ক্লাব বিশ্বকাপ শুরু হবে ১৫ জুন। সেখানে প্রিমিয়ার লিগের দলগুলোর মধ্যে শুধু দুটিই খেলবে – চেলসি আর ম্যানচেস্টার সিটি। এই দুই ক্লাবের সুবিধার কথা ভেবেই এবার ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে গ্রীষ্মকালীন দলবদল, অর্থাৎ জুলাই-আগস্টের দলবদলের সূচি বদলে ফেলা হচ্ছে?
বিবিসি ও আরও কয়েকটি ইংলিশ সংবাদমাধ্যমের খবর তো তা-ই বলছে। সাধারণত ১ জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্তই চলে গ্রীষ্মকালীন দলবদল। কিন্তু এবার ইংল্যান্ডে গ্রীষ্মকালীন দলবদলের সূচি এগিয়ে আনা হচ্ছে, সেটি আবার দুই ভাগেও করা হচ্ছে, অর্থাৎ গ্রীষ্মকালীন দলবদলই হবে দুই দফায়! এমনটাই জানাচ্ছে বিবিসি ও বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ অবশ্য এরই মধ্যে বিবৃতি দিয়ে এমন কিছু অস্বীকার করেছে।
তা চেলসি আর ম্যান সিটিকেই সুবিধা দিতে কি নিয়মটা বদলে ফেলা হচ্ছে? সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন দেখলে তেমনই মনে হবে। পরিবর্তিত নিয়মে এবার ইংল্যান্ডে প্রথম দফায় দলবদল শুরু হবে আগামী ১ জুন, যা চলবে ১০ জুন পর্যন্ত। এরপর ৫ দিন বিরতি দিয়ে আবার ১৬ জুন দ্বিতীয় দফায় খেলোয়াড় কেনাবেচা শুরু হবে, যা চলবে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
এতে চেলসি আর ম্যান সিটির বাড়তি সুবিধা কী? শুধু ওই দুই দলই নতুন সূচিতে খেলোয়াড় দলে টানতে পারবে, বাকিরা পারবে না - এমন তো আর নয়! প্রিমিয়ার লিগের ২০ দলই পারবে, সব দলের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং গ্রাউন্ডে’র নীতিতে তো আর লিগ কর্তৃপক্ষ নড়চড় করবে না! তবে এই নতুন বন্দোবস্ত যে শুধুই ক্লাব বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়া দুই দল সিটি আর চেলসির দিকে তাকিয়ে, সেটা সহজেই বোঝা যায়।
ঝামেলাটা পেকেছে ফিফার এক সিদ্ধান্তের কারণে। গত অক্টোবরে ফিফা জানিয়ে দেয়, ১-১০ জুন একটা নতুন দলবদল উইন্ডো করা হলে তারা সেটির অনুমোদন দেবে। কারণ, এই দলবদল উইন্ডো হলে ক্লাব বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়া দলগুলো টুর্নামেন্টে নামার আগে দলে নতুন খেলোয়াড়কে নিবন্ধন করাতে পারবে।
কিন্তু ফিফা সুযোগ দিলে কী হবে? চলমান নিয়মে তো জুলাইয়ের আগে দলবদলের ‘উইন্ডো’ই খোলে না, সে ক্ষেত্রে ক্লাবগুলোরও কোনো খেলোয়াড়কে কিনলেও তাঁকে নিজেদের দলে নিবন্ধনের সুযোগ নেই। সে জন্যই প্রিমিয়ার লিগ কর্তৃপক্ষ প্রথম দফায় জুনের প্রথম ১০ দিনের জন্য দলবদল সূচির আইন পাস করেছে বলে সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে।
ওদিকে ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের দলগুলোর জন্য সুযোগ রেখেছে, যে দলগুলো নকআউট পর্বে উঠবে, তারা চাইলে ২৭ জুন থেকে ৩ জুলাইয়ের মধ্যে তাদের ওই টুর্নামেন্টের (ক্লাব বিশ্বকাপ) স্কোয়াডে নতুন খেলোয়াড় নিবন্ধন করাতে পারবে!
এদিকে সংবাদমাধ্যমের খবরই সত্যি হলে, ইংল্যান্ডেও ১৬ জুন থেকে দ্বিতীয় দফায় গ্রীষ্মকালীন দলবদল শুরু হবে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, মাঝে পাঁচ দিনের জন্য দলবদলের জানালা বন্ধ থাকবে কেন? সে অবশ্য ইউরোপের অন্য লিগগুলোর সঙ্গে তাল মেলানোর প্রয়োজনে।
ফিফার বেঁধে দেওয়া নিয়ম অনুযায়ী, একটা দেশের ট্রান্সফার উইন্ডোতে বছরে ১৬ সপ্তাহ দলবদলের সুযোগ থাকবে। ইউরোপে বর্তমানে শীতকালীন দলবদলের জন্য জানুয়ারির ৪ সপ্তাহ বরাদ্দ। আর বাকি ১২ সপ্তাহ গ্রীষ্মকালীন দলবদলের জন্য। সে হিসেবে ইংল্যান্ডে গ্রীষ্মকালীন দলবদল ১ জুন শুরু হয়ে একটানা চলতে থাকলে ১২ সপ্তাহ শেষ হয়ে যাবে ২৪ আগস্টে। কিন্তু সে সময়ে তো ইউরোপে অন্য দেশগুলোতে দলবদলের উইন্ডো খোলা থাকবে। সে কারণে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত দলবদলের উইন্ডো টেনে নেওয়ার স্বার্থেই মাঝে এক সপ্তাহের মতো একটা ‘গ্যাপ’ দিতে যাচ্ছে ইংল্যান্ড।
তবে গুঞ্জনে জড়িয়ে থাকা নতুন এই বন্দোবস্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। প্রথম প্রশ্নটা দলবদল উইন্ডোর প্রথম দফার ‘টাইমিং’ নিয়ে। কারণ প্রথম দফা, অর্থাৎ ১ থেকে ১০ জুন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যে ইউরোপিয়ান ফুটবলের ব্যস্ত সময় যাবে! চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল হবে ৩১ মে, এরপর ৬-১০ জুনের মধ্যে ইউরোপে নেশনস লিগের সেমিফাইনাল ও ফাইনাল আর বিশ্বকাপ বাছাইয়ে দুটি রাউন্ডের ম্যাচ আছে। এর মানে দাঁড়াচ্ছে, দেশের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ চলাকালেই খেলোয়াড়দের দলবদল নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে!
ওই সময়ে আন্তর্জাতিক দলে ব্যস্ত কোনো খেলোয়াড় যদি ক্লাব বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়া কোনো ক্লাবে যোগ দেন, সেক্ষেত্রেও ঝামেলা বাড়তে পারে। বিবিসি এ ক্ষেত্রে দুটি উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছে - লিভারপুলের রাইটব্যাক ট্রেন্ট আলেক্সান্ডার আরলন্ড ও ম্যান সিটির কেভিন ডি ব্রুইনা, যাঁরা জুনে তাঁদের জাতীয় দলে (যথাক্রমে ইংল্যান্ড ও বেলজিয়াম) ডাক পাওয়ার কথা। দুজনেরই বর্তমান ক্লাবে চুক্তি শেষ হয়ে যাচ্ছে আগামী ৩০ জুন।
এ দুজনের মধ্যে ট্রেন্টের বর্তমান ক্লাব লিভারপুল ক্লাব বিশ্বকাপে নেই, তবে ট্রেন্ট আগামী মৌসুমে রেয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার গুঞ্জন বেশ জোরাল। রেয়াল মাদ্রিদ ক্লাব বিশ্বকাপে খেলবে। এ ক্ষেত্রে তাই প্রশ্ন উঠে যায়, রেয়াল মাদ্রিদ কি তাহলে ট্রেন্টকে ‘ফ্রি ট্রান্সফারে’ নিবন্ধন করানোর জন্য ১ জুলাই পর্যন্ত বসে থাকবে? সে ক্ষেত্রে তো ক্লাব বিশ্বকাপের শুরু থেকে ট্রেন্টকে পাবে না তারা। যদি ক্লাব বিশ্বকাপের শুরু থেকেই চায় ট্রেন্টকে, সে ক্ষেত্রে লিভারপুলের সঙ্গে ‘ট্রান্সফার ফি’ নিয়ে সমঝোতার রাস্তায় যেতে হবে রেয়াল মাদ্রিদকে। মাত্র মাসখানেকের জন্য!
আর কেভিন ডি ব্রুইনার ক্ষেত্রে ম্যান সিটির ঝামেলাটা হলো, বর্তমান চুক্তি শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত সিটি তাঁকে শুধু ক্লাব বিশ্বকাপের শুরুর দিকে কিছুদিনই পাবে। সিটি নকআউট পর্বে উঠলে ততদিনে তো ডি ব্রুইনার চুক্তি শেষ হয়ে যাবে! চুক্তি নবায়ন যদি না-ই হয়, সেক্ষেত্রে সিটি-ডি ব্রুইনা অল্প কিছুদিনের জন্য চুক্তি বাড়িয়ে নেওয়ার ব্যাপারে সমঝোতার ব্যাপারেও হাঁটতে পারে। তা না হলে? গ্রুপ পর্বে সিটির হয়ে খেলার পর চাইলে ডি ব্রুইনা ক্লাব বিশ্বকাপে খেলা কোনো দলেও ১ জুলাই যোগ দিয়ে তাদের হয়ে নকআউট পর্বে খেলতে পারবেন!
গত অক্টোবরে দলবদলের সময়সীমা পাল্টানোর সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ফিফা অবশ্য আরেকটি সিদ্ধান্তও নিয়েছে, নিবন্ধনের নিয়মে কিছুটা বদল এনেছে, যাতে ক্লাবগুলো শুধু এই ক্লাব বিশ্বকাপের সময়টুকুর জন্যও কোনো খেলোয়াড়ের সঙ্গে চুক্তিতে যেতে পারে!