
বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) হিসেবে যাত্রা শুরু করে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)। কিন্তু এনজিও থেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীতে পরিণত হয়ে রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানের ৬টি উপজেলায় অস্থিতিশীল এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে এই গোষ্ঠীটি। সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনার ভেতরেই বান্দরবানে ব্যাংক লুটের ঘটনা ঘটিয়েছে তাঁরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংযোগ থাকতে পারে। তাই এদের দ্রুত নিষ্ক্রিয় করা প্রয়োজন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবানকেন্দ্রিক বম, পাঙ্খোয়া, লুসাই, খুমী, ম্রো, খিয়াং–এই ছয়টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উন্নয়নে কুকি চিন ন্যাশনাল ডেভলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (কেএনডিএর) যাত্রা শুরু হয় ২০০৮ সালে। শুরুতে এনজিও হিসেবে যাত্রা শুরু হলেও ২০১৬ সালে কেএনএফ নামে এই গোষ্ঠীটি সশস্ত্র হয়ে ওঠে।
আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর তথ্য বলছে, কেএনএফের আলাদা উইং কুকি চিন ন্যাশনাল আর্মি (কেএনএ) রাঙামাটির বিলাইছড়ির বড়থলি ইউনিয়ন এবং বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড় ঘিরে রুমা, থানছি, লামা, আলীকদম ও রোয়াংছড়ি নিয়ে স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য তৈরির উদ্দেশ্যে কাজ শুরু করে।
এই গোষ্ঠীর নেতৃত্বে শুরু থেকেই আলোচনায় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী এবং এক সময়ের জনসংহতি সমিতির ছাত্র সংগঠন পিসিপির কেন্দ্রীয় নেতা নাথান বম। মূলত তাঁর নেতৃত্বে বান্দরবানের দুর্গম এলাকায় পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সীমান্ত ও সেখানকার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে কাজে লাগিয়ে অস্ত্র সংগ্রহ এবং প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে কেএনএ। এরই মধ্যে পাহাড়ের অন্যান্য আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় নাথান বমের। ২০১৮ সালে তিনি বান্দরবান থেকে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীও হন।
২০২১ সালে নাথাম বমের নেতৃত্বাধীন এই গোষ্ঠীর পাহাড়ে টাকার বিনিময়ে জঙ্গিদের সহায়তার বিষয়টি সামনে আসে। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে ৪ সেনা সদস্য এবং কেএনএ’র অন্তত ১৬ সশস্ত্র সদস্য নিহত হন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশ-ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তকেন্দ্রিক বেশ কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগের কারণে সংখ্যায় কম হলেও এই দলটিকে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, ভারতের সেনাবাহিনী যখন মিজো, নাগা বা উলফার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে তখন তাদের সদস্যরা বিচ্ছিন্ন হয়ে আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে হয়ত আমাদের দেশে ঢুকে পড়ে। আবার মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যখন সীমান্তে তাদের তৎপরতা বৃদ্ধি করে তখন গ্রুপগুলোর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়।
সম্প্রতি এই গোষ্ঠীর সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন স্তরের আলোচনায় সংশ্লিষ্ট এলাকায় স্থিতিশীল অবস্থা তৈরিতে বেশ অগ্রগতি হয়েছিল। কিন্তু আলোচনাকালীন ব্যাংক লুটের ঘটনা গ্রহণযোগ্য নয় বলেই মতামত নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের। এই পরিস্থিতিতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তাঁরা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শহীদুল্লাহ চৌধুরী বলেন, বিদ্রোহের অনেকগুলো স্তর থাকে। এই গোষ্ঠীটি বর্তমানে মাঝামাঝি বা তিন নম্বর স্তরে চলে গেছে। এখনই এসব গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা না হলে ভবিষ্যতে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যাবে।
বর্তমানে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রায় পাঁচ শতাধিক সদস্য সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে।
আরও পড়ুন:
- কেএনএফের সঙ্গে আলোচনা বন্ধের ঘোষণা শান্তি কমিটির
- ‘রুমায় অপহৃত সোনালী ব্যাংক ম্যানেজার ভালো আছেন’
- দুই বছর আগে ব্যাংক লুটের ঘোষণা দিয়েছিল কুকি–চিন
- অক্ষত আছে রুমার সোনালী ব্যাংকের ভল্টের টাকা
- ব্যাংক লুটের আগে ফাঁকা গুলি ছুঁড়েছিল ডাকাতরা
- যেভাবে লুট হলো রুমার সোনালী ব্যাংক
- রুমার পর এবার থানচিতে ২ ব্যাংকে ডাকাতি
- বান্দরবানে সোনালী ব্যাংকে লুট, ম্যানেজার অপহরণ



