চোখের জলে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর ঘোষণা নেইমারের

ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজতেই মাঠে বসে পড়লেন নেইমার। ভেঙে পড়লেন কান্নায়। সতীর্থরা গিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। কিন্তু তাতে নেইমারের কান্না যেন বাধ মানছিল না। হতাশ, বিমর্ষ নেইমার জার্সির আড়ালে নিজের মুখটা লুকিয়ে ফেলতে চাইলেন। তাতেও থামল না অশ্রু।

থামবেই বা কীভাবে? নিজের চোখের সামনে স্বপ্নকে আরেকবার ধুলিস্মাৎ হতে দেখেছেন। নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ যাত্রা থেমেছে ব্রাজিলের। বদলি হিসেবে দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নেমেছিলেন বটে, কিন্তু শেষ দিকে পেনাল্টিতে এক গোল শোধ দেওয়া ছাড়া আর তেমন কিছুই করতে পারেননি। ব্রাজিলও বিদায় নিয়েছে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকে।

কিন্তু কেউ কি জানত, একটু পর আরও বড় ধাক্কা অপেক্ষা করছে ব্রাজিল ফুটবলের জন্য! নিজেকে কিছুটা সামলে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন নেইমার। তখনও নেইমারের চোখ ভেজা। কণ্ঠ ভারী, ভাঙা ও চোখে মুখে হতাশার ছাপ স্পষ্ট। জানিয়ে দিলেন, ‘বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নের ইতি ঘটেছে, এখন সব শেষ।‘ সঙ্গে যোগ করলেন, ‘এখানেই আমার শুরু ছিল, এখানেই শেষ হলো।’

সহজ ভাষায়, আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলে দিলেন নেইমার।  ১৬ বছরের হাহাকার নিয়ে থেমে গেলেন মাত্র ৩৪ বছর বয়সে! অথচ ৩৯ পেরোনো মেসি, কিংবা ৪১ বছরের রোনালদো দিব্যি খেলে যাচ্ছেন। তাহলে নেইমার কেন মধ্য ত্রিশের আগেই এমন সিদ্ধান্ত নিলেন? এর পেছনে আছে হতাশার গল্প, আছে না পাওয়ার গল্প, আছে হৃদয় বিদারক চোটের গল্প।  

ব্রাজিলের জার্সিতে নেইমারের শুরুটা ছিল ২০১০ সালে। নিউজার্সিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ খেলেন নেইমার। কাকতালীয়ভাবে, নরওয়ের বিপক্ষে আজ নেইমার শেষ ম্যাচটা খেললেন সেই একই স্টেডিয়ামে। শুরু আর শেষটা মিলে গেল একই বিন্দুতে।

দীর্ঘ এই সময়টাতে সব মিলিয়ে ব্রাজিলের জার্সিতে নেইমার খেলেছেন ১৩০ ম্যাচ। গোল করেছেন ৮০টি। ব্রাজিলের জার্সিতে এতো বেশি গোল করতে পারেননি আর কেউ। কিন্তু এত গোল করেও জাতীয় দলের হয়ে তেমন কিছুই জেতা হয়নি নেইমারের। ২০১৩ সালে জেতা কনফেডারেশন কাপই হয়ে থাকল জাতীয় দলের হয়ে জেতা নেইমারের একমাত্র শিরোপা। এর বাইরে ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকে অনূর্ধ্ব-২৩ দলকে নেতৃত্ব দিয়ে জিতেছিলেন স্বর্নপদক।

প্রতিভা আর দক্ষতায় মেসি-রোনালদোর যুগের পর যে নেইমারকে শাসক হিসেবে মনে করা হচ্ছিল, সেই নেইমারকে বারবার থামিয়েছে চোট। ২০১৪ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে কলম্বিয়ার বিপক্ষে পাওয়া চোটে ফুটবল ক্যারিয়ারই শেষ হতে বসেছিল নেইমারের। সেখান থেকে ফিরেছেন বটে, কিন্তু চোট হয়েছে তাঁর নিত্যদিনের সঙ্গী।

২০২৩ সালের অক্টোবরে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচ খেলতে গিয়ে আরেকদফা বড় চোটে পড়লেন। যে চোটে মাঠের বাইরে থাকলেন এক বছরের বেশি। চোট কাটিয়ে ফিরলেন বটে, তবে জাতীয় দলে আর জায়গা পাচ্ছিলেন না। অবশেষে এই বিশ্বকাপ দিয়ে প্রত্যাবর্তন হয় জাতীয় দলে। কিন্তু দুই ম্যাচে মাঠে ছিলেন মোটে ৩৭ মিনিট। সেখানেই থেমে গেল নেইমারের ২০২৬ বিশ্বকাপ অধ্যায়। থেমে গেল নেইমারের ব্রাজিল অধ্যায়ও। নেইমার বিশ্বকাপের মঞ্চ ছাড়লেন না পাওয়ার ব্যথা নিয়েই। নিজে কান্নায় বিদায় নিলেন। সঙ্গে সমর্থকদেরও করলেন অশ্রুশিক্ত।

ফুটবলের জীবনে অনেকবার হেসেছেন, কেঁদেছেন, দারুণ সব স্কিলে থামিয়ে দিয়েছেন পুরো বিশ্বকে। এবার থেমে গেলেন নিজেই। বিদায়- ফুটবলের হতভাগা রাজপুত্র!