বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চ মানেই নতুন কোনো রূপকথা, কিংবা কোনো রূপকথার নির্মম সমাপ্তি। ২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ 'এইচ'-এর প্রথম ম্যাচে আজ (সোমবার) রাত ১০টায় যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপ সেরা স্পেন এবং প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নেওয়া আফ্রিকার ক্ষুদ্র দেশ কেপ ভার্দে। কিন্তু কাগজে-কলমে স্পেন যতটা শক্তিশালী, মাঠের লড়াই কি আসলেই ততটা একপেশে হবে? নাকি আটলান্টার মাঠে আজ অপেক্ষা করছে মহাকাব্যিক কোনো অঘটন? চলুন খুঁজে দেখা যাক ঠিক কোথায় লুকিয়ে এই ম্যাচের আসল রোমাঞ্চ।
ডেভিড বনাম গোলিয়াথের মহাকাব্যিক লড়াই
আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে জেগে থাকা মাত্র ৬ লাখ মানুষের একটি ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র। ফুটবল মানচিত্রে যাদের নাম খুঁজে পেতেও খাবি খেতে হতো বাঘা বাঘা ফুটবল পণ্ডিতদের। সেই কেপ ভার্দে এবার পা রেখেছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে। তাদের প্রতিপক্ষ বর্তমান ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন এবং ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম হট-ফেভারেট স্পেন।
এক অর্থে এটি নিছকই একটি 'ডেভিড বনাম গোলিয়াথ' লড়াই। একদিকে ফিফা র্যাংকিংয়ের দুই নম্বরে থাকা দল, আর অন্যদিকে র্যাংকিংয়ের ৬৭ নম্বরে থাকা এক নবাগত। একদিকে রদ্রি-পেদ্রিদের তারকাখচিত অপরাজেয় এক ‘লা রোহা’ বাহিনী, অন্যদিকে ইতিহাস গড়ে আসা নবাগত ‘ব্লু শার্কস’।
ফেভারিট স্পেনের অজেয় যাত্রা ও স্কোয়াড শক্তি
প্রথমেই চোখ রাখা যাক 'লা রোহা' বা স্পেনকে নিয়ে। ২০১০ সালে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের পর বিগত তিনটি বিশ্বকাপ খুব ভালো যায়নি তাঁদের। ২০১৪ সালে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়ের পর ২০১৮ ও ২০২২’র আসরে লা রোহাদের বিশ্বকাপ মিশন শেষ হয়েছে শেষ ষোলতে। কিন্তু এবারের গল্পটা ভিন্ন।
কোচ লুই দে লা ফুয়েন্তের অধীনে স্পেন টানা ৩১ ম্যাচ অপরাজিত থেকে বিশ্বকাপে পা রেখেছে। ২০২৪ সালেই চতুর্থবারের মতো ইউরোপ সেরা হয়েছে তাঁরা। ওপ্টা সুপারকম্পিউটারের প্রেডিকশনেও ১৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ সম্ভাবনা নিয়ে তারাই ২০২৬ বিশ্বকাপ জয়ের সবচেয়ে বড় দাবিদার।
স্পেনের মূল শক্তি নিঃসন্দেহে তাদের মাঝমাঠ। মাঝমাঠে খেলা নিয়ন্ত্রণ করবেন ব্যালন ডি'অর জয়ী রদ্রি, যাকে অ্যাসিস্ট করবেন পেদ্রি এবং ফাবিয়ান রুইজের মতো মাস্টারমাইন্ডরা। তবে স্পেনের সমর্থকদের মনে বড় প্রশ্ন- ১৮ বছর বয়সী বিস্ময় বালক লামিন ইয়ামাল কি আজ খেলবেন?
হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট কাটিয়ে ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামস দুজনেই বৃহস্পতিবার অনুশীলনে ফিরেছেন। তবে কোচ কোচ দে লা ফুয়েন্তে কোনো ঝুঁকি নিতে চান না। ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে তিনি পরিষ্কার জানিয়েছেন, ইয়ামাল সম্পূর্ণ ফিট আছে, তবে তিনি বেঞ্চে থাকবেন। ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝেই তাকে মাঠে নামানো হবে।
একইভাবে বেঞ্চে থাকলেও আজকের ম্যাচে নিকো উইলিয়ামসের মাঠে নামার সম্ভাবনা কমই। ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসের অনুপস্থিতিতে রাইট উইংয়ে ফেরান তোরেস এবং লেফট উইংয়ে ওলমো বা অ্যালেক্স বায়েনার মধ্যে একজনকে প্রথম একাদশের জন্য বেছে নিতে পারেন কোচ। আর সেন্ট্রাল স্ট্রাইকার বা নাম্বার নাইন রোলে মিকেল ওয়্যারজাবালের খেলার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। বরাবরের মতোই কোচ দে লা ফুয়েন্তে সম্ভবত ৪-৩-৩ ফরমেশনে প্রথম একাদশ সাজাবেন।
স্পেনের সম্ভাব্য প্রথম একাদশ:
গোলকিপার: উনাই সিমন
ডিফেন্স: কুকুরেয়া, লাপোর্তে, কুবারসি, লরেন্তে
মিডফিল্ড: পেদ্রি, রদ্রি, ফ্যাবিয়ান রুইজ
অ্যাটাক: বায়েনা, ওয়্যারজাবাল, তোরেস
কেপ ভার্দের রূপকথা: ছোট দেশ, বড় স্বপ্ন
এবার চোখ রাখা যাক মুদ্রার অপর পিঠে। আটলান্টিক মহাসাগরের ১০টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত মাত্র ৬ লাখ মানুষের দেশ কেপ ভার্দে। আয়তনে বা জনসংখ্যায় ছোট হলেও, ফুটবল মাঠে তাদের গর্জন মোটেও ছোট নয়। গত বছর পর্তুগাল থেকে স্বাধীনতা লাভের ৫০তম বার্ষিকীতে ক্যামেরুনের মতো আফ্রিকান জায়ান্টদের টপকে তারা নিশ্চিত করেছে প্রথম বিশ্বকাপ টিকিট। আইসল্যান্ড এবং কুরাসাওয়ের পর তারাই এখন বিশ্বকাপ ইতিহাসের ক্ষুদ্রতম দেশ।
কেপ ভার্দেকে খুব হালকাভাবে নিলে হয়তো ভুল করবে স্পেন। তাঁদেরকে বিশ্বকাপে নিয়ে আসার পেছনের অন্যতম কারিগর কোচ পেদ্রো লেইতাও ব্রিতো, যিনি 'বুবিস্তা' নামেই বেশি পরিচিত- তিনি দলে কঠোর শৃঙ্খলা নিয়ে এসেছেন। দলের ড্রেসিংরুমে কেবল নিজেদের 'ক্রেওল' ভাষা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে খেলোয়াড়দের মাঝে এক অবিশ্বাস্য মানসিক ঐক্য গড়ে তুলেছেন তিনি।
কেপ ভার্দের দলটিতে আছেন রটারডামে জন্ম নেওয়া তুখোড় ফরোয়ার্ড ডাইলন লিভরামেন্তো, যিনি বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে ক্যামেরুনের বিপক্ষে জয়সূচক গোলসহ ৪টি গোল করেছেন। আর উইংয়ে আছেন ৩৬ বছর বয়সী কিংবদন্তিতুল্য অধিনায়ক রায়ান মেন্দেস। এছাড়া রক্ষণভাগে ভিলারিয়ালের লোগান কোস্তা স্পেনের ফরোয়ার্ডদের চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত। স্পেনের বিপক্ষে কোচ বুবিস্তা পরিচিত ৪-২-৩-১ ফরমেশনেই দল সাজাতে পারেন।
কেপ ভার্দের সম্ভাব্য প্রথম একাদশ:
গোলকিপার: ভোজিনহা
ডিফেন্স: জোয়াও পাওলো, লোগান কস্তা, পিকো লোপেস, স্টিভেন মোরেইরা
মিডফিল্ড: কেভিন পিনা, ইয়ানিক সেমেদো; জোভান কাব্রাল, জামিরো মন্তেইরো, রায়ান মেন্দেজ,
অ্যাটাক: দাইলন লিভরামেন্তো
ট্যাকটিকাল যুদ্ধ ও প্রেডিকশন
এবারে প্রশ্ন হচ্ছে, মাঠের ট্যাকটিকাল লড়াইটা তাহলে কেমন হবে? স্পেন স্বভাবসুলভ হাই-প্রেসিং এবং পজিশনভিত্তিক ফুটবল খেলবে। অন্যদিকে, কেপ ভার্দে নিজেদের রক্ষণভাগ জমাট রেখে কাউন্টার অ্যাটাকে স্পেনের হাই-ডিফেন্সিভ লাইনকে ভাঙার চেষ্টা করবে।
পরিসংখ্যান এবং ওপ্টা সুপারকম্পিউটার অবশ্য স্পেনের দিকেই শতভাগ ঝুঁকে আছে। আজকের ম্যাচে স্পেনের জয়ের সম্ভাবনা ৮৭ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে কেপ ভার্দের জয়ের সম্ভাবনা মাত্র ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। আর ম্যাচটি ড্রয়ের সম্ভাবনা ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ।
এছাড়া বিশ্বকাপে আফ্রিকান দলগুলোর বিপক্ষে স্পেনের রেকর্ড বেশ ভালো। কেবল ১৯৯৮ সালে নাইজেরিয়ার কাছে হেরেছিল তারা। তবে ২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কোর কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেওয়ার ক্ষতটা নিশ্চয়ই ভুলে যায়নি লা রোহারা।
ফুটবল রোমাঞ্চের অপেক্ষা
কেপ ভার্দের ফুটবলার লিভরামেন্তো বলেছেন, 'আমরা বিশ্বকাপে এসেছি একসাথে আনন্দ করতে।' ফলে বোঝাই যাচ্ছে বাড়তি কোনো চাপ ছাড়াই আজ মাঠে নামবে আফ্রিকার এই ব্লু শার্করা। সত্যিকার অর্থে এই ম্যাচে তাঁদের হারানোর কিছু নেই।
অন্যদিকে, স্পেনের লক্ষ্য ইউরোর পর বিশ্বকাপ শিরোপা জয় করে নিজেদের আরেকটি সোনালী প্রজন্মকে ইতিহাসের পাতায় অমর করে রাখা। শক্তির বিচারে স্পেন অনেকখানি এগিয়ে থাকলেও, ফুটবলের ৯০ মিনিটে যেকোনো কিছুই সম্ভব।
আজকের ম্যাচে নবাগত কেপ ভার্দে কি পারবে বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিতে, নাকি স্প্যানিশ আর্মাডার সামনে খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে তাদের প্রতিরোধ? গতকাল জার্মানি যেভাবে আরেক নবাগত কুরাসাওকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে, স্পেনের সমর্থকরাও লা রোহাদের কাছ থেকে এমন কিছুরই প্রত্যাশা করবেন।
অন্যদিকে, ডেভিড-গোলিয়াথের এই লড়াইয়ে আরেকটি বিশ্বকাপ রুপকথা রচিত হোক, এমন প্রত্যাশাও থাকবে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের অনেকের।