দেশে এখন আলুর দাম নিয়ে কেউ হট্টগোল করছে না। শাহরুখ খানের ‘জওয়ান’ নিয়েও উত্তেজনা মিইয়ে গেছে। কারণ হলে গিয়ে সিনেমা দেখার আর দরকার নেই। ইস্যু এখন জাতীয় পুরুষ ক্রিকেট দলের দুই ক্রিকেটার– তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসান। একজন ফেসবুকে ভিডিও বার্তা দিচ্ছেন, তো অন্যজন পাল্টা ভিডিও সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন কোনো টিভি চ্যানেলে। আর এই বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্যের ঠেলায় দেশের ক্রিকেটের ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা!
তামিম ও সাকিব বাংলাদেশের ক্রিকেট জগতের মহাতারকা– এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। একজন ব্যাটে-বলে শুধু দেশ নয়, পুরো বিশ্বের স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছেন। আরেকজন দেখিয়েছেন প্রতিপক্ষ বোলারদের শাসন করার সাহস। ফলে এই দুজনের ভক্তকূলও বিরাট। একটা সময় বেশ বন্ধুত্ব ছিল এই দুই ক্রিকেটারের মধ্যে। ফলে তাঁদের ভক্তকূলেও একটা শান্তি শান্তি ভাব বিরাজমান ছিল। তাঁদের গলাগলির সেই ছবি অবশ্য এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রলের বিষয়বস্তু, হয়তো ইতিহাসও বটে। আর সেই সঙ্গে সঙ্গে পুরো দেশের ক্রিকেটভক্তদের মধ্যে দৃশ্যমান এক সীমানা তুলে দিয়েছেন তামিম-সাকিব।
ঘটনার শুরুটা বেশ কয়েক মাস আগে থেকে। তামিম ইকবাল এক সকালে অশ্রুসিক্ত চোখে অধিনায়কত্ব ছাড়ার পাশাপাশি ক্রিকেট থেকে বিদায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন হুট করে। ক্রিকেটভক্তদের জন্য ওই ঘটনা বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো হলেও ধীরে ধীরে জানা গেল অনেকদিন ধরেই নাকি আকাশে মেঘ জমে ছিল। সেই মেঘ থেকেই একসময় বজ্রপাত। এর পর হলো নানা কথা চালাচালি। শেষে সরকারপ্রধানের মধ্যস্থতার পর জানা গেল, অবসর ভেঙে তামিম ফিরবেন। খেলবেন বিশ্বকাপেও।
এ নিয়ে ক্রীড়ামহলে সাময়িক অস্বস্তি ও নানান কানাঘুঁষার পরও কিছুটা স্বস্তি মিলেছিল এই ভেবে যে, যাক, বিশ্বকাপে পূর্ণশক্তির দলই তবে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ঘটনার ঘনঘটা আরও বাকি ছিল যে! সাসপেন্স মুভির ক্ল্যাইম্যাক্সের সূত্র মেনে সেজন্যই হয়তো পরিণতিটা এল বিশ্বকাপে দল পাঠানোর কিছু ঘণ্টা আগে। বিশ্বকাপ দলে নেই তামিম। আর এ নিয়ে আবার সামাজিক থেকে গণমাধ্যমে চাউর হলো তামিম-সাকিব-চন্ডিকা হাথুরুসিংহে ত্রয়ীর বিবাদ! দেশের ক্রীড়ামোদীরাও স্পষ্টভাবে বিভক্ত হয়ে গেল।
এরপরই শুরু হলো ভক্তদের সবকিছু স্পষ্টভাবে জানানোর প্রতিযোগিতা! তামিম ভিডিওবার্তা দিয়ে জানালেন নিজের মনের খেদ। বললেন, তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে ইচ্ছাকৃতভাবে। পাশাপাশি নিজের সাথে হওয়া ‘অবিচার’-এর বিস্তারিত জানানোর চেষ্টা করলেন। বললেন, ইনজুরির বিষয়টি বাখোয়াজ। তাঁকে জোর করে বারবার বাধা দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে ষড়যন্ত্রতত্ত্বের বিষয়টিও স্পষ্ট করে দিলেন। তামিমের ভিডিওবার্তায় আমরা বুঝতে পারলাম, ১৭ বছর ওপেনিংয়ে ব্যাট করার পর, তাঁকে নিচে ব্যাট করতে বলাতেই তিনি আঘাত পেয়েছেন বেশি। আর তার জন্যই বিশ্বকাপের দলে প্রয়োজনে না নিতেও বলে দিয়েছেন তিনি। অবশ্য কোনো ব্যক্তিবিশেষের নাম সরাসরি নেননি তিনি। কাউকে সরাসরি দায়ী করে দোষও দেননি। তবে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্ব দেওয়াদের দিকেই তাঁর আঙুল তোলা ছিল।
তামিম ফাটালেন, সাকিব তবে কেন বোমা পকেটে নিয়ে বসে থাকবেন? তাই তিনিও রাতের বেলা হাজির হলেন সত্যভাষণের মহামঞ্চে। তিনিও সবাইকে সবকিছু জানাতে চাইলেন। সরাসরি নাম না নিয়েও, সাকিব সমালোচনাই করলেন তামিমের। বললেন, তামিমকে নিচে ব্যাট করার প্রস্তাব দেওয়া হয়ে থাকলে সেটা তাঁর অজান্তে হয়েছে। তবে এই প্রস্তাবে যে প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়েছে, তা তাঁর কাছে হাস্যকর মনে হচ্ছে। সাকিব বলেন, ‘ম্যাচকে কেন্দ্র করে অনেক কিছু হয়। সে হিসাবে চিন্তা করে আগে থেকে পরিষ্কার করে রাখতে চায়, (তাহলে) আলোচনা দোষের কিছু না। নাকি প্রস্তাবই দেওয়া যাবে না? একজনকে বলা হবে যে, “যা ইচ্ছা তা–ই করো।” দল আগে না ব্যক্তি আগে?’ এই প্রশ্নটি তোলার পাশাপাশি সাকিব এ-ও বলেছেন, তিনিও বেশিদিন অধিনায়কত্ব করবেন না। বিশ্বকাপের পরই ছেড়ে দিতে পারেন। পুরো ক্রিকেট খেলাটা ছেড়ে দেওয়ারও একটা শিডিউল তিনি জানিয়ে দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে এ দেশের ক্রিকেট দলের অবস্থা অনেকটা পাড়ার দলের মতো। কেউ হয়তো ব্যাটের মালিক, কেউ হয়তো বলের। আর সেই ব্যাট ও বলের মালিকের মধ্যে লেগে গেছে ঝগড়া। আগের হয়তো চায়ের আড্ডায় হতো তা। তবে সবাইকে সবকিছু স্পষ্ট করে জানানোর লক্ষ্যে ব্যাট-বলের মালিকেরা এখন পাড়ার রাস্তা দখল করে বচসা শুরু করে দিয়েছেন। একজন প্রশ্ন তুললে, আরেকজন পাল্টা প্রশ্ন তুলছেন। এটা বলাই যায় যে, সালিস ছাড়া এই ঝগড়া থামার আর সম্ভাবনা নেই। ঘরের কেচ্ছা রাস্তায় আনাই যখন উদ্দেশ্য, তখন আর কী বলার আছে!
অবস্থা এ রকম যে, যখন তামিমের বক্তব্য শুনবেন তখন মনে হবে তামিমই ঠিক। আবার যখন সাকিবের ভিডিও ছাড়বেন, তখন মনে হবে সাকিবের যুক্তিই উচিত যুক্তি। একজন আবেগে ভাসিয়ে দিচ্ছেন, তো আরেকজন বাস্তবতা দিয়ে। দুজনেরই কিছু নিজস্ব যুক্তি তো অবশ্যই আছে। আবার তাঁদের দেওয়া যুক্তিই কখনো কখনো সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যেমন ধরুন, ওপেনিংয়ে নামা এমন কিংবদন্তি অনেক ব্যাটার আপনি পাবেন, যাঁরা কিনা সময়ের সাথে সাথে নিচেও ব্যাট করেছেন। পাশের দেশের শচীন টেন্ডুলকার বা সৌরভ গাঙ্গুলির কথা বিনা আয়াসে মনে করা যায়। তাঁদের নিচে নেমে ব্যাট করা নিয়ে এন্তার কথা হয়েছে তখন গণসহ সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে। তাতে কোচের সঙ্গে দ্বন্দ্ব এসেছিল, ছিল তরুণ অধিনায়ক বা ব্যাটারের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক সংঘাতের বিষয়টিও। তবে তাই শচীন-সৌরভ কখনো খেলা ছেড়ে দিয়েছেন বলে মনে পড়ে না। বরং সেটিকে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে তাঁরা বারবার বিজয়ী হয়েছেন। নিন্দুকদের মুখে ঝামা ঘষেছেন আয়েস করে। সবচেয়ে বড় কথা- আপনি যদি নেতা হন, তবে সবচেয়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে আপনাকে আগে নিজেকে ফেলতে হবে। তখনই তো নেতৃত্বের ছায়াতলে থাকা অন্যদের সে জায়গায় ভূমিকা রাখতে বলতে পারবেন, নাকি? মোদ্দা কথা হলো, আপনি নিজে যেটি করতে পারবেন না, সেটি কখনো অন্যকে করতে বলতেও পারবেন না। এটি উচ্চারণ করতে পারবেন না যে- ‘দলের প্রয়োজনে তোমাকে এটি করতেই হবে!’ আর আধুনিক ক্রিকেটও আসলে এখন অনেক বদলে গেছে। এর ধরনও বদলেছে। ফলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বলে আসলে কিছু নেই।
তো, এই কথাগুলোর কিছু কিছু টিভি ক্যামেরার সামনে স্পষ্ট গলায় বলেছেন সাকিব আল হাসানও। তিনি বলেছেন প্রকৃত টিমম্যান হওয়ার কথা। আবার সাকিব এ-ও বলেছেন, অধিনায়কত্ব এবার তিনি করতে চাননি। কারণ ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে তা আর কোনো ভ্যালু অ্যাড করে না। অর্থাৎ, সাকিব নিজেও ভ্যালুর কথা চিন্তা করেছেন। অধিনায়কত্ব যখন একজনকে দেওয়া হয়, তখন তা দলের স্বার্থেই দেওয়া হয়। ভ্যালু অ্যাডের হিসাব তখন একজন সিনিয়র প্লেয়ার করতে বসবেন কেন? যদিও সাকিব দাবি করেছেন যে, দলের বৃহত্তর স্বার্থেই তিনি অনেকটা জেনেশুনে ‘বিষপান’ করেছেন। তাহলে তো সাকিব নিজেও টিমের বাইরে প্রথমে ব্যক্তিগত হিসাবই কষেছিলেন। সেই হিসাব ক্ষণিকের জন্য হলেও সাকিব করলে, তামিমও তো করতে পারেন– নাকি? এ ছাড়া মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ও মুশফিকুর রহিমের বাদ পড়া নিয়েও মন্তব্য করেছেন সাকিব। তাঁদের বাদ পড়ার বিষয়টি যে ড্রেসিংরুম থেকেই জানতেন, তাও বলেছেন। সেই সঙ্গে ড্রেসিংরুমে তামিম কী বলতেন না বলতেন, তারও বিবরণ দিয়েছেন। ঘরের কাহিনি এভাবে জনসমক্ষে বলে বেড়ানোটা দলের বৃহত্তর স্বার্থে কতটা কাজে লাগবে, কে জানে!
স্পষ্ট যে বিষয়টি, সেটি হলো– তামিম বা সাকিব– কেউই আদর্শ কোনো কাজ আসলে করেননি। যদিও তাঁরা সবই ‘বলেছেন’ সবাইকে সবকিছু ‘জানানোর’ জন্যই। কিন্তু ঘটে যাওয়া ঘটনার পুরনো কাসুন্দি টেনে টেনে তাঁরা যা করেছেন, সেটি আদতে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে পুরোপুরি অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এতে বিশ্বে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল হচ্ছে বলেও মনে হওয়ার কোনো কারণ নেই। তামিম বা সাকিব– দুজনেই নিজেদের কোনো আত্মসমালোচনা করেননি। দোষ খুঁজেছেন শুধু অন্যদের মাঝেই। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ক্রিকেটারদের ব্যবস্থাপক হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা এড়ানোর সুযোগ নেই। কিন্তু যারা আইকনিক ব্যক্তিত্ব, তাদের কি তবে ঝগড়া করে বিভক্তি স্পষ্ট করাই অন্যতম দায়িত্ব? নাকি ফাটলগুলো ঢেকে দেওয়া?
যেসব বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্য এখন চলছে এবং আরও চলবে, তাতে প্রকৃতপক্ষে কী হবে? মূল কাজ যেটি হবে, সেটি হলো বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে ভালো খেলার আশা নিয়ে যাওয়া একটি দলের সব সদস্যের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হবে। তাঁরা আদৌ সব বিতর্ককে দূরে রেখে ভালো খেলার চেষ্টা করতে পারবেন কিনা, সেই সন্দেহ তৈরি হয়েই যাচ্ছে। কারণ যে ঘরে সন্দেহ ও ঝগড়া বেশি, সেই ঘরে শান্তি এনে সুস্থির জীবনযাপন করা সত্যিই কঠিন। এটি যেমন পরিবার ও সমাজের ক্ষেত্রে সত্য, তেমনি সত্য ক্রিকেট দলের ক্ষেত্রেও। তামিম বা সাকিব জাতীয় ক্রিকেট দলকে তো বিভিন্ন সময় পরিবারের সঙ্গেই তুলনা করেছিলেন, নাকি?
সেই সঙ্গে কিছু উঠতি ক্রিকেটারের ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে ভালো পারফরম্যান্স দেখানোর এক অযৌক্তিক চাপ। কারণ ক্রিকেট দুনিয়ায় বিতর্ককে ঢেকে দিতে পারফরম্যান্সের জুড়ি মেলা ভার। পারফরম্যান্স দিয়ে সেই কাজটি যেমন তামিম করেছেন, তেমনি আইসিসির নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে খেলায় ফেরা সাকিবও করেছেন। কিন্তু কয়েক ম্যাচ খেলা কোনো ওপেনারকে এখন যদি পান থেকে চুন খসলেই লোকে তামিমের সঙ্গে তুলনা করতে থাকে, তবে কজনের আর সেই তুলনাকে দূরে সরিয়ে সপাটে ব্যাট চালানো সম্ভব? উত্তরটি একটু ভেবে দেখবেন প্লিজ।
হয়তো তামিম-সাকিব ও কোচ-বোর্ডের এই বহুমুখী কথার লড়াই আরও বেশ কিছুদিন চলবে। হয়তো হবে আরও নানা কিসিমের জল্পনা-কল্পনা। হয়তো এসবের ভিড়ে পাত্তা পাবে না মাঠের ব্যাট-বলের লড়াইও। কিন্তু শেষতক ‘নোংরামি’ এড়ানোর কথা বলে বলে পুরো ক্রিকেটাঙ্গণকে আক্ষরিক অর্থেই নোংরা বানিয়ে দেওয়ার কৃতিত্বটি(!) আসলে তামিম-সাকিবের ঘাড়েই চেপে বসবে ভূতের মতো। কৃতিত্বের ভাগ নেবেন, আর দোষের দায় নেবেন না– তা কি হয়?


হাথুরুসিংহেকে অব্যাহতি দিয়ে তামিমকে দলে নিতে লিগ্যাল নোটিশ
সাকিব আস্তে আস্তে সবই ছেড়ে দেবেন
তামিম নিজেই বিশ্বকাপে যেতে চাননি, দাবি মাশরাফির
তামিম বাচ্চাদের মতো, মুশফিক বাদ পড়তেন- আর কী বলবেন সাকিব?
বাংলাদেশের মানুষ সহজ-সরল বলে এখনো মাশরাফিকে চান
বিশ্বকাপ নিয়ে বিস্ফোরক তামিম, বললেন বাদ দেওয়া 'ইনটেনশনাল'
তামিমের ব্যাপারে ফিজিওর রিপোর্টে কী ছিল?
বিশ্বকাপ দল নিয়ে নির্বাচকদের যা বলেছিলেন তামিম
‘তুমি এক কাজ কর, প্রথম ম্যাচ খেলিও না’
বড় জিনিস ঢাকার জন্য মিডিয়াকে অনেক খবর খাওয়ানো হয়: তামিম
