ফুটবল ইতিহাসে ২০০-র বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার কীর্তি আছে মাত্র চারজন ফুটবলারের। আর আজ প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন দুজন মুখোমুখি হচ্ছেন, যাদের মোট ম্যাচ সংখ্যা চারশোরও বেশি। পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো খেলেছেন ২৩১ ম্যাচ, আর লুকা মদরিচ ক্রোয়েশিয়ার জার্সিতে মাঠে নেমেছেন ২০১ বার।
কানাডার টরন্টো স্টেডিয়ামে শুক্রবার ভোরে মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের দুই পরাশক্তি পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়া। বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এর এই নকআউট ম্যাচে মাঠের যুদ্ধ ছাপিয়ে বড় প্রশ্ন একটাই- ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো নাকি লুকা মদরিচ, কার বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ হচ্ছে আগেভাগে? এই ম্যাচই কি রোনালদোর আন্তর্জাতিক ফুটবলের ‘লাস্ট ড্যান্স’? চলুন এই বিষয়টিরই গভীরে যাওয়া যাক।
দুই কিংবদন্তির অবিশ্বাস্য মেলবন্ধন
আলোচনার শুরুটা করা যাক, রোনালদো আর মদরিচের অবিশ্বাস্য মেলবন্ধনের গল্প দিয়ে। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে দুজনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চার-চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন। মদরিচের পাস আর রোনালদোর ফিনিশিং- এই যুগলবন্দীতে এক সময় কেঁপেছে পুরো ইউরোপ। কিন্তু শুক্রবার ভোরে তাঁরা একে অপরের মুখোমুখি হচ্ছেন বিশ্বকাপের আসরে। সেটাও আবার নকআউট ম্যাচ। অর্থাৎ, একজনের স্বপ্ন বেঁচে থাকবে আরেকজনের বিদায়ের মধ্য দিয়ে। মাঠের বাইরে বন্ধুত্ব যতই থাকুক, টরন্টোর সবুজ ঘাসে একজন হাসবেন, আর অপরজন বিদান নেবেন, এটাই ভবিতব্য।
কেমন ছিল দুই দলের গ্রুপ পর্বের পথচলা?
এবারে দেখে নেওয়া যাক, দুই দল কীভাবে নকআউট পর্বে এলো। রবার্তো মার্তিনেজের পর্তুগাল গ্রুপ 'কে' থেকে ৫ পয়েন্ট নিয়ে রানার্স-আপ হয়ে নকআউটে এসেছে। উজবেকিস্তানকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দিলেও কঙ্গো এবং কলম্বিয়ার সাথে ড্র করে তাদের আক্রমণভাগের দুর্বলতা কিন্তু প্রকাশ পেয়েছে। শেষ ৫ ম্যাচে ১০ গোল করলেও, কলম্বিয়ার বিপক্ষে শেষ ম্যাচে গোলশূন্য ড্র পর্তুগিজদের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে আক্রমণভাগের সাথে মাঝমাঠের সংযোগে যে ঘাটতি আছে সেটা বেশ স্পষ্ট হয়েছে কঙ্গো ও কলম্বিয়া ম্যাচে।
অন্যদিকে, জলাতকো দালিচের ক্রোয়েশিয়া গ্রুপ 'এল' থেকে এসেছে ৬ পয়েন্ট নিয়ে। ইংল্যান্ডের কাছে ৪-২ গোলে হেরে বিশ্বকাপ শুরু করলেও, পানামা ও ঘানাকে হারিয়ে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে ক্রোয়াটরা। তবে গোল হজমের দিক থেকে বেশ নড়বড়ে তারা, ৫ ম্যাচে ৫টি গোল খেয়েছে মদরিচ, কোভাসিচ, পেরিসিচরা।
রোনালদো বনাম মদরিচ- কার ওপর চাপ বেশি?
এবারে আদা যাক মূল আলোচনায়। ৪১ বছর বয়সেও রোনালদো পর্তুগালের মূল একাদশে খেলে যাচ্ছেন। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করে সিআর সেভেন ক্যামেরার সামনে চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘আই অ্যাম ব্যাক’। কিন্তু কলম্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে তিনি বক্সের ভেতর বল ছুঁতে পেরেছেন মাত্র দুবার।
এদিকে, পর্তুগালের তরুণ ও প্রতিভাবান প্রজন্মকে বসিয়ে রেখে রোনালদোকে খেলানো নিয়ে কিন্তু সমালোচনা কম হচ্ছে না। বিশেষ করে, বিশ্বকাপের মতো আসরে এখন পর্যন্ত নকআউট পর্বে কোনো গোল নেই রোনালদোর।
অন্যদিকে, ৪০ বছর বয়সী লুকা মদরিচ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পেনাল্টি দিয়ে খলনায়ক বনে গিয়েছিলেন। কিন্তু ঘানার বিপক্ষে শেষ ম্যাচে দুর্দান্ত এক অ্যাসিস্ট করে তিনিই আবার ম্যাচ সেরা। ইউনিভার্সিটি অব জাগরেবের এক প্রফেসর জানিয়েছেন, মদরিচের মেটাবলিক বয়স নাকি এখনো ৩০-এর নিচে। কারণ বছরে ৩৫০ দিনই তিনি কঠোর ফিটনেস রুটিন মেনে চলেন। তাই রোনালদো বক্সে ওত পেতে থাকলেও, মদরিচ কিন্তু পুরো মাঠ জুড়ে এখনো রাজত্ব করছেন।
কৌশলগত যুদ্ধ ও ম্যাচের ভবিষ্যৎবাণী
কৌশলগতভাবে, পর্তুগাল চাইবে রাফায়েল লেয়াও এবং জোয়াও ফেলিক্সদের গতি ব্যবহার করে দুই প্রান্ত দিয়ে ক্রোয়েশিয়াকে চেপে ধরতে। আর ক্রোয়েশিয়ার শক্তি তাদের মাঝমাঠ। মদরিচ আর কোভাসিচ যদি মাঝমাঠে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তবে পর্তুগাল বিপদে পড়বে।
ইতিহাস বলছে, শেষ ৫ বারের দেখায় পর্তুগাল জিতেছে ৩ বার, ক্রোয়েশিয়া মাত্র ১ বার। কিন্তু ক্রোয়েশিয়া হলো নকআউট পর্বের ‘জায়ান্ট কিলার’। ম্যাচ অতিরিক্ত সময় কিংবা টাইব্রেকারে গড়ালে দিওগো কস্তা বনাম ডমিনিক লিভাকোভিচের গোলকিপিং যুদ্ধ এই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিতে পারে।
দিনশেষে, এই ম্যাচ দিয়ে এক কিংবদন্তীর বিদায়ের করুণ সুর বেজে উঠবে। হয়তো রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটবে, কিংবা লুকা মদরিচকে বিদায় জানাতে হবে তার প্রিয় আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে। এই দৃশ্যটা একজন ফুটবলপ্রেমীর জন্য সত্যিই বেদনাদায়ক।
প্রশ্ন এখন একটাই, পর্তুগালের তারুণ্য নাকি ক্রোয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা- শেষ হাসি কে হাসবে? রোনালদো কি পারবেন তার নকআউট গোলের খরা কাটাতে? নাকি মদরিচের জাদুতে স্তব্ধ হয়ে যাবে পর্তুগাল? উত্তরটা জানতে অপেক্ষা করতে হবে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত।