রয়টার্সের এক্সক্লুসিভ

ইরানি জাহাজ থেকে উদ্ধার করা নাবিকদের ফেরত না দিতে শ্রীলঙ্কাকে চাপ দিচ্ছে আমেরিকা

এই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র যে ইরানি যুদ্ধজাহাজটি ডুবিয়েছে, তার জীবিত নাবিকদের কিংবা শ্রীলঙ্কার হেফাজতে থাকা আরেকটি ইরানি জাহাজের ক্রুদের এখনই ইরানে ফেরত না পাঠাতে শ্রীলঙ্কাকে চাপ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি অভ্যন্তরীণ কূটনৈতিক বার্তায় এ তথ্য জানা গেছে। সংবাদসংস্থা রয়টার্স এ নিয়ে ‘এক্সক্লুসিভ’ প্রতিবেদনে লিখেছে, কূটনৈতিক বার্তাটি তারা দেখেছে।

বুধবার ভারত মহাসাগরে শ্রীলঙ্কার দক্ষিণের বন্দরনগরী গলের উপকূল থেকে প্রায় ১৯ নটিক্যাল মাইল দূরে মার্কিন একটি সাবমেরিন ইরানের ফ্রিগেট ‘দেনা’কে ডুবিয়ে দেয়। এতে বহু নাবিক নিহত হন। ঘটনাটি ইরানের নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের অভিযানের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার শ্রীলঙ্কা দ্বিতীয় একটি ইরানি জাহাজকে আশ্রয় দেয়, জাহাজে থাকা ২০৮ নাবিককে জাহাজ থেকে নামতে সাহায্য করে। বুশেহর নামের জাহাজটি ইরানি নৌবাহিনীর একটি সহায়ক জাহাজ। এটি শ্রীলঙ্কার এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনে আটকে পড়েছিল, তবে শ্রীলঙ্কার সামুদ্রিক সীমার ভেতরে ছিল না।

শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট আনুরা কুমারা দিসানায়েকে বলেন, এই নাবিকদের আশ্রয় দেওয়া শ্রীলঙ্কার ‘মানবিক দায়িত্ব।’

দেনা নামের জাহাজের ৩২ জন জীবিত নাবিকের মধ্যে প্রায় ২০ জনকে গলে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার পর কোগগালায় শ্রীলঙ্কা বিমানবাহিনীর একটি ক্যাম্পে নেওয়া হয়েছে। গলের হাসপাতালটি ওই ক্যাম্প থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে। দুইজন সামরিক সূত্র এবং এক হাসপাতাল সূত্র রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দেনা ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে ‘নিঃশব্দ মৃত্যু’ বলে বর্ণনা করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র টর্পেডোর আঘাতে কোনো জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নিল।

তা ওই দুই জাহাজের নাবিকদের ইরানে শিগগিরই ফেরত না দিতে শ্রীলঙ্কাকে এখন চাপ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। রয়টার্স লিখেছে, শুক্রবারের তারিখে জারিকৃত ওই অভ্যন্তরীণ কূটনৈতিক বার্তাটি আগে কোথাও প্রকাশিত হয়নি। এতে বলা হয়েছে, কলম্বোয় মার্কিন দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত জেইন হাওয়েল শ্রীলঙ্কা সরকারকে জোর দিয়ে বলেছেন, বুশেহর জাহাজের ক্রু কিংবা দেনার ৩২ জন জীবিত নাবিক — কাউকেই যেন ইরানে ফেরত পাঠানো না হয়।

বার্তায় বলা হয়েছে, ‘শ্রীলঙ্কা কর্তৃপক্ষের উচিত ইরানের পক্ষ থেকে আটক নাবিকদের প্রচারমূলক কাজে ব্যবহারের যেকোনো চেষ্টা যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা।’

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র, নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলতে গিয়ে ইঙ্গিত দেন যে ওয়াশিংটন শ্রীলঙ্কার ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চাইছে না। তিনি বলেন, ‘এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শ্রীলঙ্কা যেভাবে ব্যবস্থা নেবে, তার সার্বভৌমত্বকে যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই সম্মান করে এবং স্বীকৃতি দেয়। আইআরআইএস বুশেহর ও এর ক্রুদের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থা এবং সমুদ্র থেকে উদ্ধার হওয়া ইরানি নাবিকদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শ্রীলঙ্কাই নেবে। এটি তাদের অভ্যন্তরীণ আইন ও আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতার ভিত্তিতেই হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা শ্রীলঙ্কার সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো — যুক্তরাষ্ট্র ও আমাদের অংশীদারদের জন্য ইরান যে হুমকি তৈরি করছে, তা কমিয়ে আনা।’

প্রেসিডেন্ট দিসানায়েকের কার্যালয় এবং শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

কূটনৈতিক বার্তায় আরও বলা হয়েছে, হাওয়েল ভারত ও শ্রীলঙ্কায় নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূতকে জানিয়েছেন, ক্রুদের ইরানে ফেরত পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা নেই। তখন ওই রাষ্ট্রদূত জানতে চান, নাবিকদের ‘পালিয়ে যেতে বা পক্ষত্যাগে উৎসাহিত করার’ মতো কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না।

নয়াদিল্লিতে ইসরায়েলি দূতাবাসের এক প্রতিনিধির কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি।

বুধবার শ্রীলঙ্কার উপস্বাস্থ্যমন্ত্রী ও গণমাধ্যমবিষয়ক উপমন্ত্রী হানসাকা উইজেমুনি রয়টার্সকে বলেন, দেনা জাহাজে নিহতদের মরদেহ দেশে ফেরাতে তেহরান কলম্বোর কাছে সহায়তা চেয়েছে। তবে কবে তা করা হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সময়সূচি ঠিক হয়নি।

গত মাসে বঙ্গোপসাগরে ভারতের আয়োজিত নৌ-মহড়ায় অংশ নিয়েছিল দেনা। মহড়া শেষে জাহাজটি ইরানে ফিরছিল। সেই সময় মার্কিন টর্পেডোর আঘাতে এটি ডুবে যায়।

মার্কিন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেন, আঘাত হানার সময় দেনা সশস্ত্র অবস্থায় ছিল। যুক্তরাষ্ট্র হামলার আগে কোনো সতর্কবার্তাও দেয়নি।

পররাষ্ট্র দপ্তরের ওই কূটনৈতিক বার্তায় বলা হয়েছে, দ্বিতীয় জাহাজ বুশেহর সংঘাত চলা পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার হেফাজতেই থাকবে।

শুক্রবার শ্রীলঙ্কা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা বুশেহর জাহাজটিকে পূর্ব উপকূলের একটি বন্দরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আর এর বেশির ভাগ ক্রুকে কলম্বোর কাছে একটি নৌঘাঁটির ক্যাম্পে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।