আরও একটি হেক্সা মিশনে এসে ব্রাজিলের জন্য ২০২৬ বিশ্বকাপটা যেন শুরুতেই এক গোলকধাঁধাঁ! মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ গোলের হতাশাজনক ড্র দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। সেলেসাওদের সামনে এবার কঠিন এক সমীকরণ। গ্রুপ সি’র দ্বিতীয় ম্যাচে শনিবার (২০ জুন) সকাল সাড়ে ৬টায় আমেরিকার ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামে ক্যারিবীয় দেশ হাইতির মুখোমুখি হচ্ছে কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিল।
ডু-অর-ডাই এই ম্যাচে ব্রাজিল কী করবে? সেলেসাওরা কী পারবে হাইতির বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়াতে, নিজেদের সেরা খেলাটা উপহার দিতে? নাকি তাঁদের সামনে হাইতি হয়ে উঠবে আরেকটি কেপ ভার্ডে বা ডিআর কঙ্গো? চলুন এই বিষয়গুলোরই বিশ্লেষণে যাওয়া যাক।
মহাসংকটে সেলেসাওরা
কাগজে-কলমে ম্যাচটা ডেভিড বনাম গোলিয়াথের লড়াই মনে হলেও স্পেনের বিপক্ষে কেপ ভার্দে, আর পর্তুগালের বিপক্ষে ডিআর কঙ্গো প্রমাণ করেছে, পরিসংখ্যান, র্যাংকিং আর মাঠের পারফরম্যান্স এক নয়। পরের রাউন্ডে যেতে হাইতি ম্যাচে জয় ছাড়া ভিন্ন কিছু ভাবার কোনো সুযোগ নেই ব্রাজিলের সামনে।
গ্রুপ 'সি'-র টেবিলের যা অবস্থা, তাতে এই ম্যাচে জয় ছাড়া ভিন্ন কিছুই ভাবার সুযোগ নেই কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যদের। হারলে বিদায় নিশ্চিত না হলেও, নকআউটের টিকিট পেতে শেষ ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে সমীকরণ হয়ে উঠবে অসম্ভব কঠিন!
কেমন ছিল প্রথম ম্যাচ
অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। নিউজার্সির ড্রাইডাউন বা খটখটে মাঠে মরক্কোর গতি আর ট্যাকটিক্সের কাছে রীতিমতো ধুঁকতে দেখা গেছে সেলেসাওদের। প্রথমার্ধে ক্যাসেমিরো-গিমারায়েসদের মিডফিল্ড ছিল পুরোপুরি দিশেহারা। রজার ইবানেজ ও পাকেতার ভুলের খেসারত দিয়ে গোল হজম করতে হয়েছিল দলকে। শেষ পর্যন্ত ভিনির এক জাদুকরী গোলে ১ পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়ে ব্রাজিল।
ওদিকে হাইতির গল্পটা কিন্তু দারুণ লড়াকু। স্কটল্যান্ডের কাছে ১-০ গোলে হারলেও, ম্যাচ জুড়ে দাপট দেখিয়েছে তারা। পুরো গ্রুপে প্রথম ম্যাচে গোলে সবচেয়ে বেশি ১৫টি শট নিয়েছে হাইতিয়ানরা, আর ব্রাজিলের সমান ২২টি টাচ করেছে প্রতিপক্ষের বক্সে। সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হানেস ডেলক্রোইস তো স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৬৬টি পাসের সবকটিই নিখুঁতভাবে দিতে পেরেছেন, অর্থাৎ তাঁর পাসিং অ্যাকিউরেসি ছিল শতভাগ। ফলে হাইতিকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগই নেই।
নেইমার ট্র্যাজেডি এবং আনচেলত্তির চিন্তা?
ব্রাজিলের এই বাঁচা-মরার ম্যাচে কোটি টাকার প্রশ্ন, নেইমার কি খেলবেন? উত্তরটা ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের জন্য বড় এক ধাক্কা। ৩৪ বছর বয়সী এই তারকা কাফ ইনজুরির কারণে হাইতি ম্যাচ থেকে পুরোপুরি ছিটকে গেছেন। দলের সাথে তিনি ফিলাডেলফিয়াতেও যাননি, নিউজার্সিতেই চলছে তার ইনজুরি-পরবর্তী ফিরে আসার প্রস্তুতি।
কেমন হবে ব্রাজিলের একাদশ ও ফরমেশন?
একদিকে নেইমার নেই, অন্যদিকে রাইট-ব্যাক পজিশন নিয়ে আনচেলত্তির কপালে বাড়ছে চিন্তার ভাঁজ। সেন্টারব্যাক হিসেবে খেলতে অভ্যস্ত রজার ইবানেজকে মরক্কো ম্যাচে রাইটব্যাকে খেলানোর পরিকল্পনা পুরোপুরি ফ্লপ হয়েছে। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে এসে ওয়েসলির ইনজুরি ছিল দলের জন্য বড় এক ধাক্কা। আর তাই স্কোয়াডে এখন কোনো ন্যাচারাল রাইটব্যাক নেই, ফলে ৩৪ বছর বয়সী দানিলো লুইজকেই হয়তো হয়তো হাইতির বিপক্ষে শুরু থেকেই নামাতে পারেন আনচেলত্তি।
ব্রাজিলিয়ান গণমাধ্যম 'গ্লোবো স্পোর্তে'র খবর অনুযায়ী, আনচেলত্তি এবার একাদশে ২ থেকে ৩টি বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছেন। এর মধ্যে একটি রাইটব্যাক হিসেবে দানিলোর অন্তর্ভুক্তি। আরেকটি সেন্টার ফরোয়ার্ড পজিশনে। একাদশে নাম্বার নাইনের ভূমিকায় ইগর থিয়াগোর জায়গায় মাতেউস কুনিয়াকে দেখা যেতে পারে মূল স্ট্রাইকার হিসেবে।
গ্লোবোর প্রতিবেদন বলছে, মরক্কোর বিপক্ষে পয়েন্ট হারানোর পর কোচ আনচেলত্তি খেলোয়াড়দের সাথে আলাদাভাবে কথা বলে হাইতি ম্যাচ নিয়ে নিজের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। অনুশীলনে ফরমেশন নিয়েও বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন তিনি।
নিউজার্সিতে অনুশীলন সেশনগুলোতে দলকে সবচেয়ে বেশি ৪-২-৪ ফরমেশনে খেলিয়েছেন সাবেক এই রিয়াল মাদ্রিদ কোচ। হাইতির বিপক্ষে ম্যাচে ৪-৩-৩ ফরমেশনেও মূল একাদশ সাজাতে পারেন তিনি। এই ফরমেশনে মিডফিল্ডে সংখ্যাধিক্যের সুবিধা (নিউমেরিক্যাল অ্যাডভান্টেজ) হয়তো পাওয়া যায়, কিন্তু একে কার্যকর করার জন্য প্রয়োজনীয় রসদ কি আছে আনচেলত্তির কাছে? একপাশে ৩৪ বছর বয়সী দানিলো লুইজ আর অন্যপাশে ৩২ বছরের ডগলাস সান্তোস- এই দুই ফুলব্যাককে একাদশে নিয়ে ৪-৩-৩ ফরমেশনে মাঠে নামবেন কিনা তা নিশ্চয়ই ভেবে দেখবেন ব্রাজিল কোচ।
মিডফিল্ড নিয়েও যথেষ্ট চিন্তার কারণ রয়েছে। মরক্কোর বিপক্ষে দুই ডিফেন্সিভ পিভোট কাসেমিরো ও ব্রুনো গিমারাসকে নিয়ে ৪-২-৩-১ ফরমেশনে একাদশ সাজিয়েছিলেন আনচেলত্তি। কিন্তু কাসেমিরোর পারফরম্যান্স এতটাই সাধারণ ছিল যে, হাফটাইমের পর তাকে আর ফেরাননি তিনি। তাঁর জায়গায় নেমে মাঝমাঠে রক্ষণাত্মক ভূমিকায় অনেক বেশি কার্যকর ছিলেন ফ্যাবিনিও। আর তাই হাইতি ম্যাচে ব্রুনো গিমারাসের সাথে ফ্যাবিনিওকে দেখা যেতে পারে শুরু থেকেই।
মরক্কো ম্যাচে মাঝমাঠ থেকে গোলের সুযোগ তৈরির দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি ছিল লুকাস পাকেতার ওপর। কিন্তু একমাত্র ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ছাড়া ব্রাজিলের পুরো দলটাই যখন নিজেদের ছায়া হয়ে ছিল, তখন পাকেতাকে আলাদা করে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোটা বোধহয় ঠিক হবে না। তবে পাকেতার জায়গায় দানিলো সান্তোসের অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনাটাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
গোলপোস্টে যথারীতি থাকবেন বিশ্বস্ত আলিসন বেকার। রক্ষণে দুই সেন্টারব্যাক মারকিনিওস ও গ্যাব্রিয়েল মাগালহাসের থাকাও নিশ্চিত। তাঁদের দুই পাশে ফুলব্যাক হিসেবে দানিলো ও ডগলাস সান্তোসের শুরু থেকে খেলার সম্ভাবনা বেশি।
আক্রমণভাগে লেফট উইংয়ে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র আর রাইট উইংয়ে রাফিনিয়ার গতির ওপর আস্থা রাখবেন আনচেলত্তি। আর যেমনটা আগেই উল্লেখ করেছি, স্ট্রাইকার হিসেবে ইগর থিয়াগোর পরিবর্তে মাতেউস কুনিয়ার ফিনিশিংয়ের ওপর হয়তো ভরসা করতে পারেন সেলেসাওদের কোচ।
ব্রাজিলের সম্ভাব্য একাদশ (৪-২-৩-১/ ৪-২-৪):
গোলকিপার: আলিসন;
ডিফেন্স: দানিলো লুইজ, মারকিনিওস, গ্যাব্রিয়েল, ডগলাস সান্তোস;
মিডফিল্ড: ফ্যাবিনিও, ব্রুনো গিমারায়েস; রাফিনিয়া, লুকাস পাকেতা, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র;
অ্যাটাক: মাতেউস কুনিয়া
হাইতির স্বপ্ন ও হেড-টু-হেড পরিসংখ্যান
বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে হাইতির এই প্রথম সাক্ষাৎ হতে যাচ্ছে। এর আগে তিনবারের দেখায় প্রতিবারই হেরেছে হাইতি, হজম করেছে ১৭ গোল। সর্বশেষ ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকাতে হাইতিকে ৭-১ গোলে হারায় ব্রাজিল। এর আগে, ১৯৭৪ ও ২০০৪ সালেই হাইতিকে বড় ব্যবধানেই হারিয়েছিল সেলেসাওরা।
কিন্তু হাইতি এবার ইতিহাস বদলাতে মরিয়া। দলটির ফরাসি কোচ সেবাস্টিয়ান মিগনে ম্যাচ পূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলনে আবেগঘন কণ্ঠে বলেছেন, ‘হাইতিতে মানুষ প্রায়ই কঠিন সময় পার করে। ফুটবলই তাদের মুখে হাসি ফোটায়। ব্রাজিলের বিপক্ষে একটা জয় বা ড্র হাইতিতে যে কী উন্মাদনা তৈরি করবে, তা আমি কল্পনাও করতে পারছি না। আমরা মাঠে আমাদের সবটুকু ঢেলে দেব।’
ওদিকে কার্লো আনচেলত্তিও হাইতিকে সমীহ করছেন। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, ‘হাইতি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং গতিময় দল। ব্রাজিলের জার্সির একটা আলাদা চাপ থাকে, ছেলেদের সেই চাপ সামলে সেরাটা দিতে হবে।’
মরক্কোর সাথে ড্রয়ের পর সমালোচনার মুখে ব্রাজিল কোচ বলেছিলেন, বিশ্বকাপ তো আর প্রথম ম্যাচেই জেতা যায় না। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, সমালোচনার চাপ সামলে, দলকে ফর্মে ফেরাতে মুখিয়ে আছেন তিনি।
সাম্বা নাকি ক্যারিবীয় রূপকথা?
পরিসংখ্যান বলছে, ব্রাজিলই পরিষ্কার ফেবারিট। কিন্তু মরক্কোর বিপক্ষে হোঁচট খাওয়া সেলেসাওরা যদি আগামীকাল সকালে ফিলাডেলফিয়ার মাঠে নিজেদের চেনা ছন্দ খুঁজে না পায়, তবে হাইতির কাউন্টার অ্যাটাক কিন্তু যেকোনো মুহূর্তে কাঁপিয়ে দিতে পারে আলিসনের জাল।
প্রশ্ন হচ্ছে, নেইমারবিহীন ব্রাজিল কি পারবে সাম্বার ছন্দে টুর্নামেন্টে নিজেদের প্রথম জয় তুলে নিতে? নাকি ফিলাডেলফিয়ায় লেখা হবে নতুন কোনো ক্যারিবীয় রূপকথা? উত্তরটা মিলবে শনিবার সকালেই।