সিডনি হামলাকারী দুই বন্দুকধারীকে নিয়ে তথ্য

একজন ২৭ বছর আগে যান অস্ট্রেলিয়া, অন্যজন ৬ বছর আগে পড়েন গোয়েন্দা সংস্থার চোখে

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বন্ডি সমুদ্রসৈকতে ইহুদিধর্মীয় উৎসব হানাকায় দুই বন্দুকধারীর গুলিতে এ পর্যন্ত ১৫ জন নিহত ও ৪২ জন আহত হয়েছেন। দুই বন্দুকধারীর মধ্যে একজন হামলার সময়েই পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন, অন্যজন গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তদন্তের পর পুলিশের ধারণা, হামলাকারী দুজন বাবা-ছেলে।

অস্ট্রেলিয়ান সংবাদমাধ্যম ‘নাইন নিউজ’ জানাচ্ছে, পুলিশের তদন্তে আরও উঠে এসেছে, হামলাকারীদের একজন ৫০ বছর বয়সী সাজিদ আকরাম ১৯৯৮ সালে ‘স্টুডেন্ট ভিসা’য় অস্ট্রেলিয়ায় গেছেন। তবে কোন দেশ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় গেছেন, সেটা জানানো হয়নি। ২০০১ সালে ভিসা পরিবর্তন করে ‘পার্টনার ভিসা’ পেয়েছেন সাজিদ। অস্ট্রেলিয়ান কোনো নাগরিকের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হলে কিংবা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে সঙ্গী হিসেবে থাকলে ‘পার্টনার ভিসা’ পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। অন্য হামলাকারী ২৪ বছর বয়সী নাভিদ আকরামের জন্ম অস্ট্রেলিয়াতে, ২০০১ সালেই।

হামলার সময়ে সাজিদ ‘রেসিডেন্ট রিটার্ন ভিসা’র অধিকারী ছিলেন। এই ভিসা অস্ট্রেলিয়ায় ‘পারমানেন্ট রেসিডেন্ট’দের দেওয়া হয়, যিনি এই ভিসার অধীনে বৈধভাবে যেকোনো সময় অস্ট্রেলিয়া থেকে বেরোতে কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় ঢুকতে পারেন।

হামলায় সাজিদ মারা গেছেন পুলিশের গুলিতে। নাভিদ আহত, তবে নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের পুলিশ কমিশনার ম্যাল ল্যানিয়নের কথায় ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, নাভিদ বেঁচে যেতে পারেন। নাইন নিউজে সাজিদের মারা যাওয়ার কথা নিশ্চিত করে ল্যানিয়ন জানিয়েছেন, নাভিদ হাসপাতালে গুরুতর অবস্থায় আছেন, তবে তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল এবং পুলিশ হাসপাতালে নজরদারি করছে। ম্যাল ল্যানিয়ন বলেছেন, জোর ‘সম্ভাবনা’ যে নাভিদকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের শাস্তির মধ্য দিয়ে যেতে হবে। যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে, নাভিদ শারীরিকভাবে সেরে ওঠার মতো পরিস্থিতিতে আছেন।  

নাইন নিউজের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ২০১৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা এএসআইও-র নজরদারিতে পড়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেইটের (আইএস) সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ জেগেছিল। তবে তখন নাভিদ তাৎক্ষণিক কোনো হুমকি কি না, কিংবা কোনো সহিংসতায় জড়িত কি না, এ ব্যাপারে চূড়ান্ত রায় দেওয়ার মতো কোনো প্রমাণ পায়নি তদন্ত সংস্থাটি।

এদিকে হামলার আগে কীভাবে কী করেছিলেন, সিসিটিভি ফুটেজ ও তদন্তের পর সেসবের অনেক কিছুই উঠে এসেছে নাইন নিউজের প্রতিবেদনে। সেখানে জানানো হচ্ছে, বন্ডি সৈকত থেকে আধা ঘণ্টার দূরত্বে ক্যাম্পসি এলাকায় কিছুদিন আগে একটি কক্ষ সাময়িকভাবে ভাড়া করেছিলেন সাজিদ ও নাভিদ। সিসিটিভি ফুটেজে স্থানীয় সময় রোববার বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটে তাঁদের দুজনকে ক্যাম্পসির ক্ষণস্থায়ী কক্ষ থেকে বেরোতে ও গাড়িতে উঠতে দেখা যায়।  

পুলিশ কমিশনার ম্যাল ল্যানিয়ন বলেছেন, দুজনের ব্যাপারে এখনো খুব বেশি জানা যায়নি। তবে নাইন নিউজের অপরাধ বিটের প্রতিবেদককে পুলিশের একটি সূত্র বলেছে জানিয়ে সংবাদমাধ্যমটি লিখেছে, নাভিদ আকরামের সঙ্গে আইএসের যোগাযোগ থেকে থাকতে পারে। নাভিদের গাড়িতে আইএসের একটি পতাকাও পুলিশ পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল পুলিশের (এএফপি) কমিশনার নাইজেল রায়ান বলেছেন, নাভিদ ২০১৯ সালে এএসআইও’র নজরদারিতে এসেছিলেন।

‘অন্য কিছু পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের ভিত্তিতে তাঁর কার্যক্রমের ওপর নজরদারি করা হয়। সে সময়ে আমাদের বিশ্লেষণে উঠে আসে যে তিনি কোনো সম্ভাব্য হুমকি কি না কিংবা সংঘাতে জড়াতে পারেন কি না, এ ব্যাপারে কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি’ – বলেছেন নাইজেল রায়ান।

দুই হামলাকারী থাকতেন সিডনির দক্ষিণ-পশ্চিমে বনিরিগ অঞ্চলে, যা হামলার ঘটনাস্থল বন্ডি সৈকত থেকে ঘণ্টাখানেকের দূরত্বে অবস্থিত। সেখান থেকে বন্ডি সৈকত থেকে আধা ঘণ্টার দূরত্বের ক্যাম্পসিতে কদিন আগে কক্ষ ভাড়া নেন দুই হামলাকারী সাজিদ ও নাহিদ। হামলার পর তাঁদের বাড়ি থেকে দুটি রাইফেল উদ্ধার করে পুলিশ।

তাঁদের বনিরিগের বাড়ির পাশের প্রতিবেশিদের সঙ্গে কথা বলেছেন গোয়েন্দারা, সিসিটিভি ফুটেজও বিশ্লেষণ করেছেন। নাইন নিউজের প্রতিবেদককে সাজিদ-নাভিদের প্রতিবেশিরা বলেছেন দাবি করে সংবাদমাধ্যমটি লিখেছে, দুই হামলাকারীকে প্রতিবেশিরা ‘রহস্যময় লোক’ বলে অভিহিত করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রতিবেশি বলেছেন, ‘ভয়ংকর! কখনো ভাবিনি এমন কারও প্রতিবেশি হিসেবে আছি! ব্যাপারটা খুবই ভয়ের! ওরা খুব রহস্যজনক লোক, কাউকে ঠিকমতো হ্যালোও বলত না।’

ওই প্রতিবেশি জানিয়েছেন, তিনি ছয় বছর আগে বনিরিগের ওই এলাকায় থাকতে শুরু করার আগে থেকেই দুই হামলাকারী সেখানকার বাসিন্দা ছিলেন।

পুলিশ জানাচ্ছে, লাইসেন্স করানো অস্ত্র দিয়েই এই হামলা চালানো হয়েছে। পুলিশ কমিশনার ল্যানিয়ন জানিয়েছেন, সাজিদের কাছে লাইসেন্স করানো ছয়টি অস্ত্র ছিল। ছয়টি অস্ত্রই উদ্ধার করা হয়েছে, যার মধ্যে দুটি উদ্ধার করা হয়েছে ক্যাম্পসিতে সাজিদ-নাভিদের ভাড়া করা কক্ষ থেকে।

ল্যানিয়ন জানিয়েছেন, ৫০ বছর বয়সী সাজিদ ১০ বছর আগে থেকেই নিউ সাউথ ওয়েলস কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অস্ত্রের লাইসেন্স নিয়েছিলেন। একটি গান ক্লাবের সদস্যও ছিলেন সাজিদ।

ল্যানিয়ন জোর দিয়ে বলেছেন, অস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়াটি সব সময়ই বেশ কঠোর ছিল। তবে অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজ জানাচ্ছে, এই হামলার ঘটনার পর আজ মন্ত্রীসভার বৈঠকে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ নির্দেশনা দিয়েছেন, অস্ত্রের লাইসেন্স করানোর প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা হবে। এই কঠোর নির্দেশনার মধ্যে একজন ব্যক্তির লাইসেন্স করানো অস্ত্রের সংখ্যা আরও সীমিত করার ঘোষণাও থাকতে পারে।

হামলার আগে সাজিদ ও নাভিদ তাঁদের পরিবারের কাছে নিজেদের অবস্থানের ব্যাপারে মিথ্যা কথাও বলেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। নাভিদের মা ভেরেনা সিডনি মর্নিং হেরাল্ডকে বলেছেন, গত শনিবার সকালে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তিনি সর্বশেষবার কথা বলেছেন, তখন বলা হয়েছিল বাবা ও ছেলে নিউ সাউথ ওয়েলসের দক্ষিণ উপকূলে জার্ভিস বে-তে আছেন। ঘটনাস্থল বন্ডি সৈকত থেকে জার্ভিস বে প্রায় তিন ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত।