বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই টানটান উত্তেজনা, শেষ মুহূর্তের নাটক, আর কোটি ভক্তের স্বপ্নপূরণ। কিন্তু এর উল্টো পিঠটাও বড্ড নিষ্ঠুর। সেমিফাইনালের মহারণ শেষে আজ রাত ৩টায় আমেরিকার মায়ামিতে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে মুখোমুখি হচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের দুই পরাশক্তি ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড।
অথচ, এই ম্যাচটা তারা কেউই খেলতে চায়নি। ফাইনালের ঠিক আগের দিন, তৃতীয় হওয়ার এই সান্ত্বনা পুরস্কারের লড়াইকে অনেকেই বলেন 'দ্য গেম নোবডি ওয়ান্টস টু প্লে।' অর্থাৎ, এটা এমন এক ম্যাচ, যেটা কেউ খেলতে চায় না।
কিন্তু আজ যখন মাঠের লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে আর হ্যারি কেইনের মতো বিশ্বসেরা স্ট্রাইকাররা, তখন ফুটবল বিশ্বে সবচেয়ে বড় আলোচনার নাম কিন্তু লিওনেল মেসি। ফাইনাল না খেলেও কেন ফ্রান্স-ইংল্যান্ড ম্যাচে এতটা আলোচনায় লিওনেল মেসি? চলুন, আলোচনায় যাওয়া যাক।
গোল্ডেন বুটের রোমাঞ্চকর সমীকরণ
কেইন-এমবাপ্পের দ্বৈরথের মাঝে মেসিকে নিয়ে আলোচনার মূল কারণ হলো গোল্ডেন বুট বা টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার। এই মুহূর্তে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবার ওপরে আছেন আর্জেন্টিনার মহাতারকা লিওনেল মেসি। তার নামের পাশে জ্বলজ্বল করছে ৮টি গোল এবং ৪টি অ্যাসিস্ট।
তবে ঠিক তার পেছনেই ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছেন ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। তাঁরও গোল সংখ্যা ৮টি, তবে অ্যাসিস্ট ৩টি হওয়ায় এমবাপ্পে আপাতত গোল্ডেন বুটের দৌড়ে মেসির চেয়ে একধাপ পিছিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন। কিন্তু আজকের ম্যাচে এমবাপ্পে যদি গোল পেয়ে যান, তবে মেসিকে ছাড়িয়ে তিনি আবারও এককভাবে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবার ওপরে চলে যাবেন।
২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপেও কিলিয়ান এমবাপ্পে ৮টি গোল করে গোল্ডেন বুট জয় করেছিলেন। এবারও সোর্বোচ্চ গোলদাতা হলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে টানা দুবার গোল্ডেন বুট জেতার অনন্য রেকর্ড গড়বেন তিনি।
এমবাপ্পের পাশাপাশি গোল্ডেন বুট জয়ের দৌড়ে আছেন ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহামও। দু’জনেই এবারের বিশ্বকাপে ৬টি করে গোল করেছেন এবং ১টি করে অ্যাসিস্ট দিয়েছেন। আজকের ম্যাচে একাধিক গোল করে মেসিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে তাই দু’জনের সামনেই।
ফলে ম্যাচটি ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মধ্যে হলেও, অবধারিতভাবেই সবার নজর থাকবে মেসির রেকর্ডের দিকে। তবে আজকের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে এমবাপ্পে, কেইন-বেলিংহামরা যদি গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এগিয়েও যায়, রোববারের ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে গোল করে ও অ্যাসিস্ট দিয়ে গোল্ডেন বুটটা নিজের করে নেওয়ার সুযোগ থাকবে লিওনেল মেসির সামনে।
দিদিয়ে দেশঁর শেষ ম্যাচ
তৃতীয় হওয়ার লড়াইয়ের পাশাপাশি এই ম্যাচটি ফ্রান্সের জন্য আরও একটি কারণে অত্যন্ত আবেগপূর্ণ। ফরাসি ফুটবলের অন্যতম সফল কোচ দিদিয়ের দেশঁ ১৪ বছর ফ্রান্স জাতীয় দলের দায়িত্বে থাকার পর বিদায় নিতে চলেছেন। ফ্রান্সের কোচ হিসেবে চলতি বিশ্বকাপই তাঁর শেষ টুর্নামেন্ট। অর্থাৎ, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আজকের ম্যাচটিই হতে যাচ্ছে ব্লুজদের ডাগআউটে দেশঁর শেষ অ্যাসাইনমেন্ট।
২০১৮-র বিশ্বকাপ জয়ী এই কিংবদন্তি কোচকে একটি জয় দিয়ে বিদায় জানাতে চাইবে ফরাসি শিবির। আজকের ম্যাচে প্রথম একাদশে কয়েকটি পরিবর্তন আনতে পারেন কোচ দেশঁ, তবে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে থাকা এমবাপ্পের ম্যাচের শুরু থেকে খেলার সম্ভাবনাই বেশি।
থমাস টুখেলের ভুল ও ইংল্যান্ডের ক্ষত
এবার আসা যাক থ্রি লায়ন্সদের কথায়। ইংল্যান্ডের জন্য এই টুর্নামেন্টটা ছিল দীর্ঘ ৬০ বছরের ট্রফি খরা কাটানোর দুর্দান্ত এক সুযোগ। সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে এগিয়েও গিয়েছিল তাঁরা। কিন্তু এরপরই যেন খেই হারিয়ে ফেলে ইংলিশরা।
ইংল্যান্ড কোচ থমাস টুখেলের অতি-রক্ষণাত্মক কৌশলকে পুরোপুরি ব্যর্থ করে দিয়ে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ৭ মিনিটের ব্যবধানে ২ গোল করে ফাইনালের টিকিট পায় লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। এরপর থেকেই ইংলিশ মিডিয়াতে সমালোচনার ঝড় শুরু হয় টুখেল ও তাঁর কৌশল নিয়ে।
বিশেষ করে ইংল্যান্ড এক গোলের ব্যবধানে এগিয়ে থাকা অবস্থায় ম্যাচের ৭১ মিনিটে দলের একমাত্র উইঙ্গার অ্যান্থনি গর্ডনকে তুলে নিয়ে ডিফেন্ডার এজরি কনসাকে মাঠে নামান টুখেল। এর প্রায় ১০ মিনিট পর রক্ষণভাগে আরও দুটি পরিবর্তন নেন তিনি- মাঠে নামেন নিকো ও’রাইলি এবং ড্যান বার্ন। ম্যাচ শেষ হতে হতে টুখেলের এই তিন সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী প্রমাণিত হয়।
প্রথমার্ধে যে ইংল্যান্ড প্রিমিয়ার লিগের তীব্রতা বা ইনটেনসিটিতে খেলছিল, তাঁরাই হঠাৎ পুরো রক্ষণভাগে গুটিয়ে গেল। আর এই সুযোগে মাঝমাঠে অবারিত জায়গা পেয়ে গেলেন লিওনেল মেসি ও এনসো ফার্নান্দেজরা। টুখেলের এই অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক রণকৌশলেই শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের শিরোপা জয়ের স্বপ্ন ভেস্তে যায়।
কোচ থমাস টুখেল নিজেই স্বীকার করেছেন, সেমিফাইনালের এই হারের ক্ষত তাঁরা সহজে ভুলতে পারবেন না। তবে সেমিফাইনালের দুঃস্বপ্ন ভুলে আজ ঘুরে দাঁড়াতে চাইবে ইংল্যান্ড। সুপার কম্পিউটার অপটা অবশ্য বলছে, আজকের ম্যাচে ফ্রান্সের জয়ের সম্ভাবনা ৫০ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ, অপটার চোখে ফ্রান্স কিছুটা এগিয়ে আছে।
মূল একাদশে পরিবর্তনের সম্ভাবনা
দুই দলের কোচই আজকের ম্যাচে বেঞ্চে থাকা খেলোয়াড়দের সুযোগ করে দিতে চাইবেন। সেক্ষেত্রে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স দু’দলের শুরুর একাদশেই বেশ কিছু পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। তবে তার মানে এই নয় যে, ম্যাচটা জিতেতে নিজেদের সেরাটা উজার করে দেবে না দু’দলের খেলোয়াড়রা। বরং যারা সুযোগ পাবেন, তাঁরা একাদশে জায়গাটা ধরে রাখতে সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করবেন, আর যারা সুযোগ পেয়েও দলকে ফাইনালে তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন তাঁরা শক্তিশালী পারফরম্যান্স দিয়ে হতাশার মাঝেও সমর্থকদের কিছুটা আশার আলো দেখাতে চাইবেন।
শেষ কথা
সার্বিকভাবে, ইংল্যান্ড বমান ফ্রান্স ম্যাচটি কেবলই তৃতীয় স্থানের লড়াই নয়। এটি একদিকে যেমন এমবাপ্পে, কেইন আর বেলিংহামদের জন্য গোল্ডেন বুটের দৌড়ে মেসি ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ, অন্যদিকে দুর্দান্ত একটা পারফরম্যান্স দিয়ে ইতিবাচক আবহে বিশ্বকাপের মিশন শেষ করার প্রয়াস।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই ম্যাচ শেষ হতে হতে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে কি লিওনেল মেসি পিছিয়ে পড়বেন? নাকি এই ম্যাচের পরপরই নিশ্চিত হয়ে যাবে এলএমটেনের আরেকটি ব্যক্তিগত অর্জন? উত্তরটা মিলবে আর কয়েক ঘন্টার মধ্যেই।