তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে ইরানের শিয়া মিত্ররা ইতিমধ্যে যুক্ত হয়েছে। লেবানন ও ইরাকে থাকা ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলো এতে অংশ নিয়েছে। তবে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা এখনো সরাসরি এই সংঘাতে যোগ দেয়নি।
অথচ হুথিরা ভারি অস্ত্রে সজ্জিত। তারা উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালাতে সক্ষম। আরব উপদ্বীপ ঘিরে থাকা সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলেও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাতে পারে তারা।
কেন এখনো তারা যুদ্ধে যোগ দেয়নি — এ নিয়ে বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেছে সংবাদসংস্থা রয়টার্স।
হুথিরা কারা
হুথিরা ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলভিত্তিক একটি সামরিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলন, যার নেতৃত্ব দেয় হুথি পরিবার। শিয়া ইসলামের জায়দি ধারার অনুসারী তারা।
ইয়েমেনের সেনাবাহিনীর সঙ্গে গেরিলা যুদ্ধের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে হুথিদের। ২০১১ সালের ‘আরব বসন্ত’ আন্দোলনের পর তারা নিজেদের ক্ষমতা বাড়ায় এবং ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে। নিজ দেশের অস্থির পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ২০১৪ সালে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে।
এর পরের বছর, ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে কয়েকটি আরব দেশ একটি সামরিক জোট গঠন করে। এই জোট হুথিদের ক্ষমতা থেকে সরাতে ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে। হুথিরা তখন তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতার প্রমাণ দেয়। তারা সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালায়।
বহু বছরের যুদ্ধের ফলে ইয়েমেনে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়। পরে ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। সেই যুদ্ধবিরতি এখনো মোটামুটি টিকে আছে।
লোহিত সাগরে হামলা
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠন হামাস ইসরায়েলে হামলা চালায়। এর পর গাজায় ইসরায়েলের ভয়াবহ সামরিক অভিযান শুরু হয়। এর পরপরই হুথিরা লোহিত সাগরে হামলা চালিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে এই হামলা করা হচ্ছে বলে তখন জানায় তারা।
হুথিরা ইসরায়েলের দিকেও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এর জবাবে ইসরায়েল হুথি লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্রও হুথিদের বিরুদ্ধে হামলা চালায়।
২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়। এরপর হুথিরা তাদের হামলা বন্ধ করে।
কেন তারা এখনো ইরান যুদ্ধে যোগ দেয়নি
৫ মার্চ হুথি নেতা আবদুল মালিক আল-হুথি বলেন, তাঁর সংগঠন যেকোনো সময় হামলা চালানোর জন্য প্রস্তুত। একটি টেলিভিশন ভাষণে তিনি বলেন, ‘সামরিক উত্তেজনা ও পদক্ষেপের বিষয়ে বলছি — পরিস্থিতি যদি তা দাবি করে, তাহলে যেকোনো মুহূর্তে হামলা চালাতে আমরা প্রস্তুত।’
তবে লেবাননের হিজবুল্লাহ বা ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মতো হুথিরা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেয়নি।
হিজবুল্লাহ বা ইরাকের কিছু গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ধর্মীয় মতবাদের দিক থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রতি যেরকম আনুগত্য দেখা যায়, হুথিদের ধর্মীয় মতবাদ একইরকম আনুগত্যের কথা বলে না।
ইরান হুথিদের আঞ্চলিক ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর অংশ হিসেবে তুলে ধরে। তবে ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলেন, হুথিদের প্রধান লক্ষ্য আসলে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। যদিও রাজনৈতিকভাবে তারা ইরান ও হিজবুল্লাহর প্রতি সহানুভূতিশীল।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরান হুথিদের অস্ত্র দিয়েছে, অর্থায়ন করেছে এবং প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এতে হিজবুল্লাহও সহায়তা করেছে। হুথিরা অবশ্য নিজেদের ইরানের প্রতিনিধি বলে মানতে রাজি নয়। তারা বলে, নিজেদের অস্ত্র তারা নিজেরাই তৈরি করে।
তারা এখন কী করতে পারে
হুথিরা পরবর্তী সময়ে কী পদক্ষেপ নেবে, তা নিয়ে পর্যবেক্ষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কারণ এই গোষ্ঠীটি অননুমেয় আচরণের জন্য পরিচিত বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক।
কিছু কূটনীতিক ও বিশ্লেষক মনে করেন, হুথিরা হয়তো ইতিমধ্যেই প্রতিবেশী দেশের কিছু লক্ষ্যবস্তুতে আলাদা করে হামলা চালিয়েছে। তবে রয়টার্স এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি।
অন্যরা মনে করেন, হুথিরা উপযুক্ত সময়ের জন্য অপেক্ষা করছে। ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করে এমন সময়ে তারা সংঘাতে প্রবেশ করবে, যখন তাদের পদক্ষেপ সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করতে পারবে।
হরমুজ প্রণালী যদি কার্যত বন্ধ হয়ে যায় এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়, তখন লোহিত সাগরের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে। পরিস্থিতি সেদিকে গেলে সেটি হুথিদের জন্য বড় চাপ তৈরি করার একটা সুযোগ হয়ে দাঁড়াবে।
আরও একটি সম্ভাবনার কথাও বলছেন অনেক বিশ্লেষক। ইয়েমেনের ভেতরেই অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে। এর পাশাপাশি হুথিরা যদি ইরানে চলমান যুদ্ধে যোগ দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এমনকি সৌদি আরবেরও কঠোর হামলার মুখে পড়তে পারে।
এই কারণে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, হুথিরা শেষ পর্যন্ত এই সংঘাতের বাইরে থাকার সিদ্ধান্তও নিতে পারে।