ট্রাম্পের নতুন চাল, এবারও কেউ নেই আমেরিকার পাশে

ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলো সোমবার জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে যে নৌ-অবরোধের পরিকল্পনা করেছেন, তাতে তারা অংশ নেবে না। তারা প্রস্তাব দিয়েছে, লড়াই শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রয়োজন হলে তারা ভূমিকা রাখবে। এই সিদ্ধান্তে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হতে পারেন এবং জোটের ভেতরে টানাপোড়েন আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে রাশিয়া আর চীনও এই অবরোধের সমালোচনা করেছে। রাশিয়া বলছে, এই অবরোধের কারণে বৈশ্বিক বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আর চীনের হুঁশিয়ারি, এই অবরোধের কারণে চীন এবং এশিয়া অঞ্চলের যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র যে উন্নয়নশীল দেশগুলো জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, তাদের চলমান অর্থনৈতিক সংকট আরও তীব্র হবে।  

ট্রাম্প বলেছেন, সোমবার থেকে শুরু হওয়া এই অবরোধের কাছাকাছি এলে ইরানের যেকোনো জাহাজ ধ্বংস করে দেওয়া হবে। সপ্তাহান্তে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ছয় সপ্তাহ ধরে চলা সংঘাত বন্ধে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি।

প্রথমে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য দেশের সঙ্গে মিলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ আটকে দেবে। তবে পরে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, এই অবরোধ শুধু ইরানের বন্দরগামী বা সেখান থেকে আসা জাহাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান মূলত নিজেদের ছাড়া অন্য সব জাহাজের জন্য এই জলপথ সীমিত করে রেখেছে। তারা প্রণালিটির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ স্থায়ী করতে চায় এবং সেখানে চলাচলকারী জাহাজ থেকে শুল্ক আদায়ের কথাও ভাবছে।

রোববার ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছিলেন, ‘অবরোধ শিগগিরই শুরু হবে। অন্যান্য দেশও এতে অংশ নেবে।’

তবে ব্রিটেন ও ফ্রান্সসহ ন্যাটোর মিত্ররা জানিয়েছে, তারা এই অবরোধে জড়াবে না। বরং তারা এমন একটি উদ্যোগে কাজ করছে, যার লক্ষ্য এই প্রণালিতে আবারও স্বাভাবিক নৌ চলাচল নিশ্চিত করা — যে পথ দিয়ে বিশ্বে ব্যবহৃত মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়।

এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের সঙ্গে তাদের আরেকটি মতবিরোধ তৈরি করেছে। এর আগে ট্রাম্প ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। ইরানে হামলার জন্য কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিমানকে তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে না দেওয়ার পর ইউরোপ থেকে কিছু সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ও বিবেচনা করছেন তিনি।

তীব্র চাপ

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বিবিসিকে বলেন, ‘আমরা এই অবরোধকে সমর্থন করছি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার সিদ্ধান্ত একেবারে স্পষ্ট — যত চাপই আসুক…কিছুটা চাপ তো ছিলই…তবু আমরা এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ব না।’

ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুট ইউরোপীয় সরকারগুলোকে বলেছেন, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিগগিরই সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি চান ট্রাম্প — গত সপ্তাহে কূটনীতিকেরা রয়টার্সকে এমনটাই জানিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার রুট বলেন, ন্যাটোর ৩২টি সদস্য দেশ একমত হলে এই প্রণালিতে একটি মিশন গঠনের মাধ্যমে জোটটি ভূমিকা রাখতে পারে।

ইউরোপের কয়েকটি দেশ জানিয়েছে, তারা এই প্রণালিতে সহায়তা করতে প্রস্তুত। তবে তা হবে কেবল তখনই, যখন যুদ্ধ শেষ হবে এবং ইরানের সঙ্গে এমন একটি চুক্তি হবে, যাতে তাদের জাহাজে হামলা করা হবে না।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সোমবার এক্স-এ (সাবেক টুইটার) জানিয়েছেন, ব্রিটেনসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে মিলে একটি বহুজাতিক মিশন গঠনে সম্মেলন আয়োজন করবে ফ্রান্স, যার লক্ষ্য হবে প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করা। তিনি বলেন, ‘এই সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক মিশন - যা যুদ্ধরত পক্ষগুলোর বাইরে থাকবে – সেটা শুধু পরিস্থিতি অনুকূল হলেই মোতায়েন করা হবে।’

ব্রিটিশ পার্লামেন্টে স্টারমার বলেন, এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো নিরাপদ নৌ চলাচলের নিয়ম তৈরি করা এবং ট্যাঙ্কারগুলোকে নিরাপত্তা দিতে সামরিক জাহাজগুলোর সমন্বয় নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, ‘স্পষ্ট করে বলি, এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো সংঘাত শেষ হলে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং চলাচলের স্বাধীনতা বজায় রাখা। আমাদের লক্ষ্য একটি সমন্বিত, স্বাধীন ও বহুজাতিক পরিকল্পনা।’

ফরাসি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, প্রায় ৩০টি দেশ — যার মধ্যে উপসাগরীয় দেশ, ভারত, গ্রিস, স্পেন, ইতালি, নেদারল্যান্ডস ও সুইডেন রয়েছে — এই মিশন পরিকল্পনায় অংশ নিতে পারে। এ নিয়ে প্যারিস বা লন্ডনে বৃহস্পতিবার বৈঠক হতে পারে।

সামরিক জাহাজগুলো নিরাপত্তা দেবে, তবে সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে না — এমনটাই জানিয়েছেন ওই সূত্র। তিনি বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে এ মিশনের বিষয়ে জানানো হবে, তবে তারা সরাসরি এতে অংশ নেবে না।

আরেক ইউরোপীয় কূটনৈতিক সূত্র প্রশ্ন তুলেছেন, ট্রাম্প যখন ইতোমধ্যে অবরোধের নির্দেশ দিয়েছেন, তখন তিনি আদৌ এমন কোনো মিশন চান কি না। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প এখন প্রণালিটিকে নিজের কৌশলগত চাপ হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাহলে তিনি কি সেখানে অন্য কোনো মিশন চান?’

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান সোমবার বলেন, কূটনীতির মাধ্যমেই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, এ নিয়ে আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠন করা জটিল হতে পারে। একই সঙ্গে জুলাইয়ে আঙ্কারায় অনুষ্ঠেয় সম্মেলনে ট্রাম্পের সঙ্গে ন্যাটোর সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।