ভারতে অজিত পাওয়ারের হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত

বাবা বলেছিলেন ‘কাল কাজ শেষে কল দিও’, মেয়ে আজ আর দুনিয়াতেই নেই

গলা ধরে আসছিল তাঁর, চোখ বাঁধ মানছিল না কোনোভাবেই। এমন করুণ পরিস্থিতিতে কোনো বাবার চোখই বাঁধ মানার কথা নয়। ভাঙা কণ্ঠে শিবকুমার মালী বলছিলেন, তাঁর মেয়ে বলেছিল —‘কাল কথা বলব। কিন্তু সেই ‘কাল’ আর কোনো দিন আসবে না।’

ভারতের বারামতিতে বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ছিলেন শিবকুমারের মেয়ে পিঙ্কি মালী। ওই দুর্ঘটনায় মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী ও রাজনৈতিক দল জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস পার্টির (এনসিপি) একটি অংশের নেতা অজিত পাওয়ার প্রাণ হারান। হেলিকপ্টারটির ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট ছিলেন পিঙ্কি।

শিবকুমার জানান, শেষবার ফোনে কথা বলার সময় পিঙ্কি তাঁকে বলেছিলেন, ‘পাপা, আমি কাল (বুধবার) উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ারের সঙ্গে বারামতিতে যাচ্ছি। ওনাকে নামিয়ে দিয়ে নান্দেদে যাব। হোটেলে পৌঁছে তোমাকে ফোন করব।’

মধ্য মুম্বাইয়ের প্রভাদেবী এলাকার বাসিন্দা শিবকুমার মালী মেয়ের সঙ্গে শেষ এই কথোপকথনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়েই বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন।

পিঙ্কি দিল্লিভিত্তিক ভিএসআর ভেঞ্চার্স পরিচালিত লিয়ারজেট ৪৬ বিমানের একজন ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট ছিলেন। বেসামরিক বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডিজিসিএ জানায়, ওই বিমানে ক্রু সদস্যসহ মোট পাঁচজন ছিলেন।

শিবকুমার বলেন, তাঁর মেয়ে এর আগে রাষ্ট্রপতি, মুখ্যমন্ত্রীসহ অনেক রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে ফ্লাইটে কাজ করেছেন। অজিত পাওয়ারের সঙ্গে এটি ছিল তাঁর চতুর্থ সফর। ‘গতকাল সন্ধ্যায় ওর সঙ্গে কথা হয়েছিল। আমি বলেছিলাম, ‘কাল তোমার কাজ শেষ হলে কল দিও।’ সেই কাল আর এল না’ – কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন শিবকুমার।

শিবকুমার মালী নিজেও এনসিপির একজন কর্মী। তিনি জানান, সমাধান সারভানকার নামের স্থানীয় এক রাজনীতিবিদ তাঁকে ফোন করে অজিত পাওয়ারের বিমান দুর্ঘটনার খবর দেন। ‘টেলিভিশন চালু করলাম। খবরটা দেখে আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম’ – বুক ভার করে দেওয়া মুহূর্তটার কথা বলছিলেন শিবকুমার।

শেষবার বাবা-মেয়ের দেখা হয়েছিল ১৬ জানুয়ারি। সেদিন পিঙ্কি থানে থেকে প্রভাদেবীতে গিয়েছিলেন পৌর নির্বাচনে ভোট দিতে। শিবকুমার জানান, মেয়ের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত কথা হতো।

পিঙ্কি গত পাঁচ বছর ধরে ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে কাজ করছিলেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি এয়ার ইন্ডিয়ায় ছিলেন। কয়েক বছর পর তিনি বেসরকারি চার্টার্ড বিমানে কাজ শুরু করেন।

শিবকুমার বলেন, ‘সম্প্রতি এক ফ্লাইটে পিঙ্কি অজিত পাওয়ারকে বলেছিল, তিনি পুরো মহারাষ্ট্র ঘুরছেন, কিন্তু এনসিপির কর্মীদের দিকে তেমন নজর দিচ্ছেন না। ওর কেন এমন মনে হচ্ছে, সেটা পাওয়ার জানতে চাইলে পিঙ্কি বলেছিল, তার বাবা ৩৫ বছর ধরে দলটার কর্মী।’

তিনি জানান, ওই কথোপকথনের পর উপমুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর থেকে তাঁকে ফোন করা হয়েছিল। ‘আমি তখন গাড়ি চালাচ্ছিলাম, ফোন ধরতে পারিনি। পরে একটি বার্তা পাই — পাওয়ার আমার সঙ্গে কথা বলতে চান। সেই কথাও আর হলো না’- বলেন শিবকুমার।

দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর শিবকুমার ও তাঁর পরিবার বারামতির উদ্দেশে রওনা হন।

এই দুর্ঘটনায় পিঙ্কি ও অজিত পাওয়ার ছাড়াও নিহত হয়েছেন ভিদিপ ইয়াদাভ, ক্যাপ্টেন সাম্ভবী পাঠক ও ক্যাপ্টেন সুমিত কাপুর।