মেসির বিদায়: রেখে গেলেন অমর এক রূপকথা

নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়। সব গল্পকেই থামতে হয় সমাপ্তির টানে। কিন্তু কিছু রূপকথা থামার পর রেখে যায় অসীম শূন্যতা। দীর্ঘ ২১টি বছর, যে জার্সিতে তিনি স্বপ্ন দেখেছেন, কাঁদিয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বকে জয় করেছেন— সেই আকাশি-সাদা জার্সিতে আজ তিনি শেষবার মাঠে পা রাখলেন।

এএফএ ট্রেনিং কমপ্লেক্স থেকে বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্তাল স্টেডিয়াম— পুরো পথটাই যেন রূপ নিয়েছিল এক অশ্রুসিক্ত রাজপথে। পুলিশের প্রটোকল ভেদ করে ছুটে আসা হাজারো ভালোবাসার ভিড়ে বাসের জানালায় বসে নিঃশব্দে কাঁদছিলেন এক মহাতারকা।

মনুমেন্তালের গ্যালারি আজ আর শুধু ফুটবলপ্রেমীদের ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল ভালোবাসার মন্দির। মাঠের মাঝে বিছানো ছিল সেই আইকনিক ১০ নম্বর জার্সি, যেখানে কোনো নাম নেই— শুধু লেখা ‘GRACIAS’... ধন্যবাদ লিও!

তিন সন্তানের হাত ধরে মাঠে ঢুকলেন মেসি। আতশবাজিতে আলোকিত আকাশ। জাতীয় সংগীত বাজল। গলা ভিজে এল তাঁর। আর গ্যালারি? এক সুরে গেয়ে উঠল, 'লিও মেসির সাথে… আমরা সবাই জয়ের আনন্দ উদযাপন করতে যাচ্ছি।'

মেসির চোখে আজ স্মৃতির পাহাড়ে চেপে বসা আবেগ। এই বিদায়বেলায় মনুমেন্তালের ভিআইপি বক্সে কেবল একজনই ছিলেন না— মেসির বাবা হোর্হে মেসি, যিনি মাত্র দু’মাস আগে পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে। গ্যালারিতে পরিবারের অন্য সদস্যদের ভিড়ে বাবার না থাকাটা হয়তো মেসির হৃদয়ে অদেখা রক্তক্ষরণ তৈরি করছিল!

ম্যাচের দশম মিনিটে যখন রেফারি খেলা থামালেন, পুরো স্টেডিয়াম হাততালির ঝড়ে কেঁপে উঠল। মাঠের লড়াইয়ে তিনি কোনোদিন আপস করেননি, আজই বা করবেন কেন? প্রথমার্ধে কোনো গোল না হলেও, দ্বিতীয়ার্ধেই শুরু হলো মেসির জাদুকরী প্রদর্শনী!

৪৮ মিনিটে মেসির নিখুঁত কর্নার থেকে ওতামেন্দির দুর্দান্ত গোল। মজার বিষয়, আজ ছিল ওতামেন্দিরও বিদায়ী ম্যাচ! এরপর নিকো পাসকে দিয়ে আরেকটা গোল করালেন মেসি। যাকে অনেকেই মেসির উত্তরসূরী ভাবতে শুরু করেছেন। আর ৭১ মিনিটে? স্পট কিক থেকে জালে বল জড়িয়ে নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ গোলটি করলেন মেসি! সতীর্থরা তাকে বৃত্তের মাঝে ঘিরে উদ্‌যাপন করল— যেন এক রাজাকে তার বিদায়ী কুচকাওয়াজে সেলাম জানাচ্ছে পুরো দল!

রেফারির শেষ বাঁশি বাজল। এরপর আকাশে ড্রোনের আলোয় ফুটে উঠল দুটি শব্দ— ‘Gracias Leo’। তা দেখে আপ্লুত হলেন মেসিও।

কিন্তু আসল আবেগটা তখনও বাকি ছিল। মাইক হাতে নিয়ে কাঁপানো কণ্ঠে যখন মেসি বললেন— ‘আজকের এই রাতে সবার আগে মনে পড়ছে বাবার কথা...।’ এরপরও মেসি যা বললেন, তাতে আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না সতীর্থরাও। মেসি বললেন, ‘আমি এই জায়গা ছেড়ে যেতে চাই না, আমি এই মাঠ ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না... আপনাদের খুব মিস করব’

মেসির মুখে এমন কথা শোনার পর শুধু ফুটবল বিশ্বই নয়, কেঁদে ওঠেন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এনসো ফের্নান্দেস, রদ্রিগো দে পল, হুলিয়ান আলভারেসদের মতো পুরো দল।

একটি যুগের অবসান হলো আজ। যে ফুটবল বিশ্ব তাকে ফুটবল ঈশ্বর বানিয়েছে, তিনি আজ সাধারণ একজন আর্জেন্টাইন হিসেবে গর্ব প্রকাশ করে নিঃশব্দে গুটিয়ে নিলেন বুটজোড়া। আর রেখে গেলেন হাজারো স্মৃতি।