বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ: কলকাতায় ঈদ যেমন কাটল মুসলিমদের

কলকাতায় কোরবানির ঈদ মানেই একসময় রেড রোডজুড়ে লাখো মানুষের নামাজ, উৎসবের আমেজ আর শহরের এক আলাদা চেহারা। কিন্তু সাম্প্রতিক নির্বাচনে জিতে বিজেপি প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় বসার পর এবারের ঈদ ছিল ভিন্ন। বদলে গেছে নামাজের স্থান, বেড়েছে বিধিনিষেধ, কড়া হয়েছে পুলিশি নজরদারি। রাজনৈতিক পালাবদলের পর কলকাতা ও আশপাশের এলাকায় ঈদের পরিবেশেও স্পষ্ট হয়েছে সেই পরিবর্তনের ছাপ।

চলতি বছর কলকাতার ঐতিহাসিক রেড রোডের বদলে কোরবানির ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে। পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর নেওয়া একাধিক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে এই পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করছেন অনেকে।

ঈদের সকাল। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে নামাজ শুরুর আগে ছায়ায় বসে পুরোনো দিনের কথা মনে করছিলেন কলকাতার বাসিন্দা মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে রেড রোডে নামাজ পড়তে আসতাম। ঈদের সকাল মানেই রেড রোড ছিল একটা অভ্যাসের মতো।’

তার মতো অনেকের কাছেই রেড রোডের ঈদ ছিল আবেগের জায়গা। তবে নতুন স্থানে নামাজের আয়োজন নিয়ে কেউ কেউ স্বস্তিও প্রকাশ করেছেন। নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ফারুক বলেন, ‘এখানে জায়গা বেশি। আগে রেড রোডে খুব সকালে এসে জায়গা ধরতে হতো। ট্রাফিক সমস্যাও ছিল।’

রাজ্যের নতুন সরকার সম্প্রতি ১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ আইন কঠোরভাবে কার্যকর করার কথা জানায়। ওই আইনে পশু জবাইয়ের জন্য বয়স ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সনদ, নির্ধারিত কসাইখানায় জবাই এবং প্রকাশ্যে পশু কোরবানি না করার মতো নানা বিধিনিষেধ রয়েছে। পাশাপাশি রাস্তা আটকে ধর্মীয় অনুষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্তও নেয় প্রশাসন।

এসব সিদ্ধান্ত ঘিরে ঈদের আগে থেকেই উদ্বেগ ছিল মুসলিম সম্প্রদায়ের একাংশের মধ্যে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এর প্রভাব পড়েছে পশুর বাজারেও। ভয়ে বা অনিশ্চয়তায় অনেকেই এবার গরু কেনাবেচা থেকে দূরে ছিলেন।

কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় ঈদের দিন মসজিদের বাইরে ছিল কড়া পুলিশি নজরদারি। নরেন্দ্রপুরের বাসিন্দা মহিউদ্দিন লস্কর বলেন, ‘এত পুলিশ আর আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য আগে কখনও দেখিনি। এলাকায় শান্তি ছিল, তারপরও এত নজরদারি কেন বুঝলাম না।’

ঈদের দিন উপস্থিত এক যুবক হুসেন আরও বললেন, ‘নিয়ম মেনে ঈদ মানাচ্ছি, নামাজ পড়ছি। আশা করি, অন্যান্য ধর্মের অনুষ্ঠানও যেন রাস্তা আটকে আর করা না হয়।’

পুরো আয়োজনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার চেষ্টা ছিল আয়োজকদের মধ্যে। আগে রেড রোডের জামাতে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়মিত দেখা যেত। তিনি সেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক বক্তব্যও রাখতেন। এবার ব্রিগেডের জামাতে কোনো রাজনৈতিক নেতার উপস্থিতি চোখে পড়েনি।

ক্যালকাটা খিলাফত কমিটির নেতা মোহাম্মদ খলিল বলেন, ‘রেড রোডে দীর্ঘদিন ধরে নামাজ হয়েছে। এবার নতুন জায়গা নিয়ে অনেকে দ্বিধায় ছিলেন। কেউ কেউ ভাবছিলেন সমস্যা হতে পারে। তাই উপস্থিতিও কিছুটা কম ছিল।’

অনেকেই আবার পরিবর্তনের ভেতর ইতিবাচক দিকও দেখছেন। দক্ষিণ ২৪ পরগণার খলিল আহমেদ বলেন, ‘এই প্রথম ঈদের নামাজের আয়োজনকে রাজনৈতিক কারণে ব্যবহার করা হয়নি। এটাও একটা পরিবর্তন।’

কিন্তু কলকাতার কিছু এলাকায় ঈদের আনন্দ ছাপিয়ে ছিল দুঃখের ছায়া। তপসিয়ার টালিখোলা এলাকায় সম্প্রতি আগুনে একটি চামড়ার কারখানার দুই কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। এরপর অবৈধ নির্মাণের অভিযোগে ভবন খালি করার নির্দেশ দেয় প্রশাসন। ফলে বহু পরিবার ঈদের আগেই ঘরছাড়া হয়।

সেই এলাকার ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জুনেইদ বলেন, ‘যারা এখানে থাকত, তারা এখন কোথায় আছে জানি না। অন্যান্য বছর ঈদের দিনে এই এলাকায় ভিড় হতো। এবার পরিবেশটাই আলাদা।’

ঈদের দিন সকালে মল্লিকবাজারে মোহাম্মদ হুসেন বললেন, ‘রাস্তা ফাঁকা, যানজট নেই। কিন্তু কিছু একটা যেন নেই। আগের মতো লাগছে না।’