বয়স মাত্র ২২, তবে এরই মধ্যে সম্ভবত জীবনের দুটি রূপ ভালোভাবে দেখা হয়ে গেছে ব্রিটিশ টেনিসকন্যা এমা রাদুকানুর।
১৯ বছর বয়সেই ২০২১ ইউএস ওপেন জিতে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন রাদুকানু। এমন একজনকে নিয়ে কাড়াকাড়ি, হুড়োহুড়ি বাড়ানোর জন্য ব্রিটিশ মিডিয়া তো ছিলই। একের পর এক স্পনসরও তাই ধরনা দিয়েছিল রাদুকানুর দরজায়। কিন্তু চোটে আর ফর্মহীনতায় গত তিন বছরে আর কিছু করতে না পারা রাদুকানুকেই এখন হুঁশিয়ারি শুনতে হচ্ছে, আবার জিততে শুরু না করলে দ্রুতই স্পনসররা তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করবে!
২০২১ ইউএস ওপেন যেন এখন রাদুকানুর কাছে দূর অতীতের সুখস্মৃতি। ১৯ বছরের কোনো তরুণীর ইউএস ওপেন জেতা তো এমনিতেই সাড়া ফেলে দেওয়ার মতো, রাদুকানু ব্রিটিশ বলে সাড়াটা আরও বেশি পড়ল আর কী! এমন সাড়া জাগানোর ক্ষেত্রে ব্রিটিশ মিডিয়া যে অদ্বিতীয়! এর প্রভাবও পড়ল রাদুকানুর ব্যাংক ব্যালেন্সে। ইংলিশ দৈনিক ডেইলি মেইল জানাচ্ছে, ডিওর, পোরশা, টিফ্যানি, ব্রিটিশ এয়ারওয়েইজ, ভোডাফোন, এভিয়ানের মতো নামকরা সব ব্র্যান্ড রাদুকানুকে শুভেচ্ছাদূত হিসেবে লুফে নিয়েছিল। দীর্ঘমেয়াদী সেসব চুক্তির এমনই প্রভাব যে, এই ২০২৪ সালেও স্পোর্টিকোর বিশ্লেষণে বিশ্বের নারী অ্যাথলেটদের মধ্যে আয়ের দিক থেকে সাত নম্বরে ছিলেন রাদুকানু!
ওই একবারই যা আলো ছড়িয়েছিলেন, এরপর থেকে যে চোট আর ফর্মহীনতায় কিছুই করতে পারেননি রাদুকানু। তিন বছর আগের সে ইউএস ওপেনের পর তাঁর গ্র্যান্ড স্ল্যাম রেকর্ড বলছে, এ সময়ে ১২টি গ্র্যান্ড স্ল্যামের মধ্যে ৪টিতে রাদুকানু খেলতে পারেননি চোটের কারণে। বাকি ৮টির মধ্যে ৭টিতেই দ্বিতীয় রাউন্ড পেরোতে পারেননি, অন্যটিতে বাদ পড়েছেন চতুর্থ রাউন্ডে। শুধু ব্র্যান্ড এন্ডোর্সমেন্ট থেকেই রাদুকানু পেয়েছেন ৯০ লাখ পাউন্ড, বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৩৭ কোটি টাকারও বেশি। সব মিলিয়ে আয় ছিল ১ কোটি ১০ লাখ পাউন্ড!
কিন্তু এখন সেসব চুক্তিই নাকি রাদুকানুর হাতছাড়া হওয়ার পথে। রাদুকানুর সময় খারাপ যাচ্ছে, তার প্রভাব পড়েছে র্যাঙ্কিংয়েও। গত এপ্রিলে তো র্যাঙ্কিংয়ে ৩০৩ নম্বরেও নেমে গিয়েছিলেন! গত কয়েক মাসে যদিও কোর্টে ফিরেছেন, কিছু ম্যাচ জিতেছেন, র্যাঙ্কিংয়েও এগোতে এগোতে এখন রাদুকানু আছেন ৫৭ নম্বরে। কিন্তু স্পনসরদের তা পছন্দ হবে কেন! তাঁদের চাওয়া, গ্র্যান্ড স্ল্যামে আবারও জেতা শুরু করুন রাদুকানু!
ব্রিটিশ স্পোর্টস ফাইন্যান্স বিশেষজ্ঞ ড. রব উইলসন ব্রিটিশ ওয়েবসাইট ওএলবিজিতে বলেছেন, ‘তিনি যদি ম্যাচ জেতা শুরু না করেন, টুর্নামেন্টগুলোর শেষ ভাগ পর্যন্ত যেতে শুরু না করেন, তাহলে এই বাণিজ্যিক চুক্তিগুলোর সবগুলোই নবায়ন বা পুনঃমূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাঁকে বেকায়দায় পড়তে হবে। সেটা হলে তাঁর ক্যারিয়ার শুরুতেই শেষ হওয়ার পথে চলে যাবে। সেটা খুবই খারাপ লাগবে, কারণ তিনি অসাধারণ প্রতিভাধর একজন অ্যাথলেট, বিজ্ঞাপনের বাজারেও চাহিদাসম্পন্ন।’
কোন ব্র্যান্ড থেকে রাদুকানু কেমন আয় করেন, সেটার একটা ফিরিস্তি দিয়েছে ডেইলি মেইল। নাইকি আর উইলসনের কাছ থেকে ১ লাখ পাউন্ড পান রাদুকানু, ডিওর আর টিফ্যানি এন্ড কোং এর চুক্তির প্রতিটি থেকে পান ২০ লাখ পাউন্ড করে। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের কাছ থেকে পান ১০ লাখ পাউন্ড। আর ভোডাফোনের সঙ্গে চুক্তিটি রাদুকানুর সবচেয়ে অর্থকরী – ৩০ লাখ পাউন্ড।
এর বাইরে পোরশা, স্পোর্টস ডিরেক্ট, এভিয়ান আর এইচএসবিসি-র সঙ্গে চুক্তিতে রাদুকানু কেমন আয় করেন সেটা জানা যায়নি বলে জানিয়েছে ডেইলি মেইল। তবে বিলাসবহুল কার কোম্পানি পোরশা চুক্তির অংশ হিসেবে রাদুকানুকে একটি ৯১১ ক্যারেরা জিটিএস কাব্রিওলে দিয়েছে, যেটির মূল্য ১ লাখ ২৫ হাজার পাউন্ড।
মেইল অনলাইন অবশ্য গত অক্টোবরে জানিয়েছিল, পোরশা রাদুকানুকে দেওয়া গাড়িটি নিয়ে গেছে। তবে গত মাসে রাদুকানু ইনস্টাগ্রামে একটি নতুন পোরশার ভিডিও দিয়েছেন, যেটিকে পোরশার কাছ থেকে পাওয়া তাঁর নতুন গাড়ি বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে।
তা গত তিন বছরে নিয়মিত পতনই দেখা রাদুকানু সম্প্রতি অবশ্য আবার কোর্টে ফিরে কিছুটা ছন্দ খুঁজে পেয়েছেন। গত সপ্তাহেই বিবিসি স্পোর্টে রাদুকানু নিজের ফর্মের উন্নতি নিয়ে বলেছেন, ‘মাঝে মাঝে নিজেকে মনে করিয়ে দিই যে, আমি সেরা ৬০-এ উঠে এসেছি, অথচ আমি (চোট থেকে ফেরার পর) এখনো ১৫টি ইভেন্টেও খেলিনি। এমন কিছু কিন্তু সচরাচর শোনা যায় না। এটার জন্য নিজেকেই আমার নিজের পিঠ চাপড়ে দেওয়া উচিত।’
চোটের কারণে সর্বশেষ প্যারিস অলিম্পিকে খেলতে পারেননি রাদুকানু, এরপর ইউএস ওপেনে প্রথম রাউন্ডেই বাদ পড়েছিলেন। তবে ২০২৪ সালের শেষটা ভালোই হয়েছে তাঁর, বিলি জিন কিং কাপের গ্রেট ব্রিটেনকে সেমিফাইনালে তোলার পথে নিজের তিন ম্যাচের তিনটিই জিতেছেন।