মধ্যপ্রাচ্যে চলছে যুদ্ধ আর ক্ষমতার লড়াই। এর মাঝেই এক রহস্যময় নীরবতার রেশ পাওয়া যাচ্ছে। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মোজতবা খামেনি এখন আলোচনার কেন্দ্রে। অথচ যুদ্ধ শুরুর পর এখনও পর্যন্ত কোনো অডিও বা ভিডিও বার্তায় তাঁর উপস্থিতি টের পাওয়া যায়নি।
এই প্রেক্ষাপটে তাই প্রশ্ন উঠছে— তিনি আসলে কোথায় আছে? ইরানে, না-কি ইরানের বাইরে? আর তিনি যদি সামনে না-ই থাকেন, তাহলে ইরানের হয়ে হরমুজ প্রণালি খোলা বা বন্ধ রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো কে বা কারা নিচ্ছে?
পিতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যার পর ক্ষমতায় আসেন মোজতবা খামেনি। কিন্তু ছয় সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও— তিনি প্রকাশ্যে আসেননি একবারও। না কোনো ভাষণ, না কোনো সরাসরি বার্তা। তার বদলে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তার নামে বিবৃতি পড়া হচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় তার বক্তব্য পোস্ট করা হচ্ছে। এমনকি এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও ব্যবহার করে তার ‘উপস্থিতি’ দেখানোর চেষ্টাও করা হয়েছে।
এ যেন এক অদ্ভুত বাস্তবতা। নেতা আছেন বটে, কিন্তু আবার নেই! তবে এই অনুপস্থিতি কি দুর্বলতা? না-কি এটি এক ধরনের কৌশলগত অবস্থান? বিশ্লেষকরা বলছেন, এটা নিছকই কোনো অনুপস্থিতি নয়, বরং একটি ‘কৌশলগত নিরবতা’ (স্ট্র্যাটেজিক সাইলেন্স)।
খবর অনুযায়ী, ইরানের ওপর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার একেবারে শুরুর দিকেই এক হামলায় আহত হয়েছেন মোজতবা খামেনি। তাঁর পায়ের হাড় ভেঙেছে, চোখে আঘাত লেগেছে— এমনকি মুখেও রয়েছে ক্ষতের চিহ্ন। যদিও সরকারিভাবে তা নিশ্চিত করা হয়নি।
তবে এর মধ্যেও তিনি পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় নন। বরং অডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তার অনুমোদনও থাকছে। অর্থাৎ, তিনি ‘অদৃশ্য’— কিন্তু ‘অপ্রাসঙ্গিক’ নন।
এই অবস্থায় দৃশ্যপটে সামনে চলে এসেছে ইরানের অন্য কিছু মুখ— বিশেষ করে মোহাম্মদ বাঘের কাইবাফ। তিনি শুধু পার্লামেন্টের স্পিকারই নন, বরং কূটনীতি ও সামরিক—দুই দিকেই এখন গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে উঠেছেন। ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রথম দফার শান্তি আলোচনায় ইরানি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বও দিয়েছেন তিনি। তার সঙ্গে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
তবে বাস্তবতা বলছে ইরানের ভেতরে এখন দ্বৈত চাপ— একদিকে আন্তর্জাতিক চাপ, অন্যদিকে নিজ দেশের কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর চাপ। এই কট্টরপন্থীরা কোনো ধরনের আপস মেনে নিতে রাজি নয়। তাদের মতে—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা মানেই আত্মসমর্পণ। এই পরিস্থিতিতে মোজতবার অনুপস্থিতি একটি ‘ঢাল’ হিসেবে কাজ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার এখন তাঁর নাম ব্যবহার করছে বড় বড় সিদ্ধান্তগুলোর জন্য। এতে করে কোনো সিদ্ধান্ত যদি বিতর্কিত হয়— দায়টা ‘সর্বোচ্চ নেতার অনুমোদন’ হিসেবে দেখানো যায়। ফলে, আলোচনায় থাকা নেতারা নিজেদের রক্ষা করতে পারছেন সমালোচনা থেকে।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— আসলেই কি সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন সর্বোচ্চ নেতা। নাকি তার নাম ব্যবহার করে অন্য কেউ চালাচ্ছে পুরো শাসন ব্যবস্থা? এই প্রশ্নের উত্তর এখনও পরিষ্কার নয়। কারণ ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো বরাবরই অনেকটা ‘অস্বচ্ছ’। এখানে ক্ষমতা শুধু একজনের হাতে সীমাবদ্ধ নয়— বরং সামরিক, ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক শক্তির এক জটিল ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে। এই মুহূর্তে সেই ভারসাম্য আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
একদিকে যুদ্ধের হুমকি, অন্যদিকে দুই দেশের কূটনীতি। তার ওপর হরমুজ প্রণালী নিয়ে কৌশলগত চাপতো আছেই। এই সবকিছুর মাঝেই, মোজতবা খামেনি যেন এক ‘নীরব পরিচালক’, যিনি সামনে না এসেও প্রভাব ফেলছেন পুরো খেলায়।
তাহলে কি এই কৌশল কাজ করছে? একভাবে দেখলে—হ্যাঁ। কারণ, অভ্যন্তরীণ সমালোচনা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে। আর আন্তর্জাতিকভাবে ইরান এখনো একটি ‘একক অবস্থান’ বজায় রাখতে পারছে। কিন্তু ঝুঁকিও কম নয়। যতদিন তিনি সামনে আসবেন না, ততদিন প্রশ্ন, সন্দেহ আর জল্পনা বাড়তেই থাকবে। আর যদি কোনো বড় সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত হয়, তাহলে দায় কার? এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।
সবশেষে বলা যায়, মোজতবা খামেনির এই ‘অদৃশ্য নেতৃত্ব’ একদিকে যেমন কৌশল, অন্যদিকে তেমনি ঝুঁকিপূর্ণ এক পরীক্ষা। কারণ ইতিহাস বলে, যুদ্ধের সময় নেতৃত্ব যত স্পষ্ট থাকে, সিদ্ধান্ত তত শক্তিশালী হয়। আর এখানে, নেতা আছেন, কিন্তু দৃশ্যমান নন। তাই প্রশ্নটা থেকেই যায়, এই নীরবতা কি ইরানকে রক্ষা করবে, নাকি ঠেলে দেবে আরও বড় কোনো সংকটের দিকে?