ইয়েমেনে হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি। একসময় বিচ্ছিন্নতাবাদী ধর্মীয় ও সামরিক গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত হলেও তিন দশকেই সুসংগঠিত ও শক্তিশালী সামরিক বাহিনীতে পরিণত হয়েছে হুতিরা। ইয়েমেনের গণ্ডি পেরিয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলেও প্রভাব ফেলছে তারা।
নব্বইয়ের দশকে উত্তর ইয়েমেনে জায়েদি শিয়া মুসলিমদের পুনর্জাগরণ আন্দোলন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে হুতিরা। পরে ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে ছয় দফায় যুদ্ধে জড়িয়ে নিজেদের সামরিক শক্তির জানান দেয় তারা।
২০১১ সালের আরব বসন্তের ঢেউয়ে ইয়েমেনের কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে সুযোগ নেয় হুতিরা। বাড়াতে থাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা। একই সঙ্গে ইরান ও হিজবুল্লাহর সঙ্গেও জোরদার করে সম্পর্ক।
২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখল করে কেন্দ্রীয় সরকারকে উৎখাত করে হুতিরা। এরপর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিতে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট। শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক বারা শিবান বলেন, ‘হুতিদের অগ্রগতিতে শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে হিজবুল্লাহ। তাদের সহায়তা না থাকলে হুতিরা হয়তো পাহাড়ি এলাকায় সীমিত পরিসরে থাকা ছোট মিলিশিয়াই হয়ে থাকত। তাদের সংগঠন, নেতৃত্বব্যবস্থা ও সামরিক সক্ষমতা গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে হিজবুল্লাহ।’
দীর্ঘ সংঘাতে ইয়েমেন সরকারের পক্ষে অবস্থান নেয় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার। তবে ২০১৭ সালে কাতার সরে যাওয়ার পর সৌদি ও আমিরাত-সমর্থিত পক্ষগুলোর মধ্যেও দেখা দেয় বিরোধ।
বারা শিবান বলেন, ‘কাগজে-কলমে জোটের লক্ষ্য ছিল ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন করা। কিন্তু বাস্তবে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ তৈরি হয়। আমিরাত সমর্থন করে দক্ষিণের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের, আর সৌদি সমর্থন করে ইয়েমেন সরকারকে। ফলে এক সংঘাতের মধ্যেই আরেকটি সংঘাত তৈরি হয়, যার সুবিধা পায় হুতিরাই।’
২০২২ সালের যুদ্ধবিরতিতে সংঘাতের তীব্রতা কিছুটা কমলেও সম্প্রতি আবারও বিভিন্ন এলাকায় লড়াই শুরু হয়েছে। বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে হুতিরা।
বারা শিবান আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে হুতিরা আলোচনায় আগ্রহী নয়। তারা মনে করছে, তাদের সামরিক সক্ষমতা যথেষ্ট এবং তারা আরও ভূখণ্ড দখল করতে পারবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগও এখন তাদের দিকে।’
বর্তমানে হুতিদের অন্যতম প্রধান সামরিক সক্ষমতা হলো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন। ইসরায়েল, সৌদি আরব ও লোহিত সাগরে চলাচলকারী অন্যান্য জাহাজেও হামলা চালিয়েছে তারা। ফলে ইয়েমেনের সংঘাতের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে।