বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে সেরা হতে পারে কোন ম্যাচগুলো?

৪২ দল আগেই জায়গা নিশ্চিত করেছে, বাকি ৬ দল নির্ধারিত হবে প্লে-অফে। ৪৮ দলের ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ড্র গতকাল শুক্রবার রাতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিটি গ্রুপে চারটি করে দল নিয়ে মোট ১২টি গ্রুপ- তবে বাংলাদেশি ফুটবল সমর্থকদের নজর সম্ভবত বেশি থাকবে গ্রুপ ‘সি’ ও ‘জে’- এর ওপর। কারণ এই দুই গ্রুপে যে পড়েছে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা!

বিশ্বকাপ তো আর শুধু এ দুদলের লড়াই নয়। বৈশ্বিক এ টুর্নামেন্টে যে কোনো দল চমক দেখাতে পারে। ‘গ্রুপ অব ডেথ’ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। চোখের দেখায় কেউ ফ্রান্সের গ্রুপটাকে মৃত্যুকূপ বলছেন, তো কেউ কঠিন মনে করছেন পর্তুগালের গ্রুপকে। আবার অপটার দৃষ্টিতে আর্জেন্টিনার গ্রুপটাই সবচেয়ে কঠিন।

গ্রুপ কঠিন হোক বা তুলনামূলক সহজ হোক- প্রতিটা গ্রুপের কোনো দলই যে কাউকে সহজে ছাড় দেবে না, সেটা তো জানা কথা। এরপরও প্রতিটা গ্রুপে একটি করে ম্যাচ বাড়তি রঙ ছড়াবে। যে ম্যাচ নির্ধারণ করবে, কে হবে ওই গ্রুপের সেরা দল।

 

এক নজরে দেখে নেওয়া যাক, প্রতিটা গ্রুপে সেরা ম্যাচ কোনটি হতে পারে:

 

গ্রুপ ‘এ: মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা, সাউথ কোরিয়া, ইউরোপিয়ান প্লে-অফ ‘ডি’ জয়ী দল

সেরা ম্যাচ: মেক্সিকো-সাউথ কোরিয়া

বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ সহজ গ্রুপে পড়ে- এমন কথার প্রচলন আছে ফুটবল দুনিয়ায়। এবারের গ্রুপ পর্বের ড্র-তেও তেমনটাই মনে হতে পারে সহ আয়োজক মেক্সিকোকে দেখে। সাউথ কোরিয়া ও সাউথ আফ্রিকাকে নিয়ে গ্রুপটা তেমন কঠিন হওয়ার কথা নয়। গ্রুপের চতুর্থ দল নিশ্চিত হবে প্লে-অফে, সেখান থেকে ডেনমার্ক (ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ২১) চূড়ান্ত পর্বের টিকিট পেলে অবশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়বে। তবে যে তিনটি দল আছে, এর মধ্যে বেশি নজর কাড়বে মেক্সিকো (র‍্যাঙ্কিংয়ে ১৫) ও সাউথ কোরিয়ার (র‍্যাঙ্কিংয়ে ২২) ম্যাচটি।

 

গ্রুপ ‘বি: কানাডা, কাতার, সুইজারল্যান্ড, ইউরোপিয়ান প্লে-অফ ‘এ’ জয়ী দল

সেরা ম্যাচ: সুইজারল্যান্ড-কানাডা

বিশ্বকাপের আরেক সহ-আয়োজক কানাডার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে সুইজারল্যান্ড। মুরাত ইয়াকিনের অধীনে টানা তৃতীয় বড় টুর্নামেন্টে অংশ নিতে যাচ্ছে সুইসরা। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বেও অপরাজিত ছিল সুইজারল্যান্ড। সর্বশেষ ইউরোতে কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডকে বড় চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল তারা। তবে শেষ পর্যন্ত পেনাল্টিতে হেরে বাদ পড়ে তারা।

অন্যদিকে কানাডা সর্বশেষ ছয়টি প্রীতি ম্যাচে মোটে একটি গোল হজম করেছে। জানুয়ারিতে এমএলএস কিংবা কানাডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের খেলা না থাকায় দলটির কোচ মার্শ জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে লম্বা সময় কাটাতে পারবেন। যা বিশ্বকাপের জন্য কানাডাকে আরও বেশি প্রস্তুত করে তুলতে পারে!

 

গ্রুপ ‘সি: ব্রাজিল, মরক্কো, হাইতি, স্কটল্যান্ড

সেরা ম্যাচ: ব্রাজিল-মরক্কো

একদিকে পাঁচ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, আরেকদিকে আফ্রিকার শক্তিশালী দেশ মরক্কো- এ ম্যাচটা যে বাড়তি উত্তেজনা তৈরি করবে, সেটা বোধহয় না বললেও চলে। সর্বশেষ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে উঠেছিল মরক্কো। এছাড়া বড় ম্যাচে আশরাফ হাকিমি কিংবা দলটির গোলকিপার ইয়াসিন বুনুর পারফরম্যান্স ব্রাজিলের বড় পরীক্ষা নিতে পারে।

বিশ্বকাপে ব্রাজিলের অবশ্য আরেকটা প্রশ্নের জায়গা আছে। নেইমার খেলবেন নাকি খেলবেন না। সে যাই হোক, গ্রুপের অন্য দুই সঙ্গী হাইতি ও স্কটল্যান্ডকে যতটা সহজে পেছনে ফেলতে পারবে, মরক্কোর ক্ষেত্রে সেটি ততটাই কঠিন ব্রাজিলের জন্য। আর ব্রাজিল-মরক্কো ম্যাচেই নির্ধারিত হতে পারে, কে হবে ‘সি’ গ্রুপের সেরা দল।

 

গ্রুপ ‘ডি: যুক্তরাষ্ট্র, প্যারাগুয়ে, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপিয়ান প্লে-অফ ‘সি’ জয়ী দল

সেরা ম্যাচ: যুক্তরাষ্ট্র-প্যারাগুয়ে

১২ জুলাই সোফি স্টেডিয়ামে এই ম্যাচটি দিয়ে গ্রুপের খেলার উদ্বোধন হতে পারে। স্বাগতিক দলের জন্য নিজেদের প্রথম ম্যাচ সবসময়ই বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে, সেই চাপ আরও বাড়াতে পারে প্যারাগুয়ে। সর্বশেষ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে প্যারাগুয়ে মোটে ১০টি গোল হজম করেছে, যা লাতিন অঞ্চলে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। তাই অনুমান করাই যায়, প্যারাগুয়ের জাল খুঁজে পাওয়াটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ হবে না।

 

গ্রুপ ‘ই: জার্মানি, কুরাসাও, আইভরি কোস্ট, ইকুয়েডর

সেরা ম্যাচ: জার্মানি-ইকুয়েডর

সর্বশেষ দুই বিশ্বকাপেই গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিয়েছে জার্মানি। এরপরও বিশ্বকাপের অন্যতম দাবিদারদের তালিকায় রাখতেই হয় জার্মানদের। তবে গ্রুপ পর্বেই জার্মানির বড় পরীক্ষা নিতে পারে ইকুয়েডর।

ইকুয়েডর কতটা ভয়ংকর হতে পারে, সেটা বিশ্বকাপ বাছাইয়ে তাদের আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচের ফলগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায়। বুয়েনস আইরেসে আর্জেন্টিনার কাছে ১-০ গোলে, ব্রাজিলের ১-০ গোলে হার- দুটি ম্যাচে হারলেও ফলাফল ছিল ন্যূনতম ব্যবধানে। তবে ফিরতি লেগে ব্রাজিলের সঙ্গে ড্র করার পর আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দিয়েছে ইকুয়েডর।

 

গ্রুপ এফ: নেদারল্যান্ডস, জাপান, তিউনিশিয়া, ইউরোপিয়ান প্লে-অফ ‘বি’ জয়ী দল

সেরা ম্যাচ: নেদারল্যান্ডস-জাপান

অনুমিতভাবে এ ম্যাচটাই হবে ‘এফ’ গ্রুপের সবচেয়ে জমজমাট ম্যাচ। দুদলই ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ ২০ এর মধ্যে আছে। দুদলের বেশ কয়েকজন ফুটবলার ইউরোপিয়ান শীর্ষ লিগগুলোতে খেলছেন। এ ম্যাচের ফলই গ্রুপসেরার ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।

 

গ্রুপ জি: বেলজিয়াম, মিশর, ইরান, নিউজিল্যান্ড

সেরা ম্যাচ: বেলজিয়াম-মিশর

গ্রুপের চারদলের মধ্যে বেলজিয়াম ও মিশর পরের রাউন্ডে সহজেই যাবে, এমনটাই ধারণা করছেন অনেকে। তবে অতীত পারফরম্যান্স জানাচ্ছে, বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে হঠাৎ ধস বেলজিয়ামের জন্য নতুন কিছু নয়। সর্বশেষ বিশ্বকাপেও মরক্কো, ক্রোয়েশিয়া ও কানাডার গ্রুপে থাকা বেলজিয়াম গ্রুপ পর্ব থেকেই বাদ পড়েছিল।

নিউজিল্যান্ড ২০১০ বিশ্বকাপে ইতালির সঙ্গে ড্র করেছিল, ইরানকেও হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। এরপরও গ্রুপের সবচেয়ে বড় ম্যাচ হবে বেলজিয়াম-মিশরই। এ ম্যাচটিতে আরও একটা কারণে বাড়তি নজর থাকবে। একদিকে কেভিন ডি ব্রুইনা, অন্যদিকে মোহামেদ সালাহ।

 

গ্রুপ ‘এইচ: স্পেন, কেপ ভার্দে, সৌদি আরব, উরুগুয়ে

সেরা ম্যাচ: স্পেন-উরুগুয়ে

প্রতিভার বিচারে এ ম্যাচে স্পষ্টত এগিয়ে স্পেন, তবে লাতিন আমেরিকানদের লড়াইয়ের মানসিকতা ও শারীরিক ফুটবলে স্প্যানিশদের জন্য ম্যাচটা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। স্পেন সাম্প্রতিক সময়ে দেখিয়েছে, প্রতিপক্ষ যেমনই হোক, তারা বল দখলে রেখে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, সেই সঙ্গে আক্রমণাত্মক ফুটবলও উপহার দিতে পারে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের মতো প্রতিপক্ষকে নাকানি-চুবানি খাওয়ানো মার্সেলো বিয়েলসার দল স্প্যানিশদের স্বাভাবিক খেলা সহজে খেলতে দেবে না বলেই ধারণা। গ্রুপের বাকি দুই দল সৌদি আরব ও কেপ ভার্দে তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় স্পেন-উরুগুয়ে ম্যাচটাই গ্রুপের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।

 

গ্রুপ আই: ফ্রান্স, সেনেগাল, নরওয়ে, ফিফা ‘প্লে-অফ ২’ জয়ী দল

সেরা ম্যাচ: ফ্রান্স-নরওয়ে

একদিকে তারকাখচিত ফ্রান্স, অন্যদিকে ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়া নরওয়ে। সেটাও গ্রুপ পর্বে ইতালির মতো দলকে প্লে-অফের ঝক্কিতে পাঠিয়ে। ম্যাচটা আরও একটা কারণে আলোচিত হতে পারে- কিলিয়ান এমবাপ্পে বনাম আর্লিং হলান্ড। দুই দলে দুই গোল মেশিন, বালন দ’রেরও সম্ভাব্য দাবিদার। ম্যাচটা তাই বাড়তি উত্তাপ ছড়াতে পারে।

 

গ্রুপ জে: আর্জেন্টিনা, আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া, জর্ডান

সেরা ম্যাচ: আর্জেন্টিনা-অস্ট্রিয়া

কাতার বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের কাছে হেরে অঘটনের শিকার হয়েছিল আর্জেন্টিনা। সেই ধাক্কা কাটিয়ে স্কালোনির দল শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ শিরোপা জেতে। প্রতিপক্ষের নামের ভার বিবেচনায় এবার গ্রুপ পর্বের বৈতরণি সহজেই পার হওয়ার কথা আর্জেন্টিনার। গ্রুপের বাকি তিন দলের শক্তির ব্যবধান কাছাকাছি হলেও আর্জেন্টিনার বড় পরীক্ষা নিতে পারে অস্ট্রিয়া। বিশেষ করে দলটির সাম্প্রতিক সময়ে খেলা হাই প্রেসিং কৌশল চাপে ফেলতে পারে স্কালোনির দলকে।

 

গ্রুপ কে: পর্তুগাল, উজবেকিস্তান, কলম্বিয়া, ফিফা প্লে-অফ ‘১’ জয়ী দল

সেরা ম্যাচ: পর্তুগাল-কলম্বিয়া

প্লে-অফ থেকে চতুর্থ দল যেই জায়গা পাক না কেন, ‘কে’ গ্রুপের সেরা ম্যাচ হতে যাচ্ছে পর্তুগাল-কলম্বিয়া ম্যাচটিই। একদিকে উয়েফা ন্যাশনস লিগের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন পর্তুগাল, অন্যদিকে সর্বশেষ কোপা আমেরিকার রানার্স আপ কলম্বিয়া। ইউরোপিয়ান গতিময় ফুটবলের সঙ্গে লাতিন শারীরিক ফুটবলের প্রতিযোগিতা- বড় ধরনের চ্যালেঞ্জেই পড়তে হতে পারে দুদলকে।

 

গ্রুপ এল: ইংল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া, ঘানা, পানামা

সেরা ম্যাচ: ইংল্যান্ড-ক্রোয়েশিয়া

বিশ্বকাপের মূলপর্বে কোনো দলের প্রথম ম্যাচকে ঘিরে বাড়তি উত্তেজনা থাকা স্বাভাবিক ঘটনা। বিশ্বকাপে ইংলিশদের সেই উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেবে ক্রোয়েশিয়া। ১৭ জুন বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলবে ইংল্যান্ড, সেই ম্যাচে তমাস তুখেলের দলের প্রতিপক্ষ ক্রোয়েটরা।

দুদল এর আগে ২০১৮ বিশ্বকাপেও মুখোমুখি হয়েছিল। সেবারের সেমিফাইনালে ইংলিশদের স্বপ্নভঙ্গ করেন লুকা মদরিচরা। সেই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আরেকটা বিশ্বকাপ শুরু হচ্ছে ইংল্যান্ডের। একইসঙ্গে নতুন কোচ তুখেলের অধীনে বড় কোনো টুর্নামেন্টে প্রথম ম্যাচ ইংলিশদের।