এই তো, গত ফেব্রুয়ারিতে যোগ দিলেন রেয়াল মাদ্রিদে। ১০ ম্যাচ খেলা হয়ে গেছে স্প্যানিশ কৌলিন ক্লাবটির হয়ে, ২ গোলও করেছেন।
এতটুকুই লিন্দা কাইসেদোর গল্পটাকে আকর্ষণীয় করে তুলতে যথেষ্ট। গত ফেব্রুয়ারিতে ১৮তম জন্মদিনের কেক কেটেছেন, তার পরের দিন – ২৩ ফেব্রুয়ারিই যোগ দিয়েছেন মাদ্রিদে। কলম্বিয়ার ভাইয়ে দেল কাউকা অঞ্চল থেকে উঠে আসা এক তরুণীর জন্য ফুটবলে এর চেয়ে ভালো শুরু আর কী হতে পারে!
কিন্তু এতটুকুতে লিন্দা কাইসেদোর ১৮ বছরেই উত্থান-পতনে ভরা, লড়াইয়ের সৌন্দর্য শেখানো জীবনের কিছুই আসলে বলা হয় না। তার নামের প্রথম অংশটা বাংলা করলে যা দাঁড়ায়, তার জীবনের গল্পটাও তেমনই – সুন্দর।
কঠিনও। হয়তো জীবনের কঠিনতম রূপটা দেখে, সেটিতে বিজয়ী হয়ে বেরিয়ে আসতে পারার কারণেই তার গল্পটা বিশেষ।
১৪ বছর বয়সেই নিজ অঞ্চলের ক্লাব আমেরিকা দে কালির হয়ে পেশাদার অভিষেক কাইসেদোর। সে বছরে লিগও জেতেন। খেলার ধরনে মিলের কারণে তাকে ‘কলম্বিয়ান নেইমার’ ডাকেন অনেকে। এমন অমিত প্রতিভাধরকে কলম্বিয়া সিনিয়র মেয়েদের জাতীয় দলে সুযোগ দিয়ে দেয় দ্রুতই। ২০১৯ সালেই কলম্বিয়ার জার্সি গায়ে চড়ল। উড়ন্ত শুরু যাকে বলে!
কিন্তু ২০২০ সালে, ১৫ বছর বয়সে সব স্বপ্ন বিসর্জনের শঙ্কা। কাইসেদোর ডিম্বাশয়ে ক্যানসার ধরা পড়ল। ফুটবল কি ছার, জীবন নিয়েই টানাটানি! কিন্তু ৭ মাসের লড়াইয়ে ক্যানসারকে হারিয়ে ফিরলেন কাইসেদো।
এরপর? ফুটবল পায়ে ছুটে বেড়ানো।
ক্যানসারের বিরুদ্ধে জিতে ফেরার পর যোগ দেন দেপোর্তিভো কালিতে, ২০২১ সালে লিগ জিতলেন সেখানেও। কিন্তু মাঠে কাইসেদোর অবিশ্বাস্য গল্পের বেশিরভাগ তো তখনো দেখাই হয়নি।
কলম্বিয়ার সিনিয়র দলকে ২০২২ মেয়েদের কোপা আমেরিকার ফাইনালে নিয়ে গেলেন, সেখানে অবশ্য হট ফেবারিট ব্রাজিলের বিপক্ষে আর পেরে ওঠা হয়নি। তবে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হলেন কাইসেদোই। জুলাইয়ে কোপা আমেরিকা শেষ হলো, আগস্টে কাইসেদো গেলেন বিশ্বকাপ খেলতে। সিনিয়র দলের বিশ্বকাপ নয়, অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ। কাইসেদোর বয়স যে তখনো ১৭!
জার্মানিকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করা কলম্বিয়া গ্রুপে শীর্ষ দল হয়েই কোয়ার্টার ফাইনালে উঠল, গ্রুপের শেষ ম্যাচে এসে দুই গোল কাইসেদোর পায়ে। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে আবার ব্রাজিল পড়ল সামনে, মাসখানেক আগের কোপা আমেরিকার ফাইনালের মতো এখানেও ব্রাজিলের কাছেই হেরে স্বপ্নভঙ্গ কলম্বিয়ার।
কিন্তু কাইসেদোকে তা আর থামাতে পারল কই!
আগস্টে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ খেললেন, অক্টোবরে গেলেন আরেক বিশ্বকাপ খেলতে। অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপ। বয়স তো ১৭ পার হয়ে যায়নি, খেলতে তাই বাধা ছিল না। কাইসেদো খেললেন, এবং কী দারুণই না খেললেন!
স্পেনের কাছে ১-০ গোলে বিশ্বকাপ শুরু হলো কলম্বিয়ার, কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে তারা উঠেছে গ্রুপ শীর্ষে থেকেই! গ্রুপে পরের দুই ম্যাচে কলম্বিয়ার চার গোলের তিনটি কাইসেদোর। নকআউট পর্বে তানজানিয়ার বিপক্ষেও গোল এল। গোলশূন্য সেমিফাইনালে টাইব্রেকারে জিতে কলম্বিয়া ফাইনালে ওঠে, মাসখানেক আগের কোপা আমেরিকার মতো এখানেও ফাইনালে হার। ফাইনালে প্রতিপক্ষ? স্পেন। স্কোরলাইন? ১-০। যেভাবে শুরু, সেভাবেই শেষ, মাঝে কাইসেদোর ঝলক।
রেয়াল মাদ্রিদের নজরেও পড়ে গেলেন সহজেই। বয়স ১৮ হওয়ার আগে যোগ দেয়া সম্ভব ছিল না। ১৮তম জন্মদিনের কেক কেটেই তাই মাদ্রিদের হয়ে গেলেন। এরপর আর পেছনে ফেরে কে! প্রতিভা তো আর আছেই, প্রচারও মিলে গেল।
এবার নিউজিল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ায় সিনিয়র মেয়েদের বিশ্বকাপে তাই লিন্দা কাইসেদো আলোচিত তারকাদের একজন। আলোচিত তরুণদের একজনও। কেন এত আলোচিত, সেটা কাল দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচে বুঝিয়ে দিয়েছেন কাইসেদো। গোলটাতে যদিও কোরিয়ান গোলকিপারের ‘অবদান’ আছে, বল তার হাত ফসকে গেছে। তবে প্রতিপক্ষের অর্ধে বল পেয়েই তিন-চার খেলোয়াড়ের ফাঁক গলে ঢুকে কাইসেদোর শটটা ছিল দারুণ।
সিনিয়র মেয়েদের বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচেই গোল দিয়ে একটা বিশেষ রেকর্ডেও নাম লিখিয়ে ফেললেন কাইসেদো। আগস্টে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ, অক্টোবরে অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপের পর জুলাইয়ে সিনিয়র মেয়েদের বিশ্বকাপ – ১২ মাসের মধ্যে তিন বিশ্বকাপে গোলের রেকর্ড মেয়েদের ফুটবলে আর কারও নেই।
গোলের রেকর্ড থাকবে কি, এক বছরে তিন ভিন্ন বিশ্বকাপে খেলার রেকর্ডই তো কারও নেই!