সেকশন

বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
Independent Television
ad
ad
 

পুরস্কার প্রাপ্তি, প্রত্যাখান ও ফেরত: কে কীভাবে দেখছেন

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৬:২২ পিএম

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৩ ঘোষণার চার দিনের মাথায় নিজের পুরস্কারটি ফিরিয়ে দিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছেন কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদার। গত ২৪ জানুয়ারি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৩ এর ঘোষণা আসে। অমর একুশে বইমেলা-২০২৪ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ীদের হাতে এ পুরস্কার তুলে দেবেন।

এবার ১১টি বিভাগে মোট ১৬ গুণী ব্যক্তি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাচ্ছেন। তাঁরা হলেন—কবিতায় শামীম আজাদ; কথাসাহিত্যে নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর ও সালমা বাণী; প্রবন্ধ/গবেষোয় জুলফিকার মতিন; অনুবাদে সালেহা চৌধুরী; নাটক ও নাট্যসাহিত্যে (যাত্রা/পালা নাটক/সাহিত্যনির্ভর আর্টফিল বা নান্দনিক চলচ্চিত্র) মৃত্তিকা চাকমা ও মাসুদ পথিক; শিশুসাহিত্যে তপংকর চক্রবর্তী; মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় আফরোজা পারভীন ও আসাদুজ্জামান আসাদ; বঙ্গবন্ধুবিষয়ক গবেষণায় সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল ও মো. মজিবুর রহমান; বিজ্ঞান/কল্পবিজ্ঞান/পরিবেশ বিজ্ঞানে ইনাম আল হক; আত্মজীবনী/স্মৃতিকথা/ভ্রমণকাহিনি/ মুক্তগদ্য ইসহাক খান; ফোকলোরে (লোকসাহিত্যে) তপন বাগচী ও সুমনকুমার দাশ।

পুরস্কারের ঘোষণার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরস্কারপ্রাপ্তদের অভিনন্দন জানান অনেকে। বিপরীতে এই পুরস্কার দেওয়ার প্রক্রিয়া এবং সাহিত্যে পুরস্কারপ্রাপ্তদের অবদান নিয়ে সমালোচনাও করেছেন কেউ কেউ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে জাকির তালুকদারের দিক থেকে। ২০১৪ সালে কথাসাহিত্যে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পাওয়া এ লেখক পুরস্কারের ক্রেস্ট এবং এর আর্থিক সম্মানির চেক গত ২৮ জানুয়ারি ডাকযোগে বাংলা একাডেমিতে ফেরত পাঠান। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখক নিজেই জানান এবং পরদিন এ বিষয়ে দীর্ঘ সংযুক্তি দেন। প্রথমদিনেই বিষয়টি ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যায়। উঠে আসে জাতীয় গণমাধ্যমের শিরোনামে। লেখকের ভাষ্য, ‘গণতন্ত্রহীনতা, আমলাতান্ত্রিকতা, প্রতিষ্ঠানের মানের নিম্নগামিতা এবং আড়াই দশক ধরে নির্বাচন না দিয়ে নিজেদের পছন্দমতো লোক দিয়ে একাডেমি পরিচালনায় নির্বাহী পরিষদ গঠন করা হয়। তাই বাংলা একাডেমির সাহিত্য পুরস্কার ফেরত দিয়ে ভারমুক্ত হয়েছেন তিনি।’

নিজস্ব গদ্য ভাষা ও বিষয় দিয়ে নজরে আসা জাকির তালুকদারের বেড়া ওঠা নাটোরে। পেশায় চিকিৎসক এই লেখকের আলোচিত উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘কুরসিনামা’, ‘বহিরাগত’, ‘মুসলমানমঙ্গল’, ‘পিতৃগণ’, ‘হাঁটতে থাকা মানুষের গান’, ‘১৯৯২’,‘কবি ও কামিনী’, ‘মৃত্যুগন্ধী’।

জাকির তালুকদার ২০১৪ সালে কথাসাহিত্যে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান, যা তিনি সম্প্রতি ফেরত দিয়েছেন। ছবি: সংগৃহীত

পুরস্কার ফেরত দিয়ে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালককে (ডিজি) লেখা চিঠির সাথে ফেসবুকে একটি সংযুক্তি পোস্ট করেন জাকির তালুকতদার। এতে তিনি বলেছেন, ‘বাংলা একাডেমির সমস্যা এবং কার্যক্রম নিয়ে ১০ বছরে তিনজন মহাপরিচালকের সাথে কথা বলেছি। কখনো একা, কখনো আরও কয়েকজন লেখক-কবির উপস্থিতিতে। তাঁদের দুজন প্রয়াত। একজন বর্তমানের ডিজি। তাঁরা কেউ সমস্যাগুলিকে অযৌক্তিক বলেননি। কিন্তু প্রতিকারের চেষ্টা করেছেন বলে মনে হয়নি।’

২৫ বছর ধরে বাংলা একাডেমির নির্বাচন হয় না বলে জাকির তালুকদার সংযুক্তিতে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘কার্যনির্বাহী পরিষদের নির্বাচন খুব দরকার। গণতন্ত্রের জন্য। কিন্তু ২৫ বছর ধরে নির্বাচন দেওয়া হয় না। নির্বাচিত সদস্যের পক্ষে সম্ভব কার্যনির্বাহী পরিষদের সভায় জোরালো ভূমিকা রাখা। কিন্তু সেই সুযোগ বন্ধ করে রেখেছে বাংলা একাডেমি।’

প্রকাশনার ক্ষেত্রে অনামি মেধাবীদের পাণ্ডুলিপি ফেলে রাখা হয় বলেও অভিযোগ করেন জাকির। তাঁর অভিযোগ—বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রদান কমিটির সদস্য মনোনীত করা হয় কোন প্রক্রিয়ায়, তা কেউ জানে না। তবে তাঁরা দেশের সাহিত্যজগতের বরেণ্য মানুষ, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু দেশের প্রতিনিধিত্বশীল হয়ে ওঠা লেখকদের সবার লেখা সম্পর্কে ধারণা থাকে না অনেকেরই। গত কয়েক বছর ধরে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারের একটি প্যাটার্ন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেমন কয়জন আমলা, একাডেমির অন্তত একজন কর্মকর্তা ও মহাপরিচালকের ঘনিষ্ঠ কেউ কেউ পাবেন পুরস্কার। একাডেমি এ নিয়ে কোনো সমালোচনায় কান দেয় না। অনেক সময় কোনো কবি বা লেখকের কাজের ক্ষেত্র বাদ দিয়ে তাঁকে অন্য ক্যাটাগরিতে পুরস্কার দেওয়া হয়।

পুরস্কার ফেরত দিয়ে জাকির তালুকদারের এই প্রতিবাদকে সাধুবাদ জানিয়েছেন কবি-সাহিত্যিকদের অনেকে। তাঁর ‘বিলম্ব বোধোদয়ের’ সমালোচনাকারীর সংখ্যাও কম নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা বিষয়টি নয়ে কার্যত দ্বিধা–বিভক্ত। সর্বশেষ ঘোষিত ও অতীতে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি–সাহিত্যিক–গবেষক–নাট্যকাররা বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন তা জানার চেষ্টা করেছে ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটাল। তাঁরা জাকির তালুকদারের প্রতিবাদকে ইতিবাচকভাবেই নিয়েছেন। বলেছেন প্রতিবাদের মূল বক্তব্যের সাথে তাঁরা সম্পূর্ণ একমত। বাংলা একাডেমির কার্যকরী পরিষদ নির্বাচনে ‘গণতন্ত্রের খামতি’ স্বীকার করেছেন খোদ প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক।

পুরস্কার প্রত্যাখ্যান ও ফেরত নিয়ে প্রতিক্রিয়া
সাম্প্রতিক পুরস্কার ফেরত দেওয়া নিয়ে ২০১৯ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত এক সাহিত্যিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আগে বাংলা একাডেমির সদস্যরা ভোট দিয়ে কার্যনিবাহী সদস্য নির্বাচিত করত, গত ২০ থেকে ২৫ বছর যাবত সেই চর্চাটা নেই। জাকির তালুকদার বাংলা একাডেমির কার্যনির্বাহী পরিষদ গঠনে গণতন্ত্রহীনতার যে অভিযোগ তুলেছেন, তার সাথে আমি একমত। এটা আমাদের অনেকেরই বক্তব্য।’

তবে ১০ বছর পর পুরস্কার ফেরত দেওয়াকে অগ্রহণযোগ্য উল্লেখ করে একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত এই সাহিত্যিক বলেন, ‘১০ বছর আগে পরিস্থিতি এ রকমই ছিল। এ রকম অগণতান্ত্রিক কমিটির কাছ থেকেই তিনি পুরস্কারটি নিয়েছিলেন। পরের ১০ বছর তিনি এর সুবিধা ভোগ করেছেন। সব জায়গায় তাঁকে বলা হয়েছে বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক। এখন এসে তাঁর কেন চেতনা হলো যে–এটার ভার বইতে পারছেন না!’

জাকির তালুকদারের ‘গণতন্ত্রহীনতার’ অভিযোগের বিষয়ে একমত প্রকাশ করেছেন ২০২৩ সালের (সম্প্রতি ঘোষিত) বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত আরেক সাহিত্যিক। তবে তিনিও নাম প্রকাশ করতে চান না। তাঁর ভাষ্য, ‘এবার যেহেতু আমি পুরস্কার পেয়েছি, এর পক্ষে বা বিপক্ষে বলাটা শোভনীয় হবে না। ব্যাপরটা বিয়ের আসরে বরের মাতব্বরীর মতো হয়ে যাবে।’

কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল এবার বঙ্গবন্ধু গবেষণায় বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। ছবি: সংগৃহীত

এবার বঙ্গবন্ধু গবেষণায় বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন কবি সাইফুল্লাহ মাহমদু দুলাল। কানাডা প্রাবাসী এই কবিকে কবিতায় পুরস্কার না দেওয়ায় অনেকে অবাক হয়েছেন, যা জাকির তালুকদারের অভিযোগকেই মান্যতা দেয়। তবে এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাবই দেখিয়েছেন কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল। তিনি নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে এক পোস্টে বলেন, ‘কাব্যচর্চার বাইরে লেখালেখির অন্যান্য শাখায় আমার যে দখল ও দক্ষতা আছে-এই পুরস্কার সেই বাড়তি স্বীকৃতি এবং সম্মান বহন করে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা আমার বইগুলো অন্যদের বই থেকেই সম্পূর্ণ আলাদা, তথ্যবহুল ও শ্রমলব্ধ।’

দুলাল আরও লিখেছেন, ‘আমার লেখালেখির মূল বিষয় কবিতা। বঙ্গবন্ধুর ওপর আমার গবেষণা দায়িত্ববোধ থেকে। কবিতার চেয়ে এ বিভাগে পুরষ্কৃত হওয়া আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। কারণ, এ স্বীকৃতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামের সাথে যুক্ত। তাই বাংলা একাডেমির মনোনয়নে আমি আনন্দিত এবং গৌরববোধ করছি।’

২০০৬ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন। তিনি জাকির তালুকদারের পুরস্কার ফিরিয়ে দেওয়া প্রসঙ্গে বলেন, ‘জাকির তালুকদারের বক্তব্যটা আমি পড়েছি। তাঁর বক্তব্যের মধ্যে যুক্তি আছে। বাংলা একাডেমির গত কয়েক বছর ধরে যে পুরস্কারগুলো দেওয়া হচ্ছে; এমনকি একুশে এবং স্বাধীনতা পদকের মধ্যেও আমরা লক্ষ্য করি অযোগ্যরা স্থান দখল করে আছে। কিন্তু শিল্প সাহিত্যের জায়গাটা হওয়া উচিত সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ জায়গা। কারণ কবি–সাহিত্যিকদের কোনো রাজনৈতিক দলের বিবেচনায় না ফেলে, লেখা ও শিল্পের মান বিবেচনায় পুরস্কৃত করা উচিত।’ তিনি বলেন, ‘(পুরস্কার বা পদকের জন্য) রাষ্ট্রের যে প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তারা সেগুলো প্রতিপালন করবে। কিন্তু কখনো কখনো স্বজনপ্রীতি, কখনো রাজনৈতিক বিবেচনা, কখনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এসব পুরস্কার দিন দিন বিবর্ণ হচ্ছে, যা আমাদের সংস্কৃতিকে, ভাষাকে, মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের মূল তাৎপর্যকে ম্লান করে দিচ্ছে।’

কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন ২০০৬ সালে কবিতায় বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। ছবি: সংগৃহীত

তবে এত দেরিতে পুরস্কার ফিরিয়ে দেওয়ায় জাকির তালুকদারের কিছুটা সমালোচনাই করেছেন এই কবি। তিনি বলেন, ‘জাকির তালুকদারের উচিত ছিল যখন পুরস্কারটা পেয়েছেন, তখন প্রত্যাখ্যান করা। তবে অনেক পরে হলেও তিনি বিষয়টি বিবেচনা করেছেন। এত পরে এসে সেটি ফেরত দেওয়া খুব একটা গুরুত্ব বহন করে না। তবুও একটা প্রতিবাদ হিসেবে জাকির তালুকদার যেটা করেছেন, সেটাকে আমি সাধুবাদ দিই। আমি মনে করি এই প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পরিষদ; যারা পুরস্কার দেন, তাঁদের এটা বিবেচনা করা উচিত। আমি সব পুরস্কারের ক্ষেত্রেই এই কথাগুলো বলতে চাই। সবারই চৈতন্য উদয় হোক। সবারই সুমতি হোক–একজন কবি হিসেবে এটা প্রার্থনা করি।’

বাংলা একাডেমির মাধ্যমে একাধিক (সাহিত্য ছাড়াও নানা নামে পুরস্কার দেওয়া) পুরস্কারের সমালোচনা করেছেন রেজাউদ্দিন স্টালিন। তিনি বলেন, ‘বাংলা একাডেমি ১৬টা পুরস্কার ঘোষণা করেছে। বাংলা একাডেমি পুরস্কার দেবে কবিতায়, প্রবন্ধে, গবেষণায় ও কথাসাহিত্যে। তারপরও যদি বাড়তি পুরস্কার দেয় দিতে পারে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় আছে; বিজ্ঞান লেখালেখির জন্য তারা পুরস্কার দেবে। অন্যান্য যেসব পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় আছে। শিশু একাডেমি শিশু সাহিত্যের পুরস্কার দেবে। কেউ যদি উৎকৃষ্ট শিশু সাহিত্য রচনা করে থাকে, তাঁকে বাংলা একাডেমি কখনো কখনো বিবেচনা করতে পারে।’

নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদকে ১৯৮২ সালের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হয়, যা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। ছবি: সংগৃহীত

নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদকে ১৯৮২ সালের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হয়, যা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। স্বৈরাচার এরশাদের শাসনামলে শিশু একাডেমিতে গুলি চলে এবং একজন নিহত হয়েছিল। পাশাপাশি ওই বছর সেন্সর বোর্ডের এক সদস্যকেও সেবার পুরস্কার দেওয়া হয়। এ দুই ঘটনার প্রতিবাদে মামুনুর রশীদ পুরস্কার প্রত্যখ্যান করেন। ২০১২ সালে তিনি একুশে পদক পেলেও তাঁকে আর কখনো বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হয়নি। সম্প্রতি জাকির তালুকদারের পুরস্কার ফেরত দেওয়ার প্রসঙ্গে এই নাট্যব্যক্তিত্ব ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে বলেন, ‘বিষয়টি আমি খুব ডিটেইলে জানি না। অগণতান্ত্রিকতার যে প্রতিবাদ তিনি করেছেন, এটার সাথে আমি একমত। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটাকে ফেরত আনতে হবে। জুরি বোর্ডে যারা থাকেন, তাঁদের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। কথাগুলো ভেবে দেখা দরকার। আমি প্রতিবাদটাকে খুব যৌক্তিক মনে করি।’

বাংলা একাডেমি পুরস্কারের জন্য ১৯৭২ সালে বাংলাদেশি মার্কসবাদী–লেনিনবাদী তাত্ত্বিক, ইতিহাসবিদ, লেখক, বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমরের নাম ঘোষণা হলেও তিনি তা সাথে সাথেই প্রত্যাখ্যান করেন। অবশ্য ১৯৭৪ সালে তিনি ইতিহাস পরিষদ পুরস্কারও প্রত্যাখ্যান করেন।

বাংলা একাডেমি পুরস্কারের জন্য ১৯৭২ সালে ইতিহাসবিদ, লেখক, বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমরের নাম ঘোষণা হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ছবি: সংগৃহীত

এ বিষয়ে বদরুদ্দীন উমর বলেন, ‘আমার ৯২ বছর বয়স হয়ে গেছে। এসব নিয়ে কথা বলবার মতো কোনো উৎসাহ আমার নাই। আমাকে মাফ করবেন।’

পুরস্কার কীভাবে দেওয়া হয়
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিশ্বস্ত সূত্রে ধারণা পেয়েছে ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটাল। সূত্রের ভাষ্য, ‘পুরস্কার  দেওয়ার প্রক্রিয়াটা এমন–যাঁরা আগে পুরস্কার পেয়েছেন বা সম্মানিত ফেলো তাঁদের মধ্যে মোটামুটি ৩০ জনকে চিঠি দিয়ে এগারোটা ক্যাটাগরিতে (বিষয়ে) কারা পুরস্কার পেতে পারে তাঁদের নাম প্রস্তাব করতে অনুরোধ করা হয়। এই ফেলোরা এগারোটা বিষয়ে কবি–সাহিত্যিক–গবেষকদের মনোনয়ন দেন। একজন ফেলো একটা বিষয়ে একজনকে মনোনয়ন দিতে পারেন। কেউ চাইলে একাধিক বিষয়ের জন্য একজনের মনোনয়ন দিতে পারেন। বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়ার জন্য অন্তত একটি প্রস্তাব বা মনোনয়ন লাগে। মনোনীতদের বাইরে কাউকে পুরস্কার দেওয়ার সুযোগ নেই। কারও ব্যাপারে ১০ জন ফেলো প্রস্তাব করলেও পুরস্কার না পেতে পারেন। আবার একটি প্রস্তাবেও পুরস্কার পেতে পারেন কেউ। এই মনোনয়নগুলোর একটা তালিকা করা হয়; কে কোন বিষয়ে ক’জনের মনোনয়ন পেয়েছেন। এরপর এই তালিকা পাঠানো হয় পুরস্কার দেওয়ার জন্য গঠিত কোর কমিটির কাছে। এই কমিটির সদস্য থাকেন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

কোর কমিটি তাদের সিদ্ধান্ত জানালে তা বাংলা একাডেমির কার্যনির্বাহী পরিষদে পাঠানো হয়। কার্যনির্বাহী কমিটি এই তালিকা পাস বা এ থেকে কাউকে বাদও দিতে পারে। তবে প্রস্তাবিত নামের বাইরে কাউকে যুক্ত করতে পারে না। কার্যনির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্তের পরই বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অথবা তাঁর প্রতিনিধি সম্ভাব্য পুরস্কারপ্রাপ্তদের ফোনকল করে পুরস্কারের ব্যাপারে তাঁদের সম্মতি নেন। মৌখিক সম্মতি পাওয়ার পরই তালিকাটি সংবাদ মাধ্যমে পাঠানো হয়।

দেখা যাচ্ছে, এই পুরস্কার ঘোষণার প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে ভূমিকা রাখে কার্যনির্বাহী পরিষদ। সম্প্রতি পুরস্কার ফেরত দেওয়া জাকির তালুকদার এই পরিষদ গঠনে অগণতান্ত্রিকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন, যার সাথে বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত অনেক সাহিত্যিকই আদর্শগতভাবে একমত।

প্রসঙ্গত, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারের অর্থমূল্য বর্তমানে ৩ লাখ টাকা; যা এর আগে ছিল ১ লাখ। জাকির তালুকদারের ফেরত দেওয়া পুরস্কারটির অর্থমূল্য ছিল ১ লাখ টাকা। বর্তমানে পুরস্কারের অর্থমূল্য ৩ লাখ টাকা হলেও একই বিষয়ে দুজন পুরস্কার পেলে তা ভাগ করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া বাংলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে দেওয়া অন্যান্য পুরস্কারের অর্থমূল্য ভিন্ন ভিন্ন পরিমাণের। এর মধ্যে পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের নামে দেওয়া সাহিত্য পুরস্কারের অর্থমূল্য ৫ লাখ টাকা।

বর্তমান বাস্তবতায় একাডেমি পুরস্কারের এই অর্থমূল্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। এ বিষয়ে বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন বলেন, ‘এসব পুরস্কারের অর্থমূল্য এত কম! আমাদের সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প আছে। অথচ আমাদের এই শিল্পসাহিত্যের জন্য বাজেট কত কম। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারের অর্থমূল্য মাত্র ৩ লাখ টাকা। যেখানে বেসরকারি পদকগুলো, যেমন: জেমকন পুরস্কারের জন্য দেওয়া হয় ৮ লাখ টাকা। আমি এসব বিষয়ও বিবেচনা করতে বলব।’

যা বললেন বাংলা একাডেমি মহাপরিচালক
জাকির তালুকদারের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ফেরত ও তাঁর তোলা বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক (ডিজি) ও কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে বলেন, ‘জাকির তালুকদার যে কারণ দেখিয়ে পুরস্কার ফেরত দিয়েছেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি যে সময় পুরস্কার নিয়েছেন; ২০১৪ সালে সে সময়ও অগণতান্ত্রিকতা চরম পর্যায়ে ছিল। ওই সময় তিনি পুরস্কার গ্রহণ করেছেন। দ্বিতীয়ত, তিনি বলেছেন পুরস্কারের মান কমে গেছে। আসলে বাংলাদেশে লেখকদের মান কমে নাই। লেখক সংখ্যা অনেক বেড়েছে। তরুণ লেখকরা অনেক ভালো লিখছেন। আশির দশকে বাংলা একাডেমিতে মাত্র দুটি পুরস্কার প্রচলিত ছিল। এখন কিন্তু বাংলা একাডেমিতে ১১টা বিষয়ে পুরস্কার দেওয়া হয়। তাতেও সবাইকে পুরস্কার দিয়ে শেষ করা যায় না। লেখকভেদে মান কম–বেশি হতে পারে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে সাহিত্যের মান কমে গেছে বলা, তরুণ ও নতুন লেখকদের এক ধরনের অবজ্ঞা করা বলে আমি মনে করি। এটা কোনো লেখক অন্য কোনো লেখককে বলতে পারেন না, তিনি যে–ই হোন না কেন। এই কথাটি আমি বাংলায় একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে বলছি না। বাংলা সাহিত্যের একজন লেখক হিসেবে বলছি।’

জাকির তালুকদারের পুরস্কার ফেরত ও অভিযোগগুলোকে অগ্রহণযোগ্য বলেছেন বাংলা একাডেমি মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। ছবি: সংগৃহীত

দেরিতে পুরস্কার ফেরতের বিষয়ে নূরুল হুদা বলেন, ‘উনি ১০ বছর পরে পুরস্কার ফেরত দিয়েছেন। পুরস্কারের মান আসলে দুই ধরনের। একটা হলো পুরস্কারের টাকার মূল্য, অন্যটা হলো নান্দনিক মূল্য। এই ১০ বছরের পুরস্কারের যে নান্দনিক মূল্য, সেটা তিনি ফেরত দেবেন কীভাবে?’

প্রতিষ্ঠানে চাকরিরতদের পুরস্কারপ্রাপ্তির বিষয়ে বাংলা একাডেমির ডিজি বলেন, ‘বাংলা একাডেমিতে চাকরিরত অবস্থায় পুরস্কার অনেক আগে থেকে পেয়ে আসছে। পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় চাকরিতে থেকে পুরস্কার পেতে পারে। কারণ, পুরস্কার দেওয়ার সময় তিনি বাংলা একাডেমির চাকরিজীবী, মন্ত্রণালয়ের চাকরিজীবী কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি করেন—এসব মনে করা হয় না। সাহিত্যে তাঁর যে অবদান, সেটাকেই মূল্যায়ন করা হয়। এটা নিয়ে কোনো বিতর্কের অবকাশ আছে বলে মনে করি না।’

লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর

 
By clicking ”Accept”, you agree to the storing of cookies on your device to enhance site navigation, analyze site usage, and improve marketing.