ফ্রান্সে পুলিশ-শিক্ষার্থী সংঘর্ষ, ৪০০ হাইস্কুল বন্ধ

ক্লাসরুমে আবাসন সংকট, শিক্ষক ঘাটতি এবং শিক্ষা বাজেটে ঘাটতির প্রতিবাদে ফ্রান্সে হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ক্রমশ তীব্র আকার ধারণ করেছে। রাজধানী প্যারিসসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দাঙ্গা পুলিশের দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, লাঠিচার্জ এবং ফ্ল্যাশ-বল বন্দুক ব্যবহার করছে বলে জানা গেছে।

আন্দোলনের কারণে শুক্রবার ফ্রান্সে প্রায় ৪০০টি হাইস্কুল- যেটা মোট হাইস্কুলের প্রায় ১০ শতাংশ- পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পূর্বঞ্চলীয় শহর স্ট্রাসবার্গে পুলিশের কাঁদানে গ্যাসে ধোঁয়াশাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে চারপাশ। দক্ষিণাঞ্চলীয় মার্সেই শহরে পুলিশ লাইন লক্ষ্য করে আতশবাজি ও পটকা ছোড়ে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে, পশ্চিমাঞ্চলের রেন শহরে রাস্তার ডাস্টবিনগুলোতে আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে বিক্ষোভকারীরা।

রাজধানী প্যারিসেও পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের তুমুল সংঘর্ষ হয়। সেখানে শিক্ষার্থীদের হাতে 'আমরা ভবিষ্যৎ গড়তে এসেছি, মুখ বুজে সহ্য করতে নয়' লেখা ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড দেখা যায়।

ফ্রান্সের আইনমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানিন রেডিও স্টেশন আরটিএল-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে পুলিশ এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার জনকে গ্রেপ্তার করেছে, যাদের বড় অংশই কিশোর বয়সী বা শিক্ষার্থী। তিনি আরও বলেন, যেসকল কিশোর সরকারি ও সামাজিক সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি করছে, তাদের পিতামাতাকেই এই ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা উচিত।

এদিকে শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার্দ গেফ্রে এক টিভি সাক্ষাৎকারে সন্তানদেরকে এই প্রাণঘাতী আন্দোলন থেকে দূরে রাখতে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, 'রাস্তায় আমাদের সন্তানরা চরম বিপদের মধ্যে রয়েছে।'

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, বহিরাগত ও চরমপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। 

বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে শিক্ষাখাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না করায় ক্লাসরুমগুলোতে গাদাগাদি করে বসতে হচ্ছে, নিয়মিত শিক্ষক পাওয়া যাচ্ছে না এবং স্কুল ভবনগুলো জীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে।

প্যারিসের শহরতলি পান্তার ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী কেসিয়া বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, 'আমাদের প্রতি ক্লাসে ৩৫ জন করে শিক্ষার্থী থাকে। সবার বসার জন্য পর্যাপ্ত চেয়ারও নেই। দুপুরের মাত্র এক ঘণ্টার লাঞ্চ বিরতিতে সবাই খাবার পায় না।' 

সম্প্রতি সরকার ২০২৭ সালের প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করেছে। সেখানে শিক্ষা বাজেট ১.৭% বৃদ্ধি পেয়ে ৬৫.৫৩ বিলিয়ন ইউরো প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বর্তমান মুদ্রাস্ফীতির হারের চেয়ে অনেক কম। ঐতিহ্যগতভাবে ফ্রান্সে জাতীয় বাজেটের সর্ববৃহৎ অংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের নিয়ম থাকলেও, ঋণের সুদের বোঝা বাড়ায় শিক্ষা খাত দ্বিতীয় স্থানে নেমে গেছে।

শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংস্থাটি সতর্ক করে লিখেছে, 'শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে হবে, লাঠি দিয়ে পেটানো যাবে না।' তীব্র সমালোচনার মুখে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুলিশি সহিংসতার ঘটনায় তিনটি আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের এই অসন্তোষের আঁচ এখন সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশ বেলজিয়ামেও পৌঁছাতে শুরু করেছে। বেলজিয়ামের লিয়েজ শহরের কিছু হাইস্কুল শিক্ষার্থী ফ্রান্সের আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে রাস্তায় নেমেছে এবং সেখানেও অনেক হাইস্কুল বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে প্রশাসন। 

উল্লেখ্য, ফ্রান্সের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের তীব্র এই অসন্তোষকে সরকারের জন্য বিশাল এক রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।