নারী–পুরুষ সাম্যের জয়গান অনেক দিন ধরেই গাইছে বিশ্ব। প্রতি বছর নারী দিবস এলেই এ নিয়ে বিস্তর লেখাজোখা হয়। সাম্য প্রতিষ্ঠায় একনো কতটা পিছিয়ে থাকল কে, সে নিয়ে চলে নানা বিশ্লেষণ। কিন্তু পোশাকের দিকে তাকালেই এসব আলোচনার ফাঁকিটি একটু হলেও ধরা পড়ে। আর তা হলো পকেট। এখনো নারীর পোশাকে পকেটের অস্তিত্বকে অনেকে বাহুল্য মনে করেন।
নারী ও পুরুষের পোশাকে পকেটের অস্তিত্ব থাকা-না থাকা নিয়ে যে বিতর্ক, তার নেপথ্যেও আছে বৈষম্যের সমীকরণ। অথচ আদিতে নারীরাই মূল্যবান নানা দ্রব্য বহনের জন্য থলে, যা বিবর্তিত হয়ে পকেটে রূপান্তরিত হয়েছে, তা বহন শুরু করেছিল। কিন্তু আধুনিক যুগ আসতে আসতে এই বহনের বিষয়টিই প্রশ্নসাপেক্ষ হয়ে ওঠে। বিষয়টি পরিষ্কার বোঝা যাবে ১৯৫৪ সালে ফরাসি পোশাক ডিজাইনার ক্রিশ্চিয়ান দিও–এর কথায়। তিনি বলেছিলেন—‘জিনিসপত্র রাখার জন্য পুরুষের পকেট প্রয়োজন, আর নারীর জন্য এটি অলঙ্কার।’
কিন্তু এই সময়ের আগেই কাগজের মুদ্রার প্রচলন ও বিস্তার সম্পন্ন হয়েছে। আর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে পকেটও বেশ নিজের স্থান পোক্ত করেছে। বিশেষত ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের হাত ধরে পকেটের বিস্তার হয়েছে দেশে দেশে। আর সাথে সাথে অনুচ্চারে ‘পকেট ও স্বাধীনতা’ গাঁটছড়া বেঁধেছে। আর এই গাঁটছড়া বাঁধার কালেই সুকৌশলে এবং অনেকটা অলক্ষ্যে বাদ পড়েছে নারীরা।
শুনতে যেমনই লাগুক, আজকের পোশাকে প্রায় অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে ওঠা পকেটেরও আছে এক লৈঙ্গিক বিভাজনের ইতিহাস। আগেই বলা হয়েছে—ষোড়শ শতক পর্যন্ত নারী–পুরুষ নির্বিশেষে থলে ব্যবহার করত, যা চোর, ছিনতাইকারীদের দৌরাত্মের কারণে ক্রমেই পোশাকের অন্দরে প্রবেশ করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত সমাধান হিসেবে আসে সেলাই করা পকেট। তবে এ ক্ষেত্রে বাদ পড়ে যায় নারীরা।
খেয়াল করলে বোঝা যাবে, এই সময়টিতেই অর্থনৈতিক ধারায় পরিবর্তন আসছে। বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে মানুষ ছড়িয়ে পড়ছে দিকে দিকে। কারখানাভিত্তিক অর্থনীতি প্রসার পাচ্ছে। ফলে সাধারণ খেটে–খাওয়া মানুষের চলাচল বেড়ে যাচ্ছে। সেই সময়টিতেই পোশাকের সাথে বহনযোগ্য থলে বা পকেটের কাঠামোতে পরিবর্তন আসছে এবং তাতে বাদ পড়ছে নারীরা।
পোশাক থেকে পকেট বাদ পড়াটাকে মনে হতেই পারে যে, এ আর এমন কী? কিন্তু এভাবে এড়িয়ে যাওয়ার কারণেই এখনো বিষয়টির তেমন মীমাংসা হয়নি। এখনো বাংলাদেশের মতো দেশে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়লেও নারীর পোশাকে পকেট থাকা এবং কোনো দ্বিধা ছাড়াই তার ব্যবহার করা সহজ নয়। নারীদের প্যান্টে তো পকেট থাকছে। প্রশ্ন হলো—কতজন নির্বিঘ্নে প্যান্ট পরতে পারছেন? শুধু বাংলাদেশে নয়, এখনো সালোয়ার–কামিজ বা শাড়িই ভারতবর্ষের কর্মজীবী নারীদের প্রধান পোশাক। সালোয়ারে অনেকে পকেট রাখলেও তা নির্বিঘ্ন ব্যবহার করা কঠিন। আর শাড়ির ক্ষেত্রে তো প্রশ্নই আসে না। ফলে কর্মজীবী নারীদের ভরসা এখনো সাইড ব্যাগ বা পার্স।
এই যে ব্যবহার করতে না পারা, এর সাথেই যুক্ত বৈষম্যের প্রশ্নটি। প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য পকেট ব্যক্তিস্বাধীনতার ক্ষেত্রে অনেক বড় ব্যবধান গড়ে দেয়। এ ক্ষেত্রে তথাকথিত মধ্যযুগ অনেক ভালো ছিল। ১৩ শতকের দিকে নারী–পুরুষ উভয়েই কাপড় বা চামড়ার থলে বহন করত, যা তাদের কোমর থেকে দড়ির সাহায্যে ঝোলানো থাকত। আগেই বলা হয়েছে কোমর থেকে শরীরের বাইরের দিকে ঝোলানো এই থলে বহন জারি ছিল ষোড়শ শতক পর্যন্ত, যত দিন না চোর–ছিনতাইকারীর দৌরাত্ম না বাড়ে। বাড়লে পরেও উভয়েই এই থলে পোশাকের নিচে লুকিয়ে ফেলে। কিন্তু ঝামেলা হয় ১৭ শতকে, সেলাই করা পেকেটর চল শুরুর পর। দেখা গেল পুরুষ পেকট পেল, নারী নয়। নারী তখনো থলেই বহন করছে, যা পরে তার পার্স বা সাইডব্যাগে রূপান্তরিত হয়।
পুরুষের পকেট ও নারীর থলে থাকায় সমস্যা কোথায়? উত্তর হচ্ছে জনপরিসরে ব্যবহারে। পুরুষ চাইলেই তার পকেট থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস যেমন বের করে কাজ সমাধা করতে পারে, এই ব্যবধানের পর নারীর ক্ষেত্রে আর স্কার্টের নিচ থেকে থলে বের করে জনপরিসরে প্রয়োজনের কাজটি সারা সম্ভব হয় না। কারণ, সামাজিক ট্যাবু। ব্যবধান রচনার সাথে সাথে এ সম্পর্কিত ট্যাবুও যে গড়ে উঠেছে। আর এই সময় থেকেই পকেট–সম্পর্কিত বৈষম্যেরও শুরু হয়।
নারীকে পকেট বহনের বদলে পার্স বা সাইডব্যাগ বহনের প্রস্তাব করা হয়, যা নিজেও একটি পুরুষের আবিষ্কার বলে জানাচ্ছে ফ্যাশন বিষয়ক ওয়েবসাইট ফোকওয়্যার। ফরাসি বিপ্লবের সময় থেকেই নারীর পরিধেয় থেকে থলে বা পকেট উধাও হতে শুরু করে। পুরুষশাসিত সমাজ রায় দেয়, নারীকে তার পকেটটি হাতে বা কাঁধে নিয়ে ঘুরতে হবে, যার নাম পার্স, যা কিনা ভীষণভাবে অলঙ্কৃত। নারীরাও তেমন কেউ প্রতিবাদ করেনি সেকালে। কিছুটা অলঙ্করণের কারণে, অনেকটাই গিলোটিনের ভয়ে। মূলত নারীরা যেন এমন কোনো বস্তু বহন করতে না পারে, যা বিপ্লবের সহায়ক, তা নিশ্চিত করতেই এ ব্যবস্থা। তখন নারীদের হাতে হাতে বহন করা পার্সে এমনকি একটি রুমাল বা কয়েন কোনোমতে আঁটত। উপরন্তু এই ছোট পার্সের বাজারীকরণ ঘটল এই ধারণা ছড়িয়ে যে, এটি নারীদের সামাজিক শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে। যে নারীর যত অবসর, যত পাইক–পেয়াদা আছে, সে ততই পার্স ব্যবহারের উপযোগী। আর বিপরীতে পকেটের পূর্ণ দখল নিল পুরুষ।
হ্যাঁ এই ধারায় বদল যে হয়নি, তা নয়। ২০ শতকের শুরু থেকেই বদল আসতে থাকে। নারী অধিকার, স্বাধীনতা নিয়ে সচেতনতা ও আন্দোলন বাড়তে থাকে। এর সাথে সাথে পোশাকে পকেটের অস্তিত্ব থাকা–না থাকার বিতর্কও বাড়তে থাকে। শুরুটা অবশ্য করেছিল ১৮ শতকে দ্য র্যাশনাল ড্রেস সোসাইটি। তারাই প্রশ্ন তোলে বিষয়টি নিয়ে। বহু পরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের উত্তেজনা বাড়ার সাথে সাথে এই ধারা বেগবান হতে থাকে। নারীর সাথে দেখা হলো পকেটের। সে সময় নারীরা স্মরণাতীতকালে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার হয়ে ওঠে। যুদ্ধে যাওয়া পুরুষদের চাকরিগুলো দখল করে নারীরা, সাথে ফিরে পায় পকেটও। বদল আসে পোশাকেও, যার সাথে যুক্ত পকেট হয়ে ওঠে নারী স্বাধীনতার বড় প্রতীক। ওই সময়কালেই ফরাসি ফ্যাশন ডিজাইনার পকেটসুদ্ধ নারীর পোশাক ডিজাইন করে সাড়া ফেলেন। হ্যাঁ, প্রকাশ্য পকেটের কথাই বলা হচ্ছে।
কিন্তু যুদ্ধফেরত পুরুষেরা এটা মানতে পারেনি। তারা আবারও নারীকে এই স্বাধীনতা বঞ্চিত করে। পকেটশূন্য হয়ে পড়ে নারীরা আবার, যা দেশে দেশে ফিরে পেতে এখনো বিস্তর পথ হাঁটতে হবে নারীদের। কারণ হিসেবে সামনে আছে দুটি বিষয়—এক. পার্স, সাইডব্যাগ ইত্যাদির ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি এত বিশাল ও সেই অনুপাতে তাদের প্রচার এতই প্রবল যে, তাতে নারীরাও মুগ্ধ বটে। দুই. দীর্ঘ চর্চার কারণে নারীরাও আর এই বৈষম্যের দিকে তাকানোর ফুরসৎ পাচ্ছে না। তাদের সামনে সাম্যের লড়াইয়ের আরও হাজারটা জায়গা ছড়িয়ে। পকেটশূন্য পোশাকের দিকে তাকানোর ফুরসৎ আর কই? তাকালে দেখা যেত, পুরুষের জিন্সের পকেটের চেয়ে নারীর জিন্সের পকেটের আকার ৪৮ শতাংশ ছোট ও সাড়ে ৬ শতাংশ চাপা। আর নারীদের প্যান্টের মাত্র ১০ শতাংশের সামনের পকেটে নারীর হাতটি আঁটতে পারে। হ্যাঁ, ২০১৮ সালে ৮০ জোড়া প্যান্টকে নমুনা বিন্দু হিসেবে নিয়ে এই ফলই পাওয়া গেছে।
তথ্যসূত্র: ভক্স, ফোকওয়্যার, গ্রে জার্নাল, হিস্টোরি ডট কম, কিংঅ্যান্ডঅ্যালেন ডট সিও ডট ইউকে