মালয়েশিয়ার যে দুর্বলতায় আঘাত করলে জিতবে বাংলাদেশ

বহুল-প্রতীক্ষিত আসিয়ান কাপ ফুটবলে বাংলাদেশের প্রথম পরীক্ষা ২৫ সেপ্টেম্বর। ফিফার এই টুর্নামেন্টে প্রথম ম্যাচেই শক্তিশালী মালয়েশিয়ার মুখোমুখি হবেন লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। একদিকে র‍্যাংকিংয়ে এগিয়ে থাকা এবং সাম্প্রতিক ফর্মেও তুঙ্গে থাকা মালয়েশিয়া, অন্যদিকে নিজেদের দিনে যেকোনো দলকে চমকে দেওয়ার ক্ষমতা রাখা থমাস ডুলির বাংলাদেশ।

টুর্নামেন্টে নিজেদের প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশের রক্ষণ কি মালয়েশিয়ার গতি আর আক্রমণ সামলাতে পারবে? নাকি হামজা-শমিতদের মাঝমাঠেই আটকে যাবে মালয়েশিয়ার সব পরিকল্পনা? টেকটিক্যালি কে এগিয়ে? কার শক্তিমত্তা কোথায়? আর মালয়েশিয়ার কোন দুর্বলতায় আঘাত করলে ম্যাচটা পকেটে পুরতে পারে বাংলাদেশ? চলুন বিশ্লেষণে যাওয়া যাক।

র‍্যাঙ্কিং আর বাস্তবতা

কাগজে-কলমে দুই দলের মধ্যে ব্যবধানটা বেশ বড়। ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে মালয়েশিয়া ১৩৬, বাংলাদেশ ১৮১ নম্বরে। অর্থাৎ র‍্যাঙ্কিংয়ে দুই দলের ব্যাবধান ৪৫। তবে ফুটবলে র‍্যাঙ্কিং সবসময় মাঠের গল্প বলে না। আর এই ম্যাচেও বাংলাদেশের জন্য আশার জায়গা আছে। কোচ থমাস ডুলি নিজেই টুর্নামেন্ট শুরুর আগে সাংবাদিকদের বলেছেন, র‍্যাঙ্কিংয়ে সিঙ্গাপুর তাদের চেয়ে ৫০ ধাপ, আর মালয়েশিয়া প্রায় ৬০ ধাপ এগিয়ে থাকলেও, ভালো ফুটবল উপহার দিতে চান তিনি।

দুদলের সাম্প্রতিক লড়াই:

দুই দলের সর্বশেষ দেখা হয়েছিল ২০২২ সালের এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে। সেবার মালয়েশিয়া ৪-১ গোলে জিতেছিল। তবে তার আগে ২০১২ সালে দুই দল ১-১ ড্র করেছিল এবং ২০১৫ সালে মালয়েশিয়ার মাঠে ম্যাচটি শেষ হয়েছিল গোলশূন্য ড্রয়ে। অর্থাৎ, সাম্প্রতিক ইতিহাসে বাংলাদেশ যে একতরফাভাবে পিছিয়ে আছে, এমনটা নয়।

বাংলাদেশ - শক্তিমত্তা ও দুর্বলতা

এবার আসা যাক বাংলাদেশ দল প্রসঙ্গে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে— মাঝমাঠ। হামজা চৌধুরী এবং শমিত শোম থাকায় বাংলাদেশের মিডফিল্ডে বল দখল, প্রেসিং এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভাঙার ক্ষমতা আগের চেয়ে বেড়েছে। বিশেষ করে হামজা প্রতিপক্ষের আক্রমণ থামিয়ে দ্রুত বল সামনে পাঠাতে পারলে বাংলাদেশ কাউন্টার অ্যাটাক থেকে সুযোগ তৈরি করতে পারে।

আর ফরোয়ার্ড লাইনেও নতুন অপশন পেয়েছে বাংলাদেশ। ইংল্যান্ডে বেড়ে ওঠা ফরহান আলী ওয়াহিদকে দলে নিয়েছেন কোচ থমাস ডুলি। ফরহানের ফিনিশিং ক্ষমতার ওপর ডুলির আস্থা আছে। এছাড়া তিনি দলে নিয়েছেন জাপানে বেড়ে ওঠা আরেক ফরোয়ার্ড শুকি ইতোফুসাকে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো, বক্সের ভেতরে কার্যকর ফিনিশারের অভাব। তাই ফরহান কিংবা শুকি ইতোফুসাকে ঘিরে আলাদা আগ্রহ থাকছেই। কিন্তু এখানেই বাংলাদেশ দলকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি চলে আসে।

গোল করবেন কে?

মালয়েশিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ যদি শুধু রক্ষণ সামলে ডিফেন্সিভ ফুটবল খেলে যায়, তবে ম্যাচ জেতা যাবে না। কারণ মালয়েশিয়ার বিপক্ষে সুযোগ যে খুব বেশি আসবে- এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। তাই বাংলাদেশ যে কয়েকটি সুযোগ পাবে, সেগুলো কাজে লাগানোই হতে পারে ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। 'ক্লিনিকাল ফিনিশিং'-এর ঘাটতি এর আগেও বাংলাদেশকে অনেক ম্যাচে ভুগিয়েছে।

দীর্ঘ সময় দলগত প্রস্তুতির ঘাটতি

২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত তিনটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। ভিয়েতনামের কাছে ৩-০ গোলে হারের পর সিঙ্গাপুরের কাছেও ১-০ ব্যবধানে হেরেছে হামজারা। তবে সবশেষ ম্যাচে ইউরোপের সান মারিনোকে ২-১ গোলে হারাতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ।

এরপর দীর্ঘ বিরতির পর আবার আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফিরছে বাংলাদেশ। এই প্রস্তুতির ঘাটতি যাতে প্রভাব না ফেলে, সেজন্য ঢাকায় দীর্ঘ সময় স্থানীয় ফুটবলারদের নিয়ে ক্যাম্প করিয়েছেন থমাস ডুলি। আর ইন্দোনেশিয়ায় দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন হামজা, শমিত সোম ও ফারহান আলী ওয়াহিদরা। তাঁরা কম সময়ে দলের সঙ্গে কত দ্রুত মানিয়ে নিতে পারেন, সেটাও ম্যাচে বড় প্রভাব ফেলবে।

পুরো ম্যাচে মনোযোগের অভাব:

বাংলাদেশ দলের আরেকটা বড় সমস্যা হলো, শেষ মুহূর্তের অসাবধানতা। এই যেমন ম্যাচের শেষ ১০-১৫ মিনিটে ডিফেন্সে মনোযোগ হারানো, কিংবা গোলকিপারের তালগোল পাকানো। সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি ম্যাচে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। মালয়েশিয়ার মতো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এমন ভুল করার অর্থ হচ্ছে, ম্যাচ থেকেই ছিটকে পড়া।

মালয়েশিয়া: শক্তিমত্তা

এবার আসা যাক মালয়েশিয়ার কথায়। মালয়েশিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি— তাদের আক্রমণের বৈচিত্র্য এবং গতি। দলে আছেন আরিফ আইমান, বার্গসন দা সিলভা, ফয়সাল হালিম, স্টুয়ার্ট উইলকিন, নোয়া লাইন, ডিওন কুলসদের মতো খেলোয়াড়।

বিশেষ করে আরিফ আইমানের মতো উইঙ্গাররা ওয়ান-অন-ওয়ান বা একের বিপরীতে এক পরিস্থিতিতে বিপদ তৈরি করতে পারেন। আর সামনে বার্গসনের মতো স্ট্রাইকার থাকায় বক্সের ভেতরে বল পৌঁছে দিতে পারলে বাংলাদেশকে কঠিন পরীক্ষায় পড়তে হতে পারে।

সাম্প্রতিক আসিয়ান হুন্দাই কাপে মালয়েশিয়া গ্রুপ পর্বে মিয়ানমারকে ২-১ গোলে, লাওসকে ৪-০ এবং ফিলিপাইনকে ১-০ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠেছিল। এরপর ভিয়েতনামের কাছে দুই লেগ মিলিয়ে ৪-০ গোলে হেরে বিদায় নিলেও আক্রমণে মালয়েশিয়ার সামর্থ্য নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

আর একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। মালয়েশিয়ার কোচ তান চেং হো আক্রমণাত্মক ফুটবল পছন্দ করেন। তবে সম্প্রতি তিনি জানিয়েছেন, বড় দলের বিপক্ষে পুরোপুরি ছড়ানো ফুটবল না খেলে তিনি কাঠামো ধরে রেখে আক্রমণে যেতে চান। সুতরাং বাংলাদেশকে শুধু মালয়েশিয়ার ফরোয়ার্ডদেরই নয়, তাদের মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ তৈরির পথটাও বন্ধ করতে হবে।

মালয়েশিয়া: দুর্বলতা

তবে মালয়েশিয়া দলটির কিছু দুর্বলতাও আছে। প্রথমত, তারা এখনো পুরোপুরি নতুন একটি সেটআপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কোচ নিজেই বলেছেন, তারা নতুন দল ও নতুন সেটআপের মতো অবস্থায় আছে এবং অভিজ্ঞতা ও তরুণদের মধ্যে সঠিক সমন্বয় খুঁজছেন।

তার ওপর ম্যাচের ঠিক আগে— ফারিস দানিশ, সার্জিও আগুয়েরো ও রোমেল মোরালেস— এই তিন নির্ভরযোগ্য ফুটবলার ছিটকে গেছেন চোটের কারণে। অর্থাৎ, মালয়েশিয়ার স্কোয়াড শক্তিশালী হলেও কম্বিনেশন নিয়ে শেষ মুহূর্তে কিছু পরিবর্তন আনতে হয়েছে।

হাই ডিফেন্সিভ লাইন ও ফিজিক্যাল ফুটবলে অস্বস্তি:

আক্রমণে ওঠার সময় মালয়েশিয়ার দুই ফুলব্যাক বেশ ওপরে উঠে খেলে। ফলে তাদের রক্ষণভাগের পেছনে অনেকটা খালি জায়গা তৈরি হয়। এছাড়া শারীরিকভাবে কড়া ট্যাকল এবং প্রফেশনাল ফাউলের মুখে পড়লে অনেক সময় স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ফেলে দলটি। আর এই সুযোগটাই বাংলাদেশ কাজে লাগাতে পারে।

মাচ নির্ধারিত হবে কোথায়?

তাহলে ম্যাচের ভাগ্য কোথায় নির্ধারিত হতে পারে? এক্ষেত্রে তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত মিডফিল্ড। হামজা-শমিত বনাম মালয়েশিয়ার মিডফিল্ড।  বাংলাদেশ যদি মাঝমাঠে বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে, মালয়েশিয়ার আক্রমণের ধার অনেকটাই কমানো সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের দুই প্রান্তের রক্ষণ। মালয়েশিয়ার উইঙ্গাররা জায়গা পেলে বিপদ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ফুলব্যাকের পেছনে জায়গা ছেড়ে দিলে বাংলাদেশের রক্ষণকে দ্রুত নিচে নেমে আসতে হবে।

তৃতীয়ত, কাউন্টার অ্যাটাক। এ ধরনের প্রতিপক্ষের বিপক্ষে বাংলাদেশ সাধারণত পুরো ম্যাচ বল দখলে রেখে খেলে না। তাই মালয়েশিয়া যখন অনেক খেলোয়াড় নিয়ে আক্রমণে উঠবে, তখন তাদের পেছনে তৈরি হওয়া স্পেস বা জায়গা কাজে লাগানোই বাংলাদেশের বড় অস্ত্র হতে পারে। এখানে রাকিব হোসেন, মোরসালিন, ফাহামেদুল কিংবা ফরহান— যে-ই সুযোগ পান, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে তা কাজে লাগাতে হবে।

এছাড়া বাংলাদেশ যদি ম্যাচের প্রথম ২০-২৫ মিনিট গোল হজম না করে, ধীরে ধীরে মালয়েশিয়ার ওপর চাপ তৈরি করার সুযোগ আসবে। তাই বাংলাদেশকে শুরু থেকেই ধৈয্য ও মনোযোগ ধরে রেখে খেলতে হবে। এক্ষেত্রে তাই বলা যেতেই পারে, ম্যাচটা হবে ধৈর্য বনাম চাপের লড়াই। আর এই লড়াইয়ে জয় কে পাবে, তা জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।