ভারতের কলকাতা শহরে আর জি কর মেডিকেল কলেজে কতর্ব্যরত অবস্থায় একজন তরুণী চিকিৎসককে খুন ও ধর্ষণের ঘটনায় সারা দেশের ডাক্তারসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিবাদ তুঙ্গে উঠেছে। ৩১ বছর বয়সী ওই তরুণীর দেহের ময়নাতদন্তে চরম যৌন হেনস্থার প্রমাণ মিলেছে এবং কর্তৃপক্ষ গোটা ঘটনাটি প্রথমে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল—এই ধরনের অভিযোগ ওঠার পর সমাজের সর্বস্তরের মানুষ কার্যত ফুঁসে উঠেছেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বৃহস্পতিবার রাতে টানা ৩৬ ঘণ্টার ‘অন-কল’ ডিউটিতে ছিলেন তরুণী চিকিৎসক। রাতে পালমোনোলজি বিভাগের সেমিনার হলে কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম নিতে যান তিনি। পরদিন সকালে জুনিয়র সহকর্মীরা ওই হলের ভেতরেই তার অর্ধনগ্ন মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন।
তরুণীর পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ তাঁদের প্রথমে জানিয়েছিল, তাঁদের মেয়ে ‘আত্মহত্যা’ করেছে। পরে অবশ্য তীব্র জনরোষ ও ক্ষোভের মুখে পুলিশ এই ঘটনায় ধর্ষণ ও হত্যার মামলা দায়ের করেছে।
হাসপাতালের সেমিনার হল থেকে ওই তরুণীর মরদেহ উদ্ধারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ মূল অভিযুক্ত সন্দেহে সঞ্জয় রায় নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। তিনি কলকাতা পুলিশের ‘সিভিক ভলান্টিয়ার’ বা সহযোগী কর্মী হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন।
‘সিভিক ভলান্টিয়ার’ হলো এমন একটি পদ, যা পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে রাজ্য সরকার চালু করেছে। এই পদধারীরা সরাসরি পুলিশ বা ট্র্যাফিক পুলিশের সদস্য না হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে তাদের সাহায্য করেন এবং বিনিময়ে রাজ্য সরকারের কাছ থেকে বেতন পান।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে বলা হচ্ছে, গ্রেপ্তার ওই ব্যক্তির বিকৃত যৌনাচারে লিপ্ত হওয়ার এবং নির্যাতন ও চাঁদাবাজিতে যুক্ত থাকার অতীত ইতিহাস রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, আর জি কর মেডিকেল কলেজে সেদিন রাতের সিসিটিভি ফুটেজ দেখেই অভিযুক্ত সঞ্জয় রায়কে চিহ্নিত করা হয়। ওই তরুণীর সঙ্গে যখন পাশবিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তার ঠিক আগে ওই ব্যক্তিকে হাসপাতালে ঢুকতে দেখা যায় এবং তার খানিকক্ষণ পরে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়।
নিহত ওই তরুণী চিকিৎসকের খুনি ও ধর্ষণকারীদের চরমতম শাস্তির দাবিতে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন হাসপাতালে তার সহকর্মী জুনিয়র ডাক্তাররা আন্দোলনে নেমেছেন গত শুক্রবার থেকেই। ইমার্জেন্সি পরিষেবা বাদ দিয়ে হাসপাতালের বাকি সব বিভাগেই ডাক্তাররা রোগী দেখা বন্ধ রেখেছেন। সর্বভারতীয় স্তরে চিকিৎসকদের সংগঠন আইএমএ-ও এই আন্দোলনে তাদের সংহতি জানিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা পরিষেবা এর ফলে কার্যত স্তব্ধ হয়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গের ডাক্তাররা এই ঘটনায় ‘ফাস্ট ট্র্যাক বিচারবিভাগীয় তদন্ত’ চেয়েছেন, নিহতের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি তুলেছেন এবং কলকাতা পুলিশকে তাদের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে বলেও দাবি জানাচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সরকার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বেশ চাপের মুখে আছে। তিনি এই ঘটনার তদন্তের জন্য কলকাতা পুলিশকে আগামী রোববার পর্যন্ত সময় দিচ্ছেন। এর মধ্যে তদন্ত সফল না হলে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই-এর হাতে তদন্তের ভার তুলে দিতে পারেন বলে জানা গেছে।
এদিকে এই পরিস্থিতির মধ্যে আর জি কর মেডিকেল কলেজেই হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে বহিরাগতদের বিরুদ্ধে। ওই সময় বেধড়ক মারধর করা হয় কর্মবিরতিতে অংশ নেওয়া চিকিৎসকদের।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, বুধবার গভীর রাতে আচমকাই জরুরি বিভাগে ঢুকে পড়ে একদল বহিরাগত। জরুরি বিভাগে ঢোকার আগে কর্মবিরতিতে অংশ নেওয়া জুনিয়রদের বেধড়ক মারধর করে। এমনকি পুলিশের দিকেও তেড়ে যায় বহিরাগতরা। তাঁদের সামনে কার্যত আত্মসমর্পণ করে পুলিশ। মাত্র আধ ঘণ্টার মধ্যে আর জি করের দখল নেয় বহিরাগতরা।
ঘটনাস্থল থেকে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ছবিতে দেখা যাচ্ছে, হামলাকারীদের অনেকের কাঁধ পর্যন্ত চুল। হাতে মোটা লোহার বালা। প্রত্যেকের হাতে মোটা লাঠি। প্রশ্ন উঠছে, কারা এই হামলাকারী? জুনিয়র চিকিৎসকদের দাবি, এরা সকলেই কুখ্যাত সন্ত্রাসী। তারাই তাণ্ডব চালাচ্ছে হাসপাতালে। পরিস্থিতি সামাল দিতে র্যাফ নামানোর সিদ্ধান্ত হলেও তা কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সন্ত্রাসীরা এই তাণ্ডব চালিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া একটি পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন।