বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে সোমালিল্যান্ডকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা করেছেন যে, ইসরায়েল ও সোমালিল্যান্ড পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছে।
এই পদক্ষেপকে 'আব্রাহাম অ্যাকর্ডস'-এর চেতনার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন নেতানিয়াহু। উল্লেখ্য, আব্রাহাম অ্যাকর্ডস হচ্ছে মার্কিন মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের সাথে আরব দেশগুলোর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি প্রক্রিয়া।
ইসরায়েলের কাছ থেকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পাওয়ার হঠাৎ করেই বিশ্ব রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অপেক্ষায় থাকা ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ খ্যাত অঞ্চলের ভূখণ্ড সোমালিল্যান্ড।
সোমালিল্যান্ড আসলে কী?
সোমালিল্যান্ড হলো পূর্ব আফ্রিকার একটি অঞ্চল যা একসময় ব্রিটিশদের শাসনে ছিল। ১৯৯১ সালে সোমালিয়ায় বিধ্বংসী গৃহযুদ্ধ শুরু হলে এই অঞ্চলটি নিজেদেরকে স্বাধীন ঘোষণা করে। এরপর থেকে গত ৩৪ বছর ধরে তারা কার্যত একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মতো পরিচালিত হয়ে আসছে। তাদের নিজস্ব মুদ্রা, পতাকা, সংসদ এবং গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থা রয়েছে। এমনকি প্রতিবেশী দেশগুলোতে বিশৃঙ্খলা থাকলেও সোমালিল্যান্ড তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল।
তবে সমস্যা হলো, জাতিসংঘ বা অন্য কোনো দেশ গত তিন দশক ধরে তাদের এই স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়নি। সোমালিয়া সরকার সবসময়ই সোমালিল্যান্ডকে তাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে। এবারে প্রশ্ন হচ্ছে, হঠাৎ করে ইসরায়েল কেন সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দিল।
কেন ইসরায়েল সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দিল?
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের এই স্বীকৃতির পেছনে গভীর কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ কাজ করছে। মোটা দাগে তাঁদের প্রধানত তিনটি স্বার্থ থাকতে পারে সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতিদানের পেছনে।
লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ: সোমালিল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থান এডেন উপসাগর এবং লোহিত সাগরের সংযোগস্থলে। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ওপর নজরদারি এবং তাদের অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে সোমালিল্যান্ডের ভূমি ইসরায়েলের জন্য একটি 'ফরোয়ার্ড বেজ' হিসেবে কাজ করতে পারে।
আব্রাহাম অ্যাকর্ডস সম্প্রসারণ: সংযুক্ত আরব আমিরাত- যারা ইতোপূর্বে ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে- সোমালিল্যান্ডের বারবেরা বন্দরে একটি সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা করে। ইসরায়েলের এই স্বীকৃতি মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় তাদের মিত্রদের প্রভাব আরও শক্তিশালী করবে।
নিরাপত্তা সহযোগিতা: লোহিত সাগরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর সুরক্ষা প্রদানে সোমালিল্যান্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে।
বিতর্ক ও ফিলিস্তিন ইস্যু
সোমালিল্যান্ডের এই স্বীকৃতি নিয়ে একটি বড় বিতর্কও তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বেশ কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জাতিগতভাবে নির্মূল করে তাদের আফ্রিকান এই অঞ্চলে, অর্থাৎ সমালিল্যান্ডে স্থানান্তরের একটি গোপন পরিকল্পনার অংশ হতে পারে এই স্বীকৃতি। যদিও মিশর ও জিবুতির মতো দেশগুলো এই ধরনের যেকোনো পরিকল্পনার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে।
সোমালিয়া ও আন্তর্জাতিক মহলের তীব্র প্রতিবাদ
ইসরায়েলের এই ঘোষণায় সোমালিয়া সরকার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারা বিষয়টিকে তাঁদের সার্বভৌমত্বের ওপর একটি 'সরাসরি আক্রমণ' এবং 'অবৈধ পদক্ষেপ' বলে অভিহিত করেছে।
কেবল সোমালিয়া নয়, আরও বেশ কয়েকটি পক্ষও এই স্বীকৃতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
আফ্রিকান ইউনিয়ন: সংস্থাটি এই পদক্ষেপকে প্রত্যাখ্যান করে সতর্ক করেছে যে, এটি আফ্রিকার অন্যান্য দেশের সীমানা এবং স্থিতিশীলতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
মিশর ও তুরস্ক: দেশ দুটি জানিয়েছে, কোনো সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এমন হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। তুরস্কের মতে, এটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের পথকে বাধাগ্রস্ত করার একটি সুদূরপ্রসারী চাল বা কূটকৌশল হতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে মার্কিন প্রশাসন দ্বিধাবিভক্ত বলে জানা গেছে। সোমালিল্যান্ডকে মার্কিন স্বীকৃতি প্রদানের বিরোধিতা করে শুক্রবার নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া সাথে এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘কেউ কি জানেন সোমালিল্যান্ড আসলে কী?’
তবে গত আগস্টে, হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে সোমালিল্যান্ড প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন যে, তিনি এই বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আরেকটি জটিল বিষয়, সোমালিল্যান্ড। কিন্তু আমরা এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি।’
কেউ কেউ এমনটাও আশঙ্কা করছেন যে, সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দিলে সোমালিয়ার সাথে মার্কিন সামরিক সম্পর্কের অবনতি ঘটবে এবং সার্বিকভাবে সোমালিয়া-মার্কিন সম্পর্কের ওপর এর বিরুপ প্রভাব পড়বে। উল্লেখ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেখানে সৈন্য মোতায়েন করেছে, যেখানে তারা ইসলামিক আন্দোলন আল-শাবাবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সোমালি বাহিনীকে সমর্থন করে থাকে।
তবে মার্কিন প্রশাসনে সোমালিল্যান্ডের পক্ষে কথা বলছেন এমন প্রভাবশালী ব্যক্তিও আছেন। তাঁদেরই একজন মার্কিন রিপাবলিকান পার্টির প্রভাবশালী নেতা সিনেটর টেড ক্রুজ। তিনি সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। পাশাপাশি তিনি সোমালিল্যান্ড ও ইসরায়েলের মধ্যে গভীর সম্পর্ক স্থাপনের পক্ষেও বরাবরই সোচ্চার ছিলেন।
জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ইসরায়েলই প্রথম স্বাধীন দেশের স্বীকৃতি দিল সোমালিল্যান্ডকে। বিষয়টি সোমালিল্যান্ডের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হলেও, এই স্বীকৃতিতে পুরো ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ অঞ্চলে উত্তেজনা নতুন করে ডালপালা মেলেছে।
একদিকে এটি যেমন সোমালিল্যান্ডের জন্য বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ, অন্যদিকে এটি সোমালিয়া ও ইথিওপিয়ার মধ্যকার বিদ্যমান বিরোধকে আরও উসকে দিতে পারে। এখন দেখার বিষয়, ইসরায়েলের পর অন্য কোনো শক্তিশালী দেশ এই পথে হাঁটে কি না।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান