টানা ৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে চলছে যুদ্ধবিরতি। অঞ্চলটিতে সাম্প্রতিক এই যুদ্ধে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে নির্ভুলভাবে হামলা চালাতে ইরান চীনের একটি গোপন গোয়েন্দা উপগ্রহ (স্পাই স্যাটেলাইট) ব্যবহার করেছে বলে বুধবার এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমস।
ফাঁস হওয়া ইরানি সামরিক নথির বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের শেষের দিকে ইরান অত্যন্ত গোপনে 'টিইই-০১বি' নামের একটি স্যাটেলাইট সংগ্রহ করে। এটি তৈরি ও উৎক্ষেপণ করেছিল চীনের 'আর্থ আই কোং' নামক একটি কোম্পানি। পরবর্তীতে এটি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অ্যারোস্পেস ফোর্সের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, তারা সময় অনুযায়ী সমন্বিত তালিকা (কোঅর্ডিনেট লিস্টস), স্যাটেলাইট ইমেজ এবং কক্ষপথ বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হয়েছে যে, ইরানের সামরিক বাহিনী মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর নজরদারিতে এই স্পাই স্যাটেলাইটটি ব্যবহার করেছে। মার্চ মাসে বিভিন্ন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে ও পরে এই স্যাটেলাইট দিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর ছবি তোলা হয়েছিল।
এই চুক্তির অংশ হিসেবে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) বেইজিং-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান 'এম্পোস্যাট'-এর বাণিজ্যিক গ্রাউন্ড স্টেশনগুলো ব্যবহারের সুযোগ পায়। এম্পোস্যাট-এর নেটওয়ার্ক এশিয়া ও লাতিন আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত বলে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, ৪০ দিনের এই লড়াইয়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা রুখতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে দেখা গেছে ইরানের সামরিক বাহিনীকে। হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানিবাহী জাহাজের চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার পাশাপাশি ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে এবং মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইরান।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মার্চের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান এয়ার বেসের ছবি তুলেছিল এই স্যাটেলাইট। এর ঠিক পরেই ১৪ মার্চ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিশ্চিত করেন যে, ওই ঘাঁটিতে থাকা মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো হামলার শিকার হয়েছে। এ ছাড়া জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমান ঘাঁটি, বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর এবং ইরাকের এরবিল বিমানবন্দরের আশপাশের এলাকাগুলোতেও এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নজরদারি চালানো হয়েছিল।
এই প্রতিবেদনের বিষয়ে কথা বলতে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে হোয়াইট হাউস, সিআইএ, পেন্টাগন কিংবা চীনের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাস ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে জানিয়েছে, তারা চীনের বিরুদ্ধে এ ধরনের 'অনুমাননির্ভর এবং ইঙ্গিতপূর্ণ অপপ্রচার' ছড়ানোর তীব্র বিরোধিতা করে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এক হুশিয়ারিতে বলেছেন যে, চীন যদি ইরানকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা এ জাতীয় সামরিক সহায়তা দেয়, তবে তাদের 'বড় ধরনের সমস্যায়' পড়তে হবে।
আগামী মাসে ট্রাম্পের চীন সফরকে সামনে রেখে ইরানের চীনা স্যাটেলাইট ব্যবহারের খবরটি চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে বেইজিং ও তেহরানের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সামরিক সহযোগিতা মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।