২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতি এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকটে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলো যখন দিশেহারা, তখন এই অস্থিরতার সুযোগে পাঁচটি শিল্পখাত অভাবনীয় মুনাফা অর্জন করছে।
অর্থাৎ, ইরান যুদ্ধ বাকীদের জন্য সর্বনাশ হলেও এই পাঁচ সেক্টরের জন্য পৌষমাস হয়েই এসেছে। চলুন দেখে নেওয়া যাক, ইরান যুদ্ধে লাভের গুড় খাচ্ছে কোন ৫টি সেক্টর:
ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগ ব্যাংক
শেয়ার বাজারের অস্থিরতা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য আতঙ্কের হলেও বিনিয়োগকারী ব্যাংকগুলোর জন্য এটি আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের খামখেয়ালিপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে।
প্রায়শই দেখা যায়, ট্রাম্প আগের দিন যে সিদ্ধান্ত নেন, তা পরদিনই আমূল বদলে ফেলেন। বিষয়টিকে বিনিয়োগকারীরা 'টাকো (টিএসিও) ট্রেড' (ট্রাম্প অলওয়েজ চিকেনস আউট) বলে অভিহিত করছেন। এর অর্থ হচ্ছে, ট্রাম্প সিদ্ধান্তে স্থির থাকেন না। অর্থাৎ, তিনি শেষ মুহূর্তে ভয়ে পিছিয়ে যান, বা আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। এর ফলে বাজারে ঘন ঘন শেয়ার কেনাবেচা হয়। আর শেয়ারের হাতবদল বাড়ার কারণে বিনিয়োগ ব্যাংকগুলোর কমিশন বাড়ছে।
এই যেমন, বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি থেকে মার্চ) মর্গান স্ট্যানলির মুনাফা বেড়েছে ২৯ শতাংশ। অন্যদিকে এসময়, গোল্ডম্যান স্যাকস ও জেপি মর্গান চেজের মুনাফা যথাক্রমে ১৯ শতাংশ ও ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রেডিকশন মার্কেট বা বাজির বাজার
যুদ্ধের ফলাফল এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর বাজি ধরার প্রবণতা ব্যাপক হারে বেড়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ক্রিপ্টো-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম পলি-মার্কেট প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ডলার আয় করছে।
এপ্রিলের প্রথম দুই সপ্তাহেই তারা ২ কোটি ১০ লাখ ডলার ফি সংগ্রহ করেছে। তবে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, এসব প্ল্যাটফর্মের মোট লাভের ৮৪ শতাংশই মাত্র ১ শতাংশ বড় বিনিয়োগকারীর পকেটে যাচ্ছে।
প্রতিরক্ষা ও অস্ত্র শিল্প
ইউক্রেন, গাজা, লেবানন এবং ইরানের যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে সামরিক ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো ২০৩৫ সালের মধ্যে তাদের জিডিপি'র ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ফলে ড্রোন ও মিসাইল নির্মাতাদের শেয়ারের দাম হু হু করে বাড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে, 'এমএসসিআই ওয়ার্ল্ড অ্যারোস্পেস অ্যান্ড ডিফেন্স ইনডেক্সের মুনাফা গত এক বছরে ৩২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও চিপ শিল্প
যুদ্ধ বা অর্থনৈতিক মন্দা—কোনো কিছুই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জয়যাত্রাকে থামাতে পারছে না। বিশেষ করে তাইওয়ানের চিপ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো রেকর্ড পরিমাণ ব্যবসা করছে। টিএসএমসি ২০২৬ প্রথম তিন মাসে ১৮ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার নিট মুনাফা অর্জন করেছে, যা গত বছরের তুলনায় ৫৮ শতাংশ বেশি।
এআই প্রযুক্তির চাহিদা বাড়ায় 'অ্যানথ্রোপিক' এবং 'ওপেন এআই' এ বছরই পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হওয়ার পরিকল্পনা করছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি (গ্রিন এনার্জি)
ইরান যুদ্ধের ফলে জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এশিয়ার দেশগুলো (যেমন: দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, থাইল্যান্ড) তেলের বিকল্প খুঁজতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
ফলে সোলার প্যানেল, বায়ু বিদ্যুৎ (উইন্ড এনার্জি) এবং পারমাণবিক শক্তির দিকে ঝুঁকছে দেশগুলো। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল ক্লিন এনার্জি ইনডেক্সে গত এক বছরে প্রবৃদ্ধির হার ৭০ দশমিক ৯২ শতাংশ।
এদিকে, আইএমএফ সতর্ক করে বলেছে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২.৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এতে সাধারণ মানুষ ও নিম্ন আয়ের দেশগুলো চরম সংকটে পড়লেও, বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং যুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি খাতগুলোর পকেট ভারি হওয়া অব্যাহত থাকবে।