বাফুফের ফুটসাল কমিটির প্রধান ইমরানুর রহমান বললেন, এটা মাত্রই ‘বেবি স্টেপ।’ শিশুর মতো এক পা-দু পা করে চলার শুরু।
বাংলাদেশ জাতীয় ফুটসাল দলের জন্য নতুন নিয়োগ পাওয়া ইরানি কোচ, যাঁকে সংবাদমাধ্যমের সামনে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্যই আজ বাফুফের সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন, সেই সাঈদ খোদারাহমি বললেন, আজ বাংলাদেশে ফুটসালের জন্ম হয়েছে, এটা একটা ‘বেবি।’
বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল বারবার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা শোনালেন। ফুটসালে লিগ হবে, ছেলেদের ও মেয়েদের জাতীয় দল হবে, ফুটসাল স্টেডিয়াম থেকে শুরু করে কাঠামোগত সব ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হবে – প্রতিশ্রুতি থাকল অনেক।
এর আগে অনানুষ্ঠানিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যে দু-একটা ফুটসাল ম্যাচ খেললেও আনুষ্ঠানিকভাবে এবারই প্রথম ফুটসালে যাত্রা শুরু করছে বাংলাদেশ। তার শুরুতেই নিয়োগ দেওয়া হলো বিদেশি কোচ। আজ ইরানি কোচ সাঈদ খোদারাহমির পরিচয়পর্বের মধ্য দিয়ে ফুটসালে পথচলার ঘোষণা দিয়েছে মাত্র ৯ মাস আগে বাফুফের দায়িত্ব নেওয়া তাবিথ আউয়ালের কমিটি। কিন্তু বাফুফে ভবনে আজ সংবাদ সম্মেলনে ফুটসাল নিয়ে কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি শুনে মনে হবে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কতটা কী হবে সেটা সময় বলবে, তবে আপাতত বাফুফে শুরু করছে ধর তক্তা মার পেরেক ভিত্তিতে!
এখনো দলই গঠিত হয়নি, শুধু ৬৩০ জনের বাছাইপর্ব থেকে ৫২ জনকে নির্বাচন করা হয়েছে – যাঁদের সঙ্গে ৫৩তম সদস্য হিসেবে যোগ দেওয়ার কথা জেমি ডে-র সময়ে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলে খেলে যাওয়া কানাডাপ্রবাসী রাহবার খানের। ক্যাম্প কোথায় হবে, সেটাও এখনো চূড়ান্ত নয়। ফুটসাল কমিটির প্রধান ইমরানুর জানালেন, ক্যাম্পটা মিরপুরের ইনডোরেই করার পরিকল্পনা তাঁদের। সেখানে কোচ সাঈদের পর্যবেক্ষণে দ্বিতীয় দফা ‘ট্রায়ালে’র মাধ্যমে ৫৩ জন থেকে দল নির্বাচন করা হবে, আগামী মঙ্গলবার থেকে বাছাইপর্ব শুরু হওয়ার কথা।
কোচ নিয়োগ করা হলেও তাঁর সহকারী কোচ কারা হবেন, সেটিও এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ইমরানুর জানালেন, কোচ এসেছেন, এখন তিনিই সহকারীদের বেছে নেবেন। বাফুফে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলছে, অন্যদিকে কোচকে আপাতত নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বাছাইপর্ব পর্যন্ত তিন মাসের চুক্তিতে। বাছাইপর্ব পর্যন্ত কোচের পারফরম্যান্স দেখে পরে চুক্তি নবায়নের পথে হাঁটার পরিকল্পনা বাফুফের।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বয়ান আর হাতের কাছে যা পাওয়া যায় তা-ই নিয়ে নেমে পড়ার এই কাজের ধরন নিয়েই বাংলাদেশ দল নেমে যাচ্ছে এশিয়ান কাপ ফুটসালের বাছাইপর্বে, যা মালয়েশিয়ায় হবে আগামী সেপ্টেম্বরে।
আগামী বছর ইন্দোনেশিয়ায় চূড়ান্ত পর্বে জায়গা পাবে মোট ১৬টি দল, স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়ার বাইরে বাকি দলগুলো জায়গা পাবে বাছাইপর্ব থেকে – আট গ্রুপের আট চ্যাম্পিয়ন, আর সেরা সাত রানার্সআপ মিলে হবে সেই ১৫ দল। সে পথে চলার শুরুতেই কঠিন গ্রুপে পড়েছে বাংলাদেশ – প্রথম ম্যাচেই প্রতিপক্ষ ১৩ বারের এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন ও বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে পঞ্চম ইরান। আগামী ২০-২৪ সেপ্টেম্বরে বাছাইপর্বে বাংলাদেশের গ্রুপে বাকি দুই দল মালয়েশিয়া (গত ৪ এপ্রিলে প্রকাশিত সর্বশেষ র্যাঙ্কিংয়ে অবস্থান ৭৬তম) ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (৯৭)। ফুটসালে আনুষ্ঠানিকভাবে মাত্রই পথচলা শুরু করা, কোনো ম্যাচ এখনো না খেলা বাংলাদেশের তো এখনো র্যাঙ্কিংয়ে জায়গা পাওয়ার প্রশ্নই আসে না। বাফুফে সভাপতি যদিও এই অবস্থায়ও ‘আপসেটে’র আশার কথা শোনালেন।
আর কোচ কী বলছেন? গতকালই বাংলাদেশে পা রাখা সাঈদ খোদারাহমি একদিনে বাংলাদেশকে দেখেই এ দেশের রাস্তাঘাটের ‘কঠোর পরিশ্রমী’ মানুষের কথা বললেন, নিশ্চয়তা দিলেন তিনি শতভাগ দিয়ে চেষ্টা করবেন। পরিকল্পনায় শোনালেন ২০২৬-এর দিকে (এশিয়ান কাপ) চোখ রাখার কথা।
আর দীর্ঘমেয়াদে?
সাঈদ খোদারাহমির সিভি অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ, মায়ামমারের ছেলেদের ফুটসাল দলের দায়িত্ব সামলেছেন ২০১২ সাল থেকে চার বছর, এ সময়ে ছেলেদের দলের পাশাপাশি বিভিন্ন মেয়াদে মায়ানমারের মেয়েদের ও অনূর্ধ্ব-২০ দলের তত্ত্বাবধানেও ছিলেন। তাঁর সাফল্যের বর্ণনায় ইমরানুর জানালেন, সাঈদ খোদারাহমি দায়িত্ব নেওয়ার সময়ে মায়ানমার ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১০৩তম ছিল, দায়িত্ব ছাড়ার সময়ে ছিল ৮০তম (তাদের বর্তমান র্যাঙ্কিং ৫৬)। মায়ানমারের ফুটসালকে দাঁড় করানোর পথে বড় অবদান রাখা সাঈদ বাংলাদেশের মতো দলের দায়িত্ব কেন নিতে আগ্রহী হলেন, সে প্রশ্নের উত্তরেই বাংলাদেশ কোচ বললেন স্বপ্নের কথা, ‘১০-১২ বছর পর যখন আপনারা শুনবেন সাঈদ খোদারাহমি, আপনারা যেন বলে ওঠেন, ‘ওহ, হ্যাঁ, লোকটা আমাদের জন্য অনেক করেছে।’’ এটাই আমার জন্য প্রেরণার।’
যদিও কাজটা যে মোটেও সহজ হবে না, সেটা বোঝালেন বাংলাদেশের ফুটসালের হাল-হকিকত মনে করানো কয়েকটি প্রশ্নে। সংবাদ সম্মেলনে নিজের ব্যাপারে বলতে গিয়ে শুরুতেই সাঈদ খোদারাহমি বললেন, ‘আপনারা আমাকে প্রশ্ন করবেন, তার আগে আমি আপনাদের কয়েকটি প্রশ্ন করি – বাংলাদেশে কয়টা ফুটসাল স্টেডিয়াম আছে? কজন ফুটসাল কোচ আছেন? কজন রেফারি আছেন? কজন খেলোয়াড় আছেন?’
৫৯ বছর বয়সী ইরানিয়ানের ‘হাউ মেনি’ দিয়ে শুরু একের পর এক প্রশ্নই বুঝিয়ে দিয়ে গেল, এক মাস পরের বাছাইপর্ব সামনে রেখে তক্তা ধরে পেরেক মেরে দেওয়ার স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় উদ্ধার পাওয়া যেতে পারে, তবে মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বাফুফের অনেক কাজ বাকি।
সে আশার বাণী আপাতত শুনিয়ে গেলেন বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বললেও কোচের চুক্তির মাত্র তিন মাসের কেন, এ প্রশ্নের জবাবে এক পর্যায়ে বাফুফে সভাপতি বলে দিলেন, ‘কোচ আসবেন-যাবেন, বাফুফে সভাপতি আসবেন-যাবেন, ফুটসাল কমিটির প্রধান আসবেন-যাবেন, তবে আমরা এমন কিছু শুরু করতে চাই যেটা চলবে।’
কেমন চলবে, সে উত্তর সময়ের হাতে।
ফুটসাল নিয়ে কিছু সাধারণ তথ্য:
ফুটবলেরই আরেকটি সংস্করণ, যেখানে দুই দলে পাঁচজন করে খেলোয়াড় (গোলকিপারসহ) থাকে। আইন-কানুন ফুটবলের মতোই। তবে এখানে খেলাটা হয় ইনডোরে হার্ডকোর্টে। দৈর্ঘ্যে ১২৫ থেকে ১৩৮ ফিট আর প্রস্থে ৬৬ থেকে ৮২ ফিটের এই কোর্টে গোলপোস্টের আকারও ফুটবলের গোলপোস্টের চেয়ে ছোট হয়।
বলটাও ফুটবলের চেয়ে আকারে কিছুটা ছোট কিন্তু ভারি হয়, তাতে বল লাফায় কম। প্রতি অর্ধে ২০ মিনিট করে দুই অর্ধের ম্যাচ।
ফুটসালে ম্যাচের গতি সাধারণত ফুটবলের চেয়ে বেশি হয়। সাধারণত বলের নিয়ন্ত্রণ ও ছোট জায়গায় পাসিং আর ছোট পোস্টে স্কোরিংয়ের মতো টেকনিক্যাল দক্ষতাই এখানে ব্যবধান গড়ে দেয় বলে সাধারণত কম বয়সে ফুটবলারদের ফুটসালও খেলতে উৎসাহী করা হয়।
১৯৩০ সালে উরুগুয়ের মন্তেভিদেওতে ফুটসালের শুরু হলেও শব্দটা এসেছে পর্তুগিজ ফুতেবল দে সালাও ও স্প্যানিশ ফুতবল দে সালঁ থেকে - যার সহজ বাংলা দাঁড়ায়, ঘরের মতো আবদ্ধ জায়গার ভেতরে ফুটবল। ফুটসাল বিশ্বজুড়েই অনেক দেশ খেলে, তবে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় দক্ষিণ আমেরিকা আর পর্তুগাল-স্পেনসহ আইবেরিয়ান পেনিনসুলার আরও কয়েকটি জায়গায়।
১৯৮৯ সাল থেকে ফুটসাল বিশ্বকাপ আয়োজিত হচ্ছে, এ পর্যন্ত দশটি বিশ্বকাপ আয়োজিত হয়েছে। ফুটবল বিশ্বকাপ সবচেয়ে বেশিবার জেতা ব্রাজিল এখানেও ছয়বার বিশ্বকাপ জিতে সবার ওপরে - প্রথম তিনবার বিশ্বকাপ জেতা ব্রাজিল ২০২৪ সালে সর্বশেষ বিশ্বকাপও জিতেছে, মাঝে টানা দুবার জিতেছে ২০০৮ ও ২০১২ সালে। আর্জেন্টিনা জিতেছে একবার (২০১৬), বাকি দুবার স্পেন (২০০০ ও ২০০৪)।