চাকমা বিদ্বেষ–ই কি নাথান বমের বেপরোয়া হওয়ার কারণ

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৯:৫৪ পিএম

পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বাগুলোর মধ্যে যারা সবদিক থেকেই  পিছিয়ে আছে তাদের মধ্যে বম সম্প্রদায় একটি। এদের আবাসস্থলও বেশ গহীনে। মূলত বান্দরবানের থানচি ও রুমা উপজেলায় বম সম্প্রদায়ের মানুষের দেখা বেশি পাওয়া যায়। তারপরও তাদের সংখ্যা ৫ থেকে ৬ হাজারের বেশি নয়। 

এই সম্প্রদায়ের একজন, নাথান বম যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে (এখন চারুকলা অনুষদ) পড়াশুনার সুযোগ পেয়ে গেল, তখন তা নিয়ে বম সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে গর্বের কমতি ছিল না।  সেই নাথানই এখন বম সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য বিপদ ডেকে এনেছেন। বেশির ভাগ বম মানুষ নাথানের সঙ্গে জড়িত না থাকলেও, তাদের দেখা হচ্ছে সন্দেহের চোখে। কেননা নাথান বম পাহাড়ে গড়ে তুলেছেন সশস্ত্র সন্ত্রাসী দল কুকি–চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)। এদের সশস্ত্র শাখা কুকি–চিন ন্যাশনাল আর্মি (কেএনএ) পাহাড়ে এক আতঙ্কের নাম। হঠাৎ পাহাড় অশান্তের পেছনে এই সংগঠনটিকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

স্থানীয় বম সম্প্রদায়ের একজন নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, নাথান যখন ঢাকা থেকে এলাকায় আসতেন, তখন তাদের সম্প্রদায়ের অনেকেই এসে তাঁর সঙ্গে কথা বলতেন। নাথানের মধ্যে ‘নেতানেতা’ একটা ভাবও তৈরি হয়েছিল। তাছাড়া নাথান পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের স্থানীয় নেতা ছিলেন। চারুকলার ভাস্কর্য বিভাগে পড়াশুনা করতেন নাথান। বিভিন্ন সময় এলাকায় বিভিন্নজনের ভাস্কর্য তৈরি করে পরিচিতিও পেয়েছিলেন। বিশেষ করে পাবর্ত্য চট্টগ্রামের জনসংহতি সমিতির প্রধান মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার (সন্তু লারমা) ভাস্কর্য করে নাথানের পরিচিতি আরও বেড়ে যায়। 

তিনি বলেন, ‘নাথানের মধ্যে উচ্চাশা তৈরি হতে থাকে। কিন্তু কিছু করতে গেলেই তাকে চাকমা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পড়তে হচ্ছিল। যেকোনো কারণেই হোক এই প্রতিযোগিতায় নাথান টিকতে পারছিল না। ফলে নাথানের রাগ বা ক্ষোভ গিয়ে পড়তে থাকে চাকমাদের ওপর। এই ক্ষোভ থেকেই নাথান পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়। কেননা এটা জনসংহতি সমিতি বা জেএসএসের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। আর চাকমারাই মূলত এর নিয়ন্ত্রণে ছিল।’ 

নাথানের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ ছিল, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এরপর নাথান এনজিও প্রতিষ্ঠা, ব্যবসা অনেক কিছুর সঙ্গে জড়িত হয়ে যায়। আমি যেহেতু ঢাকায় কাজ করি তাই আর যোগাযোগটা তেমন ছিল না। তাছাড়া নাথানের চেয়ে আমি বয়সে বড়। এ কারণে আমরা ঠিক বন্ধু ছিলাম না। তবে নাথান সব সময় মনে করত, তাকে অনেক কিছুই চাকমাদের আধিপত্যের কারণে হারাতে হয়েছে।’ 

অবশ্য এই ব্যক্তি এ কথাকে সেভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখেননি। কেননা নাথানের মতো পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অনেকেই মনে করেন চাকমা এবং মারমারা সব সুবিধা নিয়ে নিচ্ছে। এ কারণে অন্য আরও অন্তত ৯টি জনগোষ্ঠীর মানুষ প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। 

সম্প্রতি বান্দরবানের রুমা ও থানচিতে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে তিনটি ব্যাংক লুট করে কেএনএফের সদস্যরা। ছবিা: সিসিটিভি থেকে সংগৃহীত

নাথান বম জাতিসংঘের একটি সংস্থায় চাকরির জন্য আবেদন করেছিলেন। পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর এই সংস্থাটি পাহাড়ের উন্নয়নের জন্য কাজ করছিল। চারুকলা থেকে পড়াশুনার পর নাথান সেখানে চাকরির জন্য আবেদন করেন। সেটা ২০০৩ সালের কথা। কিন্তু সেই চাকরিটা তার হয়নি। চাকরিটা পেয়েছিল কয়েকজন চাকমা যুবক। সে সময় নাথানের ধারণা জন্মেছিল কেবল বম সম্প্রদায়ের হওয়ার কারণে এবং চাকমা না হওয়ার কারণে তাঁর চাকরিটা হয়নি।

এরপর সবকিছু ছেড়েছুড়ে নিজের এলাকায় চলে যান নাথান। নামেন পর্যটন ব্যবসায়। একটা রিসোর্ট করেন নিজের এলাকায়। কিন্তু সেই ব্যবসাও বেশিদিন টেকেনি। এরপর ২০০৮ সালে কুকি চিন ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন নামে একটি এনজিও গড়ে তোলেন। স্থানীয়দের ধারণা, তখন থেকে নাথান অন্য পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছিলেন তিনি। এনজিও গড়ার পর হয়তো তিনি কোনো জায়গা থেকে টাকা পেয়েছিলেন, যা দিয়েই সশস্ত্র সংগঠন গড়ে তুলেছেন। 

নাথানের চারুকলার এক বড় ভাই, যিনি নিজেও একজন পাহাড়ি (বম নয়) জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাথান সৌভাগ্যবশত সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে সুযোগ পাননি। 

তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমেদ একবার বান্দরবান গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ব্যাপারে সহায়তা দেওয়ার কথা বলেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে নাথান সেখানে ভর্তি হন। তবে পড়াশুনায় ``গ্যাপ’’ থাকলেও শেষ পর্যন্ত নাথান স্নাতক সম্পন্ন করেন। দেশের বাইরেও পড়াশুনা করেছেন বলে নিজে বলতেন। তবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নাথান গিয়েছেন, এটা ঠিক। তবে পড়াশুনার বিষয়টি কেউই নিশ্চিত করেননি।’ 

চাকমা বিদ্বেষ ছিল নাথানের ‘মজ্জাগত’
কেএনএফ শুরুতে পাহাড়ে নতুন রাজ্যের দাবি করে। ৯টি উপজেলা নিয়ে এই রাজ্য গঠনের দাবি তোলে তারা। একপর্যায়ে তা থেকে সরেও আসে কুকি চিন। নতুন করে দাবি তোলে সায়ত্বশাসিত অঞ্চল করার। দাবির ক্ষেত্রে সংগঠনের অবস্থানের পরিবর্তন হলেও তিনটি বিষয়ে তাদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। সেগুলো হলো পাহাড়ের প্রথম দল জেএসএস এবং আঞ্চলিক পরিষদের বিরোধিতা আর চাকমা বিদ্বেষ। 

চাকমা বিদ্বেষ থেকেই কেএনএফ গঠন করেন নাথান বম। ছবি: সংগৃহীত

অনেকেই মনে করেন নাথানের জেএসএস ও আঞ্চলিক পরিষদের বিরোধিতার পেছেনও চাকমা বিদ্বেষ কাজ করেছে। কেননা এসব জায়গায়ও চাকমাদের আধিপত্য রয়েছে। নাথান মূলত চাকমাদের আধিপত্য থেকে বেরিয়ে আসতেই দাবিগুলো সাজিয়েছিলেন। আঞ্চলিক পরিষদ, জেএসএস এবং চাকমাদের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গার কেএনএফ প্রকাশ্যেই করেছে। তবে এও ঠিক চাকমাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পাহাড়ে নতুন নয়। 

পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মধ্যে চাকমারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। শিক্ষাসহ নানা ক্ষেত্রে তারা এগিয়েও। তিন পার্বত্য জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী ঐতিহ্যবাহী প্রশাসনিক পদ হলো চিফশিপ এবং হেডম্যান। এদের বেশির ভাগই চাকমা, নয়তো মারমা সম্প্রদায়ের। এ জন্য পাহাড়ে বাঙালি বাদে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঐতিহ্যবাহী সংগঠন, ইউনিয়ন, উপজেলা এবং ব্যবসা, এনজিও, প্রশাসনিক সব পদে হয় চাকমা, নয় মারমা জনগোষ্ঠীর লোকজনের প্রাধান্য। এ নিয়ে চাকমা ও মারমা ছাড়া অন্য গোষ্ঠীগুলোর কিছুটা ক্ষোভও আছে।
 
কিন্তু বমসহ অন্য জাতিগোষ্ঠীর কথা হচ্ছে পাহাড়ে যে আন্দোলন হয়েছে, পাহাড়িদের অধিকারের জন্য যে সংগ্রাম হয়েছে, সেটা শুধু চাকমা বা মারমারাই করেনি। পাহাড়ের সবাই করেছে। অথচ সুবিধাগুলো বলা যায় কেবল একটি–দুটি জনগোষ্ঠীই নিয়ে নিচ্ছে। অন্যরা অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে।
 


এই চাকমা বিদ্বেষ থেকে পাহাড়ে ম্রো জনগোষ্ঠীর একটি অংশ ‘গরম বাহিনী’ গড়ে তোলে। এরপর মগ পার্টি নামে একটি সংগঠনও গড়ে ওঠে বান্দরবানে। অবশ্য এরা খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। এখানে এখন কেএনএফ প্রভাব রেখেছে।
 
২০২২ সালের শুরুর দিক থেকে ফেসবুকে পাহাড়ের ৯ উপজেলা নিয়ে পৃথক রাজ্যের ঘোষণা দেয় কেএনএফ। তাদের ফেসবুক পেজে দেওয়া বার্তায় সমস্ত ক্ষোভ আঞ্চলিক পরিষদ, জেএসএস এবং চাকমাদের ওপর চাপায়। বিভিন্ন মহল্লায় হামলা চালিয়ে চাকমাদের বিরুদ্ধে ‘প্রতিশোধ’ নেওয়ার নানা বার্তা তারা দিতে থাকে। এরই মধ্যে তারা রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নের একটি ত্রিপুরা গ্রামে দুজন জুমচাষিকে হত্যা এবং শিশুসহ কয়েকজনকে আহত করে।

কেএনএফ সুস্পষ্ট দাবি তোলে তাদের স্বায়স্তশাসিত অঞ্চলে পার্বত্য জেলা পরিষদ বা আঞ্চলিক পরিষদের আওতাধীন থাকবে না। তাদের বক্তব্য হচ্ছে কুকি–চিন তথা বম, পাংখোয়া, লুসাই, খুমি, ম্রো ও খিয়াং জনগোষ্ঠীর মানুষ পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমিপুত্র। কিন্তু এই ভূখণ্ডে সরকার ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে বঞ্চনার শিকার তারা। 

গত কয়েক মাসে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের ঘুম উড়িয়ে দিয়েছিল একটি মাত্র নাম—মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন। চাঁদা না পেয়ে প্রকাশ্যে সশস্ত্র সন্ত্রাসী দিয়ে অফিস ভাঙচুর ও লুটপাট—সবই...
চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে গেলেই দেখা মিলবে এক অদ্ভুত দুনিয়ার। নাম তার—জঙ্গল সলিমপুর। প্রায় ৩,১০০ একর বিস্তৃত এক দুর্গম পাহাড়ি এলাকা। সরকারি এই খাসজমিতে গড়ে উঠেছে...
বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের প্রবেশমুখেই অবস্থিত সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর। গত কয়েক দশক ধরে এলাকাটি নিয়ে নানা রহস্য ও ভীতি কাজ করলেও, চলতি বছরের শুরুতেই জঙ্গল সলিমপুর নতুন...
পাহাড়ে সংঘাতের ঘটনায় চারজন নিহত ও অন্তত ৮০ জন আহত হয়েছেন। সশস্ত্র বাহিনীর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) থেকে এই তথ্যই জানানো হয়। এমনকি দেশের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমগুলোও এমন তথ্যই প্রকাশ...
হাইকোর্টের রায়ের ১০ বছর পর এবার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলার আপিল শুনানি চলছে। রোববার পেপারবুক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয় সর্বোচ্চ...
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। আগামী ৪ আগস্ট এ মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন...
আটককৃত এই ৬ বিদেশি নাগরিক তাদের ডাবল-এন্ট্রি ভিসায় প্রতি সফরে অনুমোদিত সর্বোচ্চ ১৫ দিনের বেশি সময় ধরে ভারতে অবস্থান করছিলেন। সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্টের বিভিন্ন হোটেল ও গেস্টহাউসে পরিচালিত এক বিশেষ...
পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে চালানো এক বিস্ফোরণে অন্তত সাতজন নিহত এবং ১৮ জন আহত হয়েছেন। বিস্ফোরণের দৃশ্য ইতিমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
লোডিং...

এলাকার খবর