনার বিচারে এগিয়ে থাকা ‘বিগ চান্স ক্রিয়েশনে’ এগিয়ে আছেন ভিনিসিয়ুস। মাঠে খেলার পজিশনের দিক থেকে ভিনির সেখানে এগিয়ে থাকারই কথা। গত মৌসুমে ভিনি ‘বিগ চান্স’ তৈরি করেছেন ১৯টি, রদ্রি ১১টি।

মাঠে দুজনের অবস্থান আর খেলার ধরনে ভিন্নতার কারণেই যেমন, ড্রিবলে রদ্রির প্রায় দ্বিগুণ এগিয়ে ভিনি – রদ্রির সফল ড্রিবল ৬৬টি, ভিনির ১৩০টি। তবে রদ্রি মাঝমাঠে বলে তাঁর আশপাশে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় যতটা প্রেস করেন, ভিনিকে তার চেয়ে বেশি প্রেসিংয়ের শিকার হতে হয়। ফলে শতকরা হিসেবে ভিনির ড্রিবলিংয়ে সাফল্যের হার কমই থাকার কথা। পরিসংখ্যানও তা-ই দেখাচ্ছে। রদ্রির ড্রিবলিংয়ে সাফল্যের হার যেখানে ৭২%, ভিনির মাত্র ৪১%।

সংখ্যায় কম প্রতিপক্ষকে সামলাতে হয় বলে, প্রতিপক্ষের প্রেসিংয়ের গতি কম থাকে বলে পাসিংয়ে রদ্রির এগিয়ে থাকার কথা, ভিনির পিছিয়ে থাকার কথা। সাদা চোখের দৃষ্টিই তো বলে, রদ্রি চাপে পড়লে চাইলে পেছনে থাকা ডিফেন্ডার বা পাশে থাকা উইংব্যাককে পাস দিয়ে বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার ‘নিরাপদ’ পথে হাঁটতে পারেন, ভিনিসিয়ুসের ক্ষেত্রে দায়িত্বই থাকে প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে বক্সে ঢোকার, কিংবা বক্সে প্রতিপক্ষের দঙ্গলের মধ্যেই সতীর্থকে খুঁজে নেওয়ার। পরিসংখ্যানেও তারই ছাপ। রদ্রির পাসের সাফল্যের হার ৯৩%, ভিনির ৭৮%।

এ তো গেল ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানের হিসাব। তবে বালন দ’রের হিসাবে এর পাশাপাশি দলীয় সাফল্য এবং সেখানে আলোচনায় থাকা খেলোয়াড়ের প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া হয়। সেখানে অবশ্য কাকে এগিয়ে বা পিছিয়ে রাখবেন, সেটি নির্ভর করছে আপনি কোন টুর্নামেন্টকে কীভাবে দেখছেন তার ওপর। ব্যবধানটা সম্ভবত সেখানেই গড়া হয়ে যাচ্ছে এবার।

ক্লাব ভিনিসিয়ুস রেয়াল মাদ্রিদকে লিগ আর চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতিয়েছেন, সে পথে মাদ্রিদের তর্কসাপেক্ষে সেরা খেলোয়াড়ই তিনি। রদ্রি যদিও আগের মৌসুমে ম্যান সিটিকে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতিয়েছেন রদ্রি, সে পথে ফাইনালে গোলও করেছিলেন, তবে গত মৌসুমে সিটি চ্যাম্পিয়নস লিগে রেয়াল মাদ্রিদের কাছেই হেরে বাদ পড়েছে কোয়ার্টার ফাইনালে। তবে সিটি ইংলিশ লিগ জিতেছে। সে পথে রদ্রিরও বড় অবদান।

তবে ভিনিসিয়ুসের বিপক্ষে যাচ্ছে যেটি, তা হলো, ব্রাজিলের হয়ে তাঁর পারফরম্যান্স। জাতীয় দলে রেয়াল মাদ্রিদের ভিনিকে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না। এবারের কোপা আমেরিকায় একেবারে জঘন্য পারফরম্যান্স দেখানো ব্রাজিল বাদ পড়েছে কোয়ার্টার ফাইনালে, সে পথে শুধু প্যারাগুয়ের বিপক্ষে দুটি গোল করেছেন ভিনি। ব্রাজিলের বাদ পড়ার পেছনে তাঁকে ঘিরে সমালোচনাটা হলো, গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে কলম্বিয়ার বিপক্ষে শুরুতেই অযথা হলুদ কার্ড দেখে তিনি কোয়ার্টার ফাইনালে নিষিদ্ধ ছিলেন, সে ম্যাচে উরুগুয়ের বিপক্ষে ব্রাজিলের ধুঁকতে হওয়ার বড় কারণ হয়তো ভিনির অনুপস্থিতিই।

অন্যদিকে স্পেন সবার চোখ ধাঁধিয়ে এবারের ইউরো জিতেছে, শিরোপার পথে হারিয়েছে জার্মানি-ফ্রান্স-ইংল্যান্ড-ইতালি-ক্রোয়েশিয়ার মতো দলকে। টুর্নামেন্টে লামিন ইয়ামাল আর নিকো উইলিয়ামস স্কিল আর গোলের প্রদর্শনীতে সবার নজর কাড়লেও রদ্রি মাঝমাঠ থেকে স্পেনের সব আক্রমণের সুতো বেঁধে দিয়েছেন, স্পেনের আক্রমণের হার্টবিটই যেন ছিলেন তিনি। তার স্বীকৃতি পেয়েছেন টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কারেও।

ফ্রান্স ফুটবলের সঙ্গে উয়েফার যুগলবন্দীতে দেওয়া এবারের বালন দ’রে শেষ পর্যন্ত ইউরো আর কোপা আমেরিকায় রদ্রি আর ভিনির দ্বিমুখী পারফরম্যান্সই কি ব্যবধান গড়ে দিচ্ছে? হয়তো!