একদিকে আছে হামজা চৌধুরী ও শমিত সোমের মতো পরিচিত মুখ, অন্যদিকে তিন নতুন প্রবাসী ফুটবলার— ফারহান আলী ওয়াহিদ, জিদান ইউসুফ ও শুকি ইতোফুসা। কিন্তু দলে নেই তপু বর্মণের মতো অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার। নেই যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার গোলকিপার সাইফ কেরাওয়ালাও।
আসিয়ান কাপের জন্য বাংলাদেশের ২৩ সদস্যের স্কোয়াড ঘোষণার পর এরইমধ্যে জাতীয় দল ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছেছে। সেখানে দলের সঙ্গে যোগ দেবেন হামজা চৌধুরী-শমিত সোমরা। আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ার বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- থমাস ডুলি যে ২৩ সদস্যের দল ঘোষণা করেছেন, এই দলটা আসলে কতটা ভারসাম্যপূর্ণ? এই দলের শক্তির জায়গা কোথায়? বাংলাদেশের দীর্ঘ দিনের যে সমস্যা- গোল করার লোক নেই- এবারও কি সেই সমস্যাটা থেকে যাবে? সব মিলিয়ে কেমন হলো বাংলাদেশ দল? চলুন এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাক।
শুরুতেই বড় ধাক্কা— নেই তপু বর্মণ
বাংলাদেশ দলের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার তপু বর্মণের না থাকা। চোটের কারণে পুরোপুরি ফিট না হওয়ায় তাঁকে ইন্দোনেশিয়া নেওয়ার ঝুঁকি নেননি কোচ টমাস ডুলি। ডুলির ভাষ্য, তপু এখনো দলের সঙ্গে একটি সেশনও অনুশীলন করেননি এবং তাঁকে আরও প্রায় দুই সপ্তাহ মাঠের বাইরে থাকতে হতে পারে। অর্থাৎ, সামনে সাফকে লক্ষ্য করে তপুকে ফিট করতেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে দল। তবে তপুর অনুপস্থিতিতে প্রশ্ন থাকছেই, অভিজ্ঞ এই সেন্টারব্যাককে ছাড়া বাংলাদেশের রক্ষণ বিপক্ষের আক্রমণগুলো কতটা সামলাতে পারবে? কারণ আসিয়ান কাপে বাংলাদেশের গ্রুপে প্রতিপক্ষ হিসেবে আছে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়া।
রক্ষণে নতুন মুখ, সঙ্গে পুরোনো ভরসা
তপু না থাকলেও রক্ষণে একেবারে নতুন মুখের ওপর নির্ভর করছে না বাংলাদেশ। তারিক কাজী, সাদ উদ্দিন, রহমত মিয়া ও শাকিল আহাদের সঙ্গে জায়গা পেয়েছেন ইংল্যান্ডে বেড়ে ওঠা জিদান ইউসুফ। আর দীর্ঘ সময় পর জাতীয় দলে ফিরেছেন মঞ্জুরুর রহমান। অর্থাৎ রক্ষণে অভিজ্ঞতা আর নতুনত্ব- দুটোরই মিশেল আছে। কিন্তু তপুর জায়গাটা যে সহজে পূরণ হওয়ার নয়, সেটাও পরিষ্কার। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে শেষ ম্যাচে জাকার্তায় স্বাগতিক দলের বিশাল দর্শক সমর্থনের সামনে খেলতে হবে, তখন এই রক্ষণই হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
গত দুই বছরে বাংলাদেশ সব মিলিয়ে ১১টি ম্যাচ খেলেছে। এর মধ্যে জিতেছে ৩টিতে, ড্র করেছে ৩টিতে। হেরেছে বাকি ৫ ম্যাচে। এই ১১ ম্যাচে বাংলাদেশ ১২টি গোল হজম করেছে। অর্থাৎ, গড়ে ম্যাচ প্রতি একটির বেশি গোলহজম করেছে বাংলাদেশ।
এমনকি এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে বাংলাদেশ যে ৬টি ম্যাচ খেলেছে, সেখানে প্রতি ম্যাচে গড়ে ৩৫টি করে ভুল করেছে বাংলাদেশের রক্ষণভাগ, যা থেকে প্রতিপক্ষ শট নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এসব পরিসংখ্যান বাংলাদেশের রক্ষণের দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে তোলে।
সাইফ কেরাওয়ালা বা জিকো নেই, গোলপোস্ট সামলাবে কে?
আরেকটি বড় প্রশ্ন, গোলপোস্ট সামলাবে কে? বাংলাদেশ সম্প্রতি যত ম্যাচ ড্র করেছে, কিংবা হেরেছে, এর বেশ কয়েকটিতে গোল হজম করেছে গোলকিপারের ভুলে। গোলপোস্টের নিচে দুর্বলতা পুরোনো রোগ বাংলাদেশের।
এই সমস্যার সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছিলেন ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার সাইফ কেরাওয়ালা। তিনি ট্রায়ালে থাকলেও শেষ পর্যন্ত ২৩ জনের দলে জায়গা পাননি। ডুলি জানিয়েছেন, কিছু ঘাটতির কারণে এবার তাঁকে নেওয়া হয়নি। তবে ভবিষ্যতে আবারও তাঁকে বিবেচনা করা হতে পারে। জায়গা হয়নি আরেক অভিজ্ঞ গোলকিপার আনিসুর রহমান জিকোরও। তার পরিবর্তে ডুলি আস্থা রেখেছেন মিতুল মারমা, সুজন হোসেন ও মেহেদী হাসান শ্রাবণের ওপর।
প্রবাসী ফুটবলারদের দিকে তাকানো যাক
এই স্কোয়াডের অন্যতম আলোচিত বিষয়- প্রবাসী ফুটবলার। ২৩ জনের দলে জায়গা পেয়েছেন বেশ কয়েকজন প্রবাসী ফুটবলার। হামজা চৌধুরী, শমিত সোম তো আছেনই। তাদের সাথে নতুন করে যোগ দিয়েছেন ইংল্যান্ডের ফারহান আলী, জিদান ইউসুফ ও জাপানে বেড়ে ওঠা শুকি ইতোফুসা।
ফারহানকে নিয়ে বিশেষ আগ্রহ আছে কোচ ডুলির। কারণ বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই একজন স্বীকৃত গোলস্কোরারের অভাব অনুভব করছে। ফারহানের ফিনিশিং দক্ষতার প্রশংসা করেছেন ডুলি এবং তাঁকে আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ একটি অপশন হিসেবে দেখছেন।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, নাম্বার নাইনের অভাব কিংবা প্রপার ফিনিশার নেই। এমন অবস্থায় ফারহানকে ত্রাণকর্তা বানিয়ে ফেললে চলবে না। ডুলি নিজেও বলেছেন, ফারহানের ওপর অতিরিক্ত চাপ দিতে চান না। কারণ প্রতিভা থাকলেই জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সঙ্গে সঙ্গে পারফর্ম করা যায় না। প্রতিভাকে মাঠের পারফরম্যান্সে রুপ দিতে কিছুটা সময় প্রয়োজন হয়- যেটা ফারহানকে দিতে চান কোচ।
সবচেয়ে বড় শক্তি— মাঝমাঠ?
বাংলাদেশের এই দলের সবচেয়ে বড় শক্তি কোথায়? অনেকেই বলবেন— মধ্যমাঠে। কারণ এখানে আছেন হামজা চৌধুরী ও শমিত সোম। হামজার অভিজ্ঞতা, শমিতের উপস্থিতি, সঙ্গে জামাল ভূঁইয়া, সোহেল রানা, হৃদয়, মোরসালিন— মাঝমাঠে বাংলাদেশের অপশন একেবারে কম নয়। হামজা ও শমিত ঢাকার ক্যাম্পে না থাকলেও দুজনই স্কোয়াডে আছেন এবং ইন্দোনেশিয়ায় গিয়ে দলের সঙ্গে যোগ দেবেন।
কিন্তু এখানেও একটা যদি-কিন্তুও আছে। শুধু মাঝমাঠ শক্তিশালী হলেই তো ম্যাচ জেতা যায় না। ম্যাচ জিততে হলে গোল করতে হয়। কিন্তু সেই গোলটা করবেন কে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— গোল করবে কে?
বাংলাদেশ দলের মূল সমস্যাটা এখানেই। গোল করার লোক নেই। এবারের স্কোয়াডে আক্রমণভাগে ফারহান আলী ওয়াহিদ, রাকিব হোসেন, শেখ মোরসলিন, ফাহামেদুল ইসলাম, মিনহাজুল করিম শাদিন ও শুকি ইতোফুসার মতো আক্রমণভাগের খেলোয়াড় আছেন। কিন্তু এদের মধ্যে নিয়মিত গোল করার দায়িত্বটা কে বা কারা নেবেন? ফারহান কি নতুন সেই ফিনিশার হয়ে উঠতে পারবেন? নাকি রাকিব-মোরসালিনদের ওপরই থাকবে মূল দায়িত্ব? কারণ আসিয়ান কাপের মতো টুর্নামেন্টগুলোতে শুধু তৈরি করলেই হবে না, সেই সুযোগগুলোকে গোলেও পরিণত করতে হবে।
সামনে তিন ম্যাচ, কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ?
আসিয়ান কাপে বাংলাদেশের পরীক্ষা শুরু ২৫ সেপ্টেম্বর। প্রথম ম্যাচ মালয়েশিয়ার বিপক্ষে। এরপর ২৮ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুর। আর গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ ১ অক্টোবর স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে। বাংলাদেশ তিনটি ম্যাচই খেলবে জাকার্তার গেলোরা বুং কার্নো স্টেডিয়ামে। প্রতিপক্ষ তিন দলই র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের চেয়ে অনেকটা এগিয়ে। অথাৎ, তিনটি ম্যাচের ভেন্যু এক হলেও, বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জটা বড়ই।
সেই চ্যালেঞ্জে নামতে আসিয়ান কাপের বাংলাদেশের দলকে বলা যায়- তারুণ্য, প্রবাসী প্রতিভা আর অভিজ্ঞতার মিশ্রণ। হামজা-শমিতরা তো আছেনই। নতুন মুখ হিসেবে যোগ হয়েছেন ফারহান, জিদান ও শুকি ইতোফুসা। দলে ফিরেছেন মঞ্জুরুর রহমান। কিন্তু তপু বর্মণের অনুপস্থিতি এবং গোল করার প্রশ্ন- দুটোই বড় উদ্বেগের কারণ।
তাই আসিয়ান কাপের আগে বাংলাদেশ দলকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটাই- হামজা-শমিতরা মাঝমাঠ থেকে যে বল বানিয়ে দেবেন, সেটা গোলে পরিণত করবেন কে? আর বরাবরের মতো ম্যাচের শেষ মুহূর্তে গোলকিপার কোনো তালগোল পাকিয়ে ফেলবেন না তো? তপুকে ছাড়া দলের রক্ষণই বা কতটা ভরসা হয়ে উঠবে পারবে? আসিয়ান কাপে বাংলাদেশ কতদূর যাবে, তার অনেকটাই নির্ভর করবে এই তিনটি প্রশ্নের উত্তরের ওপর।