এশিয়া কাপের জায়গায় তো তাহলে একটা ভারত-পাকিস্তান সিরিজ খেলে ফেললেই হয়! দুই দেশের চিরবৈরিতার কারণে সে উপায় নিজেরাই রাখতে পারছে না। এশিয়া কাপ আর বিশ্বকাপেই যা দেখা-সাক্ষাৎ হয় দুই দলের। বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের মতো দাপুটে বোর্ডের উপস্থিতিতে যা ইচ্ছা তা-ই করা যাচ্ছে না। অন্তত সব সময় করা যায় না আর কি! সে কারণে সুযোগ পেয়ে এশিয়া কাপটাকেই কি নিজেদের দাদাগিরির মঞ্চ বানিয়ে ফেলছে ভারত আর পাকিস্তান? বিশেষ করে ভারত?
বারেবারে বদল দেখা এবারের এশিয়া কাপের সর্বশেষ বদলের পর তা মনে হতে বাধ্য।
সর্বশেষ বদল– এশিয়া কাপের সুপার ফোরে শুধু ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের জন্য রিজার্ভ ডে রাখা হচ্ছে। এর আগে সূচিতে শুধু ফাইনালের জন্য রিজার্ভ ডে রাখা ছিল। এখন যোগ হলো সুপার ফোরের ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ। কিন্তু সুপার ফোরে বাকি আর কোনো ম্যাচে এ সুযোগ রাখা হচ্ছে না। এ সিদ্ধান্ত এসেছে সুপার ফোরে একটা ম্যাচ হয়ে যাওয়ার পর। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সে ম্যাচে বৃষ্টি কোনো প্রভাব ফেলেনি।
শুধু ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের জন্যই রিজার্ভ ডে রাখার কারণ বুঝতে কারওই বেগ পেতে হয় না। পুঁজিবাদের যুগে যা থেকে অর্থ আসে, লক্ষ্মী ভেবে তারই পূজা চলে। এশিয়া কাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচই তো সবচেয়ে বড় ‘সেলিং প্রোডাক্ট!’ দুই দলের ম্যাচ ইদানিং বিরল বলে এ ম্যাচের প্রতি আগ্রহ আরও বেশি। বাকি সব ম্যাচ মিলিয়েও হয়তো এতটা অর্থ সমাগম হবে না, যতটা ভারত-পাকিস্তানের এক ম্যাচে হবে।
কিন্তু গ্রুপ পর্বে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচটা পুরোপুরি হতে পারেনি। ভারত ব্যাটিং করার পর বৃষ্টি নামে, পাকিস্তান আর ব্যাট করতে নামতেই পারেনি। আহা, আফসোস! ক্রিকেটপ্রেমীরা দুঃখী ছিলেন ধুন্দুমার লড়াই দেখতে না পাওয়ায়। তবে তাদের চেয়েও বেশি দুঃখি সম্ভবত আরও দুটি পক্ষ ছিল। দুই ‘বেচারা’– আয়োজক পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) এবং নিয়ন্ত্রক এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) কত লোকসান যে গুনতে হলো! পাকিস্তানের ইনিংসটাও সেদিন হলে টিভি বিজ্ঞাপন বাবদ কোটি কোটি টাকা পাওয়া যেত!
চোর পালানোর পর বুদ্ধি বেড়েছে তাদের। ক্রিকইনফো জানাচ্ছে, আয়োজক পাকিস্তান বোর্ড বুদ্ধিটা দিয়েছে– যাতে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের জন্য একটা রিজার্ভ ডে রাখা হয়। এসিসির সেটিকে মনে হয়েছে মোক্ষম প্রস্তাব। প্রসঙ্গত, এসিসির প্রধান আবার ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের সচিব জয় শাহ, যিনি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ছেলে।
পাকিস্তানের সাংবাদিক ফয়জান লাখানি জানাচ্ছেন, অন্য বোর্ডগুলোর কাছেও মতামত জানতে চেয়েছিল এসিসি। আহা, গণতন্ত্রের কী দারুণ প্রদর্শনী! যে খেলায় তিনটি বিশেষ বোর্ড (ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড) মোড়ল হওয়ার দাবি তুলে তা কার্যকরও করে ফেলেছিল বেশ কিছুদিনের জন্য, যেখানে ‘রাজন্য’ভারতের অর্থশক্তির দাপটের সামনে এমনকি ক্ষণিকের জন্য মোড়ল বনে যাওয়া বাকি দুই বোর্ডেরই গলায় জোর সব সময় থাকে না, সেখানে এশিয়ার এই ছোট্ট পরিসরে গণতন্ত্রের চর্চা একেবারে রুলবুক মেনে হবে– এমনটা ভেবে নেওয়া ভাবুকের চিন্তাশক্তি নিয়েই প্রশ্ন তুলে দেবে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, রিজার্ভ ডে রাখা হলো ভারত আর পাকিস্তানের ম্যাচের, কিন্তু ভারতের দাপট আর দাদাগিরি নিয়েই এখানে এত কথা হচ্ছে কেন? কারণ, আরেকবার নিতান্তই প্রসঙ্গত মনে করিয়ে দেওয়া যাক– এসিসির প্রধান জয় শাহ ভারতের বোর্ডের সচিব এবং তিনি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ছেলে।
মজার ব্যাপার হলো, নিজ নিজ স্বার্থে দুটি দেশ– ক্রিকেটে দুটি বোর্ড– কখনো চরম শত্রু, আবার কখনো তারাই পরম বন্ধু।
এবারের এশিয়া কাপের আয়োজন নিয়ে কয়েক প্রস্থে হয়ে যাওয়া নাটক থেকেই দেখুন না! কী শত্রুতা তাদের! পাকিস্তান কাগজে-কলমে এশিয়া কাপের আয়োজক, কিন্তু ভারত সেখানে দল পাঠাবে না। অনেক দেন-দরবার হলো এ নিয়ে। আলোচনা-সমালোচনা, হুমকি-পাল্টা হুমকি সবই চলেছে। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত কী? পাকিস্তানের এশিয়া কাপের সিংহভাগ ম্যাচ হচ্ছে শ্রীলঙ্কায়। ভারতীয় দলের সব ম্যাচ শ্রীলঙ্কায়। বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, এমকি পাকিস্তান আর শ্রীলঙ্কাকেও কখনো কলম্বো, কখনো লাহোর করতে হয়েছে। আর ভারতীয় দল কলম্বোতেই তাঁবু গেঁড়ে বসে মনের সুখে শিস বাজাচ্ছে আর কি!
টিভিতে দাদাগিরি নামের অনুষ্ঠানটা ভারতের সাবেক অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি সঞ্চালনা করতে পারেন, তবে ক্রিকেটের বাস্তব দুনিয়ায় দাদাগিরিটা ভারতের বোর্ডই করে। যার সামনে পাকিস্তানও নত হতে যেন বাধ্য। অক্টোবরে ওয়ানডে বিশ্বকাপ ভারতে। পাকিস্তান বোর্ড তাই হুমকি দিয়েছিল, এশিয়া কাপের জন্য ভারতীয় দল পাকিস্তানে না গেলে পাকিস্তান দলও বিশ্বকাপ খেলতে ভারত যাবে না। মিনমিনে গলায় ওই হুমকি পর্যন্তই। এশিয়া কাপের বেশির ভাগ ম্যাচ তো শ্রীলঙ্কা পেয়েছেই, পাকিস্তানও বিশ্বকাপে যেতে রাজি। বরং সেখানে আবার নানা কারণে পাকিস্তানের ম্যাচগুলোর দিন-তারিখই বারবার বদল হয়েছে, যার প্রভাব স্বাভাবিকভাবে পড়েছে অন্য দলের সূচিতেও!
ওহো, একটু ভুল হলো, এসিসি লুফে নিয়েছে। নিতান্তই প্রসঙ্গত তৃতীয়বার মনে করিয়ে দেয়া যাক, বর্তমান এসিসি প্রধান জয় শাহ ভারতীয় বোর্ডেরও সচিব। এবং তিনি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জয় শাহর ছেলে।
তা ‘গিরগিটি’দুই বোর্ডের ক্ষণে ক্ষণে রং বদলের কারণে ভুগতে হচ্ছে অন্য দলগুলো। যার সর্বশেষ উদাহরণ হয়ে এল এশিয়া কাপের সুপার ফোরের সূচিতে হঠাৎ বদল। অচিন্তনীয় বলার আর উপায় নেই, যেহেতু কেউ চিন্তা করে এরই মধ্যে সেটি কার্যকরও করে ফেলেছে। তবে ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য। ভারত আর পাকিস্তানের ম্যাচ সবচেয়ে লাভজনক, এটা বোঝানোর দরকার পড়ে না। কিন্তু যখন এশিয়ার দলগুলো একই ছাতার নিচে খেলছে, সেখানে শুধু দুটি দলকে- আক্ষরিক ও ভাবগত দুই অর্থেই- বৃষ্টি থেকে বাঁচানোর জন্য আলাদা পদ্ধতির ব্যবস্থা অন্য দলগুলোর জন্য অপমানজনক নয় কি? এ যেন বাংলাদেশ আর শ্রীলঙ্কাকে অনুচ্চারে বলে দেওয়া, ‘তোমাদের ম্যাচ থেকে বেশি একটা আয় হয় না, তোমাদের জন্য তাই বাড়তি সুবিধা নেই।’
ভারত আর পাকিস্তান যাতে অনেক বেশি সুবিধা না পায়, সেজন্য একটা ‘ভারসাম্য’অবশ্য এসিসি এনেছে। সমস্যা হলো, এটিকে ভারসাম্য বললে ‘ভারসাম্য’ শব্দটার অর্থ নিয়েই টানাটানি পড়ে যাবে। কী ব্যবস্থা করেছে এসিসি? যেদিন ম্যাচটা হওয়ার কথা, অর্থাৎ ১০ সেপ্টেম্বর, সেদিনই ম্যাচটা শেষ করার জোর চেষ্টা চালানো হবে। তাতে যদি ওভার কাটতে হয়, তবে অনিচ্ছাসত্ত্বেও তা-ই সই। নিতান্তই যদি ১০ সেপ্টেম্বরে ম্যাচ শেষ করা না যায়, তবে কর্তিত ম্যাচটা সেদিন যেখানে শেষ হবে, সেখান থেকেই রিজার্ভ ডে-তে ম্যাচ শুরু হবে। আহা, কত সবদিক ভেবেচিন্তে নেওয়া সিদ্ধান্ত! ভাবখানা এমন, তাদের বাড়তি পাওয়ার মধ্যেই যেন তাদের ‘স্যাক্রিফাইস’লুকিয়ে!
অন্য সব ম্যাচের জন্য কেন রিজার্ভ ডে রাখা হয়নি, সে কারণও সহজেই অনুমেয়। এশিয়া কাপের পর দলগুলো বিশ্বকাপের প্রস্তুতিতে ঢুকে যাবে। ভারতের যেমন অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সিরিজ আছে, বাংলাদেশে আসবে নিউজিল্যান্ড...। সে হিসেবে সব দলের জন্য রিজার্ভ ডে রাখতে গেলে এশিয়া কাপ অনেক লম্বা হয়ে যাবে, যা আগে থেকে নির্ধারিত ওই সিরিজগুলোতে প্রভাব ফেলবে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে শুধু ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের জন্যই কেন রিজার্ভ ডে? সব দল যখন একই টুর্নামেন্টে খেলছে, তখন সবার জন্য নিয়ম একই হওয়ার কথা নয় কি?
এশিয়া কাপের সূচি আর গ্রুপিং নিয়ে বিতর্ক গতবারের মতো এবারও ছিল। গতবারের মতো এবারও গ্রুপ পর্বে ভারত আর পাকিস্তানকে একই গ্রুপে রেখে তাদের সঙ্গে তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ রাখার উদ্দেশ্য যে ভারত-পাকিস্তানের সুপার ফোরে ওঠা নিশ্চিত করা, তা বুঝতে কষ্ট হয় না কারও। কারণ, তাতে গ্রুপ পর্বের পর সুপার ফোরেও দুই দলের অন্তত একটা ম্যাচ নিশ্চিত হয়। এবার রিজার্ভ ডে-ও শুধু ওই ম্যাচের জন্যই রেখে এসিসি প্রধান বা ভারতীয় বোর্ডের সচিব জয় শাহ যেন বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা-আফগানিস্তানকে আরও পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিলেন, এখানে ভারত আর পাকিস্তানের লড়াই-ই মূল কথা। বাকি ম্যাচগুলো স্রেফ আনষ্ঠানিকতা।